রেস্তোরাঁ ব্যবসা সবচেয়ে সহজ বাংলাদেশে!

রাজধানী তো বটেই, দেশের সর্বত্র রাস্তার দুই পাশ আর গলি-ঘুপচিতে খাবারের রেস্তোরাঁর অভাব নেই। কারণ হলো, বাংলাদেশে এ ব্যবসাটাই সবচেয়ে সহজ। এর জন্য শহর এলাকায় সিটি করপোরেশন থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিলেই হলো। এতেই মিলে যায় রেস্তোরাঁ খোলার অনুমতি। এরপর ব্যবসা চালু করে দিয়ে ধীরেসুস্থে অন্য সব শর্ত পূরণ করলেই চলে।

জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর একটি ব্যবসার ক্ষেত্রে এমন সহজ নিয়ম-কানুন বিশ্বের আর কোথাও নেই। হঠাৎ হঠাৎ অভিযান চালানো হলেও খাদ্যের ভেজাল দূর হচ্ছে না। নিয়ম না মানার অপরাধের শাস্তি ২০ গুণ বাড়িয়েও কাজ হয়নি। বিশেষ করে রাস্তার ধারের বা ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলোর অবস্থা বেশি নাজুক। অথচ বাইরে যাদের নিয়মিত খেতে হয়, তাদের ৭০ শতাংশই এসব রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরশীল। মাত্র দুই হাজার টাকা খরচ করে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ঢাকায় খাদ্য ব্যবসায় নেমে পড়া যায়।

এরপর ধীরে ধীরে পরিবেশ ছাড়পত্র, স্যানিটারি লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, কৃষি উপকরণ সনদ, বিএসটিআই সনদ, প্রেমিসেস লাইসেন্স, কারখানা সনদ, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন এবং রেস্তোরাঁ পরিচালনার লাইসেন্স নিতে হয়। এতে খাদ্য ব্যবসায়ীরা খাদ্যের মান এবং স্বাস্থ্যকর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ খুব একটা অনুভব করে না। এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ।

ফলে যারা মান সমুন্নত রেখে ব্যবসা চালাতে চায়, তারা আছে চাপে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি খাদ্য ব্যবসা চালুর ক্ষেত্রে সবার শেষে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব এম রেজাউল করিম সরকার রবিন সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় খাদ্যসচিব এম বদরুদ্দোজাকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের সমিতির একজন সদস্য দুবাইয়ে খাবারের রেস্তোরাঁ খুলতে চেয়েছিলেন।

তবে সেখানকার পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের পদ্ধতির আকাশ-পাতাল তফাত। ওখানে অন্য সব শর্ত পূরণ শেষে ট্রেড লাইসেন্স মেলে।’ শুধু দুবাই নয়, অন্য সব দেশেও একই নিয়ম। তিনি এখানেও একই পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি খাদ্যসচিব। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিবেশী ভারতে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই রেস্তোরাঁ চালু করে দেওয়া যায় না। সবার আগে নিতে হয় ফুড সেফটি লাইসেন্স।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি এ লাইসেন্স দেয়। এ কর্তৃপক্ষই মূলত সব কিছু যাচাই-বাছাই করে। তাদের অনুমোদন পেতে হলে রেস্তোরাঁর প্রসেসিং ইউনিটের লে-আউট আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হয়। কী কী যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ব্যবহার করা হবে তার তালিকা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

রেস্তোরাঁটিতে কোন ক্যাটাগরির খাবার পরিবেশন এবং যে পানি ব্যবহার করা হবে তার উৎস জানাতে হয়। এই পানিতে ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য উপাদানের উপস্থিতির সনদ দিতে হয়। পানির মতো দুধ ও মাংসের উৎস সম্পর্কেও জানাতে হয় রেস্তোরাঁ খোলার আগেই। প্রাথমিক পর্যায়ে পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। এরপর সব কাগজপত্র যাচাই শেষে সন্তুষ্টি সাপেক্ষে ফুড সেফটি লাইসেন্স ইস্যু করা হয়।

এর পরের প্রক্রিয়াগুলো অনেকটাই বাংলাদেশের মতো। এই পর্যায়ে এসে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে নিতে হয় ট্রেড লাইসেন্স। ফুড সেফটি ও ট্রেড লাইসেন্সসহ আবেদন করতে হয় ইটিং হাউস লাইসেন্সের (খাবার ঘর লাইসেন্স) জন্য স্থানীয় পুলিশ কমিশনারের কাছে। রেস্তোরাঁয় তরল জাতীয় কিছু বিক্রি করতে হলে আলাদা লাইসেন্স নিতে হয়।

ধাপে ধাপে নিতে হয় ফায়ার ও লিফট লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, বীমা সার্টিফিকেট। সবার শেষে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হলে কী পরিবর্তন আসবে জানতে চাইলে খাদ্য ব্যবসায়ীরা জানায়, এতে পেশাগত দক্ষতা বাড়বে এবং ভেজাল কমবে। পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়ার সময় খাদ্য ব্যবসা কিভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছে তা জানতে হয়।

স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা লাইসেন্স দেওয়ার সময় ব্যবসায়ীরা কী করতে পারবে আর পারবে না সে বিষয়ে ব্রিফ করেন। ফায়ার লাইসেন্স নিতে গেলেও ব্রিফ পায় ব্যবসায়ীরা। প্রেমিসেস লাইসেন্স, বিএসটিআই সনদ, কৃষি উপকরণ সনদসহ সব লাইসেন্স বা সনদের উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্ধারিত নিয়ম মেনে ব্যবসা করানো। আর এসব নিয়ম মানলেই খাদ্যে ভেজাল কমে আসবে।

এসব দক্ষতা অর্জনের আগেই বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা ট্রেড লাইসেন্স পেয়ে যায়। আর একবার ব্যবসা শুরু করে দিলে তারা আর এসব দক্ষতা অর্জনের তাগিদ বোধ করে না। বরং বিভিন্ন সংস্থার কর্মচারীদের সঙ্গে তারা ‘সমঝোতা’ করে চলে। এ কারণেই রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি সবার শেষে খাদ্য লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনতে হলে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতিকে কাজে লাগাতে হবে। সমিতির সদস্য ছাড়া কাউকে এ ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া উচিত নয়। কারণ একজন ব্যক্তি কিছুই না জেনে খাদ্য ব্যবসা শুরু করছে। আগে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির কাছে সবার প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত।

এরপর ব্যবসা শুরুর জন্য বিভিন্ন সনদ বা লাইসেন্স সংগ্রহ করে খাদ্য ব্যবসার বিধান করা উচিত। ১৯৯৬ সালে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এবিসিসিআইয়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম করা হয়েছিল, যেকোনো ব্যবসা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে হবে। তাদের সনদ নিয়েই সরকারি অনুমোদন নেওয়ার আবেদন করতে হবে। সে নিয়ম এখনো বহাল থাকলেও কার্যকারিতা নেই।

এম রেজাউল করিম সরকার বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব জরিপ অনুযায়ী যারা নিয়মিত ঘরের বাইরে খায় তাদের ৭০ শতাংশই রাস্তার পাশের রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর করে। এসব রেস্তোরাঁর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। একটা ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারা বৈধভাবে ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে। তাই আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি ট্রেড লাইসেন্স সবার শেষে দেওয়ার জন্য।

আমরা এখন লিখিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে পদ্ধতি পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত অনিয়মও দূর করতে হবে। প্রতিটি লাইসেন্স বা সনদ সংগ্রহ করার জন্য ব্যবসায়ীদের হয়রানির শিকার হতে হয়। আগে বিভিন্ন আসনভিত্তিক রেস্তোরাঁর লাইসেন্স ইস্যু করত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। বাইরের একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে ঢাকায় এসে সচিবালয়ে ঢুকে এই সনদ নেওয়া বা নবায়ন করা কঠিন ছিল। আমাদের আন্দোলনের পর এটা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়।

তবে এর সঙ্গে সঙ্গে অনিয়মও বিকেন্দ্রীভূত হয়েছে। আগে এক জায়গায় টাকা দিলেই হতো। এখন দেওয়া লাগে ঘাটে ঘাটে। সম্প্রতি রাজশাহীর একজন ব্যবসায়ী এই লাইসেন্স পেতে এক লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। আমি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ ঘটনার বিচার চেয়েছিলাম। শুধু রেস্তোরাঁ নয়, সব লাইসেন্স নিতেই রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের হয়রানির শিকার হতে হয়। স্যানিটারি লাইসেন্স দেন জেলা সিভিল সার্জনরা।

রেস্তোরাঁয় কর্মরত প্রত্যেক কর্মচারীর জন্য প্রতিবছর হেলথ সার্টিফিকেট নিতে হয়। এই সার্টিফিকেটের দাম ২৫০ টাকা হলেও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের শ্রমিকপিছু দুই হাজার টাকা করে দিতে হয়। যে ভবনে রেস্তোরাঁ চালানো হয় তার হোল্ডিং ট্যাক্স বা খাজনা দিতে হয়। ফায়ার লাইসেন্স ফি ৫০০ টাকা হলেও রেস্তোরাঁ মালিকরা ১০ হাজার টাকার কমে এ লাইসেন্স পায় না।

রেস্তোরাঁয় কৃষিপণ্য ব্যবহারের জন্য কৃষি উপকরণ লাইসেন্স নিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে নিতে হয় বিএসটিআই লাইসেন্স। রেস্তোরাঁ নাকি ভাত বানানোর কারখানা। তাই কলকারখানা অধিদপ্তরের লাইসেন্স লাগে।’ খাদ্য ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, খাদ্য ব্যবসায় পরিচ্ছন্নতা না আসার অন্যতম কারণ হচ্ছে এসব অনিয়ম। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে যে জরিমানা করা হয় তা পরিশোধ করে আবার তারা অনিয়ম শুরু করে। এ কারণে অনিয়ম বন্ধ করা দরকার।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব শাহিদা আক্তার বলেন, ২০১৫ সালে মোট ৫৭ হাজার ১৫৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে মোট ৩৭ কোটি ৩৭ লাখ ৮৮ হাজার ২৪৬ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এক লাখ ৪৭ হাজার ৭৫৪ জনকে। এখন প্রতি মাসে দেশে প্রায় তিন হাজার পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। যদিও এসব অভিযান শুধু ভেজালবিরোধী নয়, তারপরও বোঝা যায় সমাজে কী পরিমাণ অনিয়ম হচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার মাইক্রোবায়োলজিস্ট বলেন, খাবারের দোকানে যে পানি বিক্রি করা হয় তার বেশির ভাগেই সমস্যা আছে। পানি বিশুদ্ধ করার জন্য আটটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বেশির ভাগ পানি প্রক্রিয়াকারী এসব নিয়ম মানে না। তারা শুধু ফিটকিরি ব্যবহার করে। এতে পানি পরিশোধিত হয় না। প্রচুর ব্যাকটেরিয়া থেকে যায়।

দেশে পানি প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা নেই। শুধু রেস্তোরাঁর খাবার নয়, এখন সব কিছুতেই ভেজাল মেশানো হচ্ছে। ভেজালের ভয়ে মৌসুমি ফল খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে অনেকেই। আম-জাম-লিচুতে বাজার ছেয়ে গেলেও ফর্মালিন বা কার্বাইড নামের বিষের ভয়ে অনেকেই তা কিনছে না। মানুষের ভয় দূর করার জন্য অনেকে রাজধানীতে ভ্যানে করে জীবন্ত মাছ বিক্রি করে। ভেজাল যে শুধু ফল আর মাছে, তা নয়। মুড়ির মতো শুকনো খাবারেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে।

মুড়িকে সাদা করার জন্য ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যদিও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের খাদ্য গবেষণাগারের গবেষক ডা. শাহিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানীর চারপাশে আমরা ১৭টি পণ্যের ওপর গবেষণা করেছি। এর মধ্যে মুড়িও রয়েছে। আমাদের গবেষণায় মুড়িতে কোনো ভেজাল পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি খাবারে ভেজাল মিলেছে।’

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ ডটকম।

Check for details
SHARE