লবণে ঠকছে শুধুই ক্রেতা! কেজি প্রতি মুনাফা ১০ টাকা!

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য লবণ কেনার ক্ষেত্রে ঠকছেন শুধু ক্রেতারা। এক কেজি লবণ বিক্রিতে খুচরা ব্যবসায়ীরা এখন ৯ থেকে ১০ টাকা মুনাফা করার সুযোগ পাচ্ছেন। লবণ বিপণনকারী কোম্পানিগুলোও আগের চেয়ে কম দামে অপরিশোধিত লবণ কিনতে পারছে। মধ্যস্বত্বভোগীরাও বাড়তি লাভের সুযোগ পাচ্ছেন।

এদিকে এ বছরও চাহিদা অনুযায়ী দেশে অপরিশোধিত লবণ উৎপাদিত হয়নি। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কর বাড়িয়ে লবণ আমদানি উন্মুক্ত করার সুপারিশ করেছে। বাজারে এখন সবচেয়ে উন্নত প্রক্রিয়া ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেশন পদ্ধতিতে পরিশোধিত লবণের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) প্রতি কেজি ৩৬-৩৮ টাকা।

অন্যদিকে সাধারণ লবণ ২৫ থেকে ২৮ টাকা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। দুই বছর ধরে লবণের দর চড়া। এর আগে প্রতি কেজি ভালো মানের লবণ ২৫-২৮ টাকার মধ্যে ছিল। লবণের চড়া দামের কারণে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে লবণের দামের কারণে।

দেশে অপরিশোধিত লবণ উৎপাদনে ঘাটতি হলে প্রতিবছরই আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু বড়-ছোট সব মিল একই হারে আমদানির সুযোগ পায়। আমদানির পর পরিশোধন করে ভোক্তাদের কাছে বিক্রির বদলে অপরিশোধিত অবস্থায় লবণ বড় মিলের কাছে বিক্রি করে দেন ছোট মিলের মালিকেরা। এতে ভোক্তারা কোনো সুফল পান না।

জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘আমরা চাই লবণের বাজারে যাতে প্রতিযোগীর সংখ্যা বেশি থাকে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দাম যাতে কমে, সে পদক্ষেপ সরকারের নেওয়া উচিত।’

কেজিতে ১০ টাকা মুনাফা: লবণ পরিশোধন করে বিপণনকারী একাধিক কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে ভালো মানের লবণ খুচরা বিক্রেতাদের কাছে প্রতি কেজি ২৮-২৯ টাকা দরে বিক্রি করছে তারা। কিন্তু লবণের মোড়কে দাম লেখা থাকছে ৩৮ টাকা। ফলে খুচরা বিক্রেতারা এক কেজি লবণে ৯-১০ টাকা মুনাফা করার সুযোগ পাচ্ছেন।

গত নভেম্বর থেকে মে সময়ে লবণ মৌসুম চলার সময় প্রতি ৮০ কেজির এক বস্তা অপরিশোধিত লবণ ৬৮০ টাকা পর্যন্ত নেমেছিল, যা মৌসুম শুরুর আগে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। অবশ্য মৌসুম শেষ হওয়ার পর এখন আবার লবণের দাম বেড়েছে। কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের প্রতি বস্তা লবণ কিনতে ৮০০ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।

মোড়কে লেখা খুচরা মূল্য না কমিয়ে ব্যবসায়ীদের বাড়তি লাভের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর বক্তব্য হলো, মৌসুম শেষেই অপরিশোধিত লবণের দাম বাড়তে থাকে। ফলে অল্প কিছুদিনের জন্য এমআরপি কমানো সম্ভব হয় না। বারবার এমআরপির পরিবর্তন ব্র্যান্ডের জন্য ক্ষতিকর।

উৎপাদন চাহিদার কম: প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হিসাবে, গত মৌসুমে অপরিশোধিত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টন। সরকারের হিসাবে, এ বছর লবণের চাহিদা ১৬ লাখ ২১ হাজার টন, যা ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াকরণ ঘাটতি ধরে। ফলে চাহিদার চেয়ে লবণ উৎপাদন কম হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার টন।

কিন্তু মিলমালিকেরা মনে করেন, ভ্যাকুয়াম ইভাপোরেশন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনে প্রক্রিয়াকরণ ঘাটতি হয় ৪৬ শতাংশ। অবশ্য মেকানিক্যাল ও সনাতন পদ্ধতিতে পরিশোধনে ঘাটতি কম হয়। সব মিলিয়ে লবণের ঘাটতি গড়ে ৩০ শতাংশের মতো। ফলে অপরিশোধিত লবণের চাহিদা অনেক বেশি। গত বছর আড়াই লাখ টন ঘাটতির বিপরীতে আমদানি হয় পাঁচ লাখ টন।

আমদানি উন্মুক্ত করার সুপারিশ: দেশে ভোজ্য লবণ আমদানি নিষিদ্ধ। তবে উৎপাদনে ঘাটতি হলে সরকার আমদানির অনুমতি দেয়। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লবণ আমদানি নিষিদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোডিয়াম সালফেটের (শিল্প লবণ) নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ) আমদানি হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে অপরিশোধিত লবণের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য উৎসাহিত হচ্ছে। স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীরা সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশিয়ে বাজারজাত করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রতি কেজি লবণের উৎপাদন খরচ ৬ টাকা।

বিপরীতে আমদানিতে ব্যয় ৫ টাকা ৭০ পয়সা। এ অবস্থায় কমিশন লবণ আমদানিতে মোট করভার ৮৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০৫ শতাংশ করে আমদানি উন্মুক্ত করার সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, এতে দেশীয় চাষিরা সুরক্ষা পাবেন, পাশাপাশি অসাধু বাণিজ্য বন্ধ হবে।

জানতে চাইলে পূবালী সল্টের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, শুল্ক বাড়িয়ে আমদানি উন্মুক্ত করা হলে কৃষকেরা সুরক্ষা পাবেন। আবার লবণের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ টাকায় নেমে আসবে। তিনি বলেন, এখন আমদানির অনুমতি কিনতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বাণিজ্য হয়। সেটাও বন্ধ হবে। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো ডটকম।

Check for details
SHARE