বিমান দুর্ঘটনার কারণ জানতে লাগবে ছয় মাস!

নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের ভুল সংকেত, নাকি অন্য কোনো কারণে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছিল, সে ব্যাপারে এখনো কোনো প্রাথমিক ধারণায় আসতে পারেনি এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবারও তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি কয়েক দফা বৈঠক করেছে। জানতে চাইলে নেপাল পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও তদন্ত দলের সদস্য বুদ্ধি সাগর বলেন, তাঁরা মনে করছেন, দুর্ঘটনার কারণ জানতে এবং তদন্ত শেষ করতে ছয় মাস লাগবে।

তবে এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান গতকাল ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এ ধরনের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার তদন্ত শেষ করা সময়সাপেক্ষ বিষয়। এতে ছয় মাস, এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।’
নেপাল সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, নানা ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা ফ্লাইটের দুর্ঘটনার তদন্ত নেপালের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনার পর অনেকে তাঁদের নেপাল-যাত্রা বাতিল করেছেন। এখন বিমানবন্দর সংস্কার করার কথা ভাবছে নেপাল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এই তদন্তে উড়োজাহাজ নির্মাণ সংস্থা বোম্বারডেয়ার ও বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বিমান চলাচল সংস্থা এফএএ এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা আইকাওয়ের সহায়তা নেবে নেপাল। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নেপাল সরকারের ছয় সদস্যের তদন্ত দলের প্রধান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক মহাপরিচালক যজ্ঞ প্রসাদ গৌতম মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রতিনিধিদলে থাকা বাংলাদেশ দলের সদস্য সিভিল এভিয়েশনের সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমোডর মোস্তাফিজুর রহমানও কিছু বলতে চাননি।

তবে বাংলাদেশের বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল গত বুধবার কাঠমান্ডু ছাড়ার আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মার সঙ্গে বৈঠক করে দ্রুত তদন্ত শেষ করার অনুরোধ করেছেন। মন্ত্রী প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, এ ধরনের তদন্ত ছয় মাসের আগে শেষ করার নজির নেই।
নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা ও আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার দেখভাল করার জন্য নয় সদস্যের একটি দল গতকাল কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছে। আহত আরও একজন গতকাল হাসপাতাল ছেড়েছেন। এ নিয়ে দুজন হাসপাতাল ছাড়লেন। এ ছাড়া আরও তিনজন হাসপাতাল ছাড়তে পারেন বলে স্থানীয় চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

নিহত চার উড়োজাহাজ ক্রুর শরীরে মাদক বা অন্য কোনো বিষাক্ত উপাদান ছিল কি না, তা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে টিচিং হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। কারও হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল কি না, তা-ও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

হিমালয় পর্বতমালার কারণে পর্যটকদের কাছে নেপাল আকর্ষণীয় দেশ। স্থানীয় ইংরেজি দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট-এ ১২ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্থানীয় সিভিল এভিয়েশন অথরিটির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার বিদেশি নেপাল ভ্রমণ করেছে। এ সময় প্রতিদিন ২৯টি বিমান সংস্থার ৩৩টি করে ফ্লাইট চলাচল করেছে। ওই বছরে ৩৩ হাজার ৩৬২টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করেছে।
তবে উড়োজাহাজ ওঠানামা করার জন্য নেপাল একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ অঞ্চল। পার্বত্য এলাকা হওয়ায় দেশটিতে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর বাইরে আছে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। শুধু ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নয়, নেপালের অন্যান্য অঞ্চলেও ধারাবাহিকভাবে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার রেকর্ড রয়েছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম উড়োজাহাজ অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বলা হচ্ছে, এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। সেখানে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাও ঘটেছে। নেপালের এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোকে নিষিদ্ধ করে রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

এই রুটে নিয়মিত চলাচল করেন এমন একজন পাইলট বলেছেন, পর্বত ছাড়াও প্রায়ই ঘন কুয়াশা ঘিরে ফেলে ত্রিভুবন বিমানবন্দরকে। তাই সেখানে উড়োজাহাজ ওঠানামা করানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ইউএস-বাংলার নিহত পাইলট আবিদ সুলতান এই বিমানবন্দরে ১০০ বারের বেশি ওঠানামা করেছেন। তিনি পাঁচ হাজার ঘণ্টার বেশি সময় বিমান চালাতে অভিজ্ঞ ছিলেন। তারপরও তিনি কী করে দুর্ঘটনায় পড়লেন, সেই হিসাব কেউ মেলাতে পারছেন না।

ওই পাইলট বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। চারপাশ উঁচু পাহাড়-পর্বতে ঘেরা। এখানে উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে যেমন সতর্ক থাকতে হয়, তেমনি ওঠানোর সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হয়। বোয়িং কিংবা এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলো ৩২ হাজার ফুট থেকে ৩৬ হাজার ফুট উচ্চতা দিয়ে সেখানে উড়ে যায়। তবে ত্রিভুবনে অবতরণের সময় প্রধান বাধা একটি বিশাল পাহাড়, এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৭০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নয় মাইল দূরে রয়েছে এই পাহাড়। এ জন্য এই রানওয়েতে কোনো উড়োজাহাজই সোজা অবতরণ করতে পারে না। ওই পাহাড় পেরোনোর পরপরই দ্রুত উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে হয়।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ত্রিভুবন হচ্ছে নেপালের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা অপর্যাপ্ত ও দুর্বল। সেখানে অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেম নেই। এ পদ্ধতি থাকলে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে রানওয়ের ৫০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় থাকা উড়োজাহাজকে নির্দেশনা দেওয়া যায়। কিন্তু অটোমেটিক ল্যান্ডিং সিস্টেম না থাকায় তিন কিলোমিটার দূর থেকে ত্রিভুবনের রানওয়ের দিকে লক্ষ রাখতে হয় পাইলটদের। তা ছাড়া এর রানওয়ের দুই পাশেই রয়েছে পাহাড়। কোনো কারণে উড়োজাহাজ ত্রিভুবন বিমানবন্দর এলাকা পেরিয়ে গেলে আবার নতুন হিসাব কষে অবতরণ করতে হয়।

বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিমান চলাচল সংস্থার প্রধান বলেন, কাঠমান্ডুর নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের যে বার্তা ইউটিউবে ফাঁস হয়েছে, তাতে দেখা গেছে, পাইলট রানওয়ের দিক পরিবর্তনের পর রাডারের সহায়তা চেয়েছিলেন। এই ব্যবস্থায় বিমান কোন দিকে যাবে, সেটা রাডার বলে দেয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার সে সহায়তা দিতে পারেনি।

তদন্ত কমিটিতে থাকা বাংলাদেশের এভিয়েশন দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন এম রহমতুল্লাহ বলেন, তদন্তে তাঁরা এসব বিষয় খতিয়ে দেখবেন। তদন্ত দলের অন্য একজন সদস্য বলেন, তদন্তের প্রধান দুটো সূত্র হচ্ছে, ব্ল্যাক বক্স এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর)। বিধ্বস্ত ফ্লাইটের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ব্ল্যাক বক্স থেকে তথ্য বের করার সক্ষমতা অধিকাংশ দেশের নেই। এ কারণে অন্য দেশের সহায়তা নেওয়া হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো ডটকম।

Check for details
SHARE