পৃথিবী বদলে দেয়া নারীদের সেরা দশ আবিস্কার!

নারী কখনো ঐশ্বর্যময়ী দেবী, কখনো মমতার অধীশ্বরী, আবার কখনো সৃজনশীলতার প্রতীক। রূপকথা থেকে প্রযুক্তির যুগে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কারক হিসেবে বিজয়ের মুকুট শিরোধান করেছেন। যদিও সভ্যতার উন্মেষ পর্ব থেকে এখন অবধি নারীদের আবিষ্কার যেন পুরুষ শাসিত সমাজে চক্ষুশূল।

তারপরও নানা ধরনের কটাক্ষ, বিদ্রুপ, বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতাকে জয় করে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে জয়িতারা। সকল তর্ক-বিতর্কের উর্ধ্বে থেকে দৈনন্দিন জীবনকে আলোকিত করেছে নারীদের বিস্ময়কর আবিষ্কার। আসুন জেনে নেয়া যাক সেই সব অপরাজেয় নারীদের দশটি আবিষ্কারের অবিস্মরণীয় ভূমিকা—

আইসক্রিম মেকার: চকলেট, ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, ম্যাংগো যে ফ্লেভারই আপনার পছন্দের হোকনা কেন, সকল বয়সী মানুষের পছন্দের তালিকার প্রথম নামটি ইয়াম্মি আইসক্রিম। শুধুমাত্র আইসক্রিম পার্লারে গিয়ে এখন আপনাকে আইসক্রিমের স্বাদ নিতে হবে এমনটি নয়, বাড়িতে বসেও আপনি সুস্বাদু আইসক্রিম বানাতে পারবেন আইসক্রিম বানানো যন্ত্রের মাধ্যমে।

যুক্তরাষ্ট্রে আইসক্রিম তৈরির প্রথম যন্ত্র উদ্ভাবন করেন নারী বিজ্ঞানী ন্যান্সি জনসন। ১৮৪৩ সালে তিনি তার উদ্ভাবিত আইসক্রিম তৈরি যন্ত্রটির প্যাটেন্ট করেন। বর্তমান যুগে ইলেক্ট্রিক আইসমেকার থাকলেও অনেক জায়গাতেই এখনো ন্যান্সির সেই আইসক্রিমফ্রিজার ব্যবহূত হয়। আইসক্রিম প্রেমীদের আইসমেকার বানানোর জন্য প্রশংসার দাবীদার এই গুণী উদ্ভাবক।

সি সি টিভি: হঠাত্ জুয়েলারি দোকানের কাচ ভেঙ্গে মূল্যবান স্বর্ণালংকার নিয়ে দৌড় দিলো চোর। মুহূর্তের মধ্যে আপনি সনাক্ত করলেন কে সেই চোর। এই কাজে যে ডিভাইসটি আপনাকে সহযোগিতা করবে তা হলো বর্তমান প্রযুক্তির সিসি টিভি। শুধুমাত্র শপিং মল কিংবা অফিস বা রাস্তার মোড়ে এমনকি মানুষের বাসাবাড়িতে পৌঁছে গেছে উন্নত আধুনিক সি সি টিভি।

বিশ্বজুড়েই নিরাপত্তার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সি সি টিভি ক্যামেরার উদ্ভাবক ম্যারি ভ্যান ব্রিটান ব্রাউন নামের একজন নারী। ১৯৬৯ সালে যখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন হচ্ছিল ঠিক তখনই তিনি এটি আবিষ্কার করেন। একই সালে প্যাটেন্ট লাভ করার প্রধান কারণ হলো ব্রাউনসহ সকল নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

কম্পিউটার সফটওয়্যার: আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন গণনাকারী যন্ত্র হলো কম্পিউটার। উনিশ শতকের শেষে ইউএস নেভির একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী এডমাইরাল ড.গ্রেস মুরো। ইউজারফ্রেন্ডলি কম্পিউটার সফটওয়্যার প্রোগ্রাম তৈরি করে তিনি প্রযুক্তি জগতকে একধাপ এগিয়ে নেন। এখানে বলাই বাহুল্য, উনিও একজম নারী বিজ্ঞানী ছিলেন যা সেসময়ের ক্ষেত্রে বিরল। এছাড়া তিনিই সবার আগে কম্পিউটারের সিস্টেমে ‘বাগ’ বা ত্রুটিও ধরতে পেরেছিলেন।

ইনজেকশন সিরিঞ্জ: হেপাটাইটিস, টাইফয়েডসহ অনেক চিকিত্সায় ইনজেকশন হলো আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু ছোটবেলায় আমরা শুধুমাত্র এই সিরিঞ্জের ভয়ে ডাক্তারের কাছ থেকে পালাতাম। চিকিত্সাবিজ্ঞানে বর্তমানে অনেক ব্যবহূত সরঞ্জাম ইনজেকশন সিরিঞ্জ। ১৮৯৯ সালে একজন নারী বিজ্ঞানী লেটিটা গির ইনজেকশন সিরিঞ্জ আবিষ্কার করেন। এটি এমন একটি সিরিঞ্জ যা কেবল মাত্র এক হাত দিয়েই ব্যবহার করা সম্ভব।

বিদ্যুতচালিত রেফ্রিজারেটর: বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি যন্ত্র হলো আধুনিক বিদ্যুতচালিত রেফ্রিজারেটর। ১৯১৪ সাল থেকে যন্ত্রটিরব্যবহার পুরো বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে। আর এই আবিষ্কারের নেপথ্যে রয়েছেন একজন নারী, তিনি হলেন ফ্লোরেন্স পারিপার্ট। শুধুমাত্র বিদ্যুতচালিত রেফ্রিজারেটর নয়, বরং সেইসাথে ১৯০০ সালে রাস্তা পরিষ্কার যন্ত্র নির্মাণের একটি প্যাটেন্টও লাভ করেন যা পরবর্তীতে বাজারজাত করতে সক্ষম হন।

পেপার ব্যাগ মেশিন-সুবিধাজনক, সস্তা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাগ হচ্ছে পেপার ব্যাগ। আর যেটির মাধ্যমে পেপার ব্যাগ বানানো যায় সেই মেশিনটি আবিষ্কার করেছিলেন মার্গারেট নাইট নামে আরেকজন নারী উদ্ভাবক। কিন্তু চার্লস অ্যানান নামক একজন বিজ্ঞানী মার্গারেটের এই আবিষ্কার কিছুতেই স্বীকার করতে নাজুক ছিলেন।

কেননা চার্লস অ্যানান মার্গারেটের এই আবিষ্কারকে নিজের বলে চালিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। যার কারণে মার্গারেটকে প্রতিনিয়ত তার সাথে নানা তর্ক-বিতর্কের মুখোমুখি হতে হতো। একজন নারী বিজ্ঞানী কীভাবে বিস্ময়কর এই আবিষ্কার করতে পারেন, তার বিপক্ষে ছিলেন চার্লস। কিন্তু জয়ী হয়েছিলেন নারী বিজ্ঞানী মার্গারেট নাইট। তিনি ১৮৭১ সালে এই প্যাটেন্ট লাভ করেন। আর সেই সমালোচক চার্লস হারিয়ে গেছেন কালের গহবরে।

দ্য ফায়ার স্কেপ: কোনো একটি বিল্ডিংয়ের আট তলায় হঠাত্ আগুন লাগলে নিরাপত্তা সেবার অভাবে আগুন মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিল্ডিংয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই আগুনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, যেটি ফায়ার স্কেপ নামে পরিচিত। এই ফায়ার স্কেপের আবিষ্কারক একজন নারী। ১৮৮৭ সালে এই নারী বিজ্ঞানী অ্যানা কোন্নেলি ফায়ার স্কেপ আবিষ্কার করেন।

মনোপলি: মনোপলি খেলাতে খেলোয়াড়েরা টাকাপয়সা দিয়ে পছন্দমতো জায়গাজমি কেনে। অনেকের কাছে এটি ‘ধনী হওয়ার মজার খেলা’ নামে পরিচিত। এই মজার বোর্ড গেইমটির আবিষ্কারক একজন নারী। ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদস্বরুপ এই খেলাটি আবিষ্কার করেন এই বিজ্ঞানী।

কিন্তু তার এই আবিষ্কার পূর্ণ মাত্রা পায় আরো ৩০ বছর পর যখন চারলেস ড্যারো নামক এক ভদ্রলোক এটিকে পার্কার ব্রাদার্স নামের একটি ফার্মের কাছে বিক্রি করে দেয়। বলছি অন্যতম নারী বিজ্ঞান এলিজাবেথ ম্যাগির কথা যিনি ১৯০৪ সালে এই খেলাটি আবিষ্কার করেন। সর্বপ্রথম ‘দ্যা ল্যান্ডলর্ড গেইম’ নামে এটি পরিচিতি লাভ করে। প্রথমে তার এই সৃজনশীল কাজের কোনো মূল্যায়ন না হলেও পরে ফার্ম থেকে ম্যাগিকে অবদানস্বরুপ ৫০০ ডলার দেওয়া হয়।

তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা: বর্তমান যুগের ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থার অবদান। কোনো তারের প্রয়োজন পড়বে না এবং সরাসরি ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে, এই ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে এমন এক যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিষ্কার করা হয়।

যা দিয়ে গোপনে যুদ্ধকালীন সময়ে খবর নিয়ে যোগাযোগ করা যায়। আজকের ওয়াইফাই থেকে জিপিএস, সব কিছুর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই। তত্কালীন সময়ের অনেক বড় সিনেমা তারকা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন হ্যাডি লামার, যিনি ছিলেন এই তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থারও উদ্ভাবক।

লাইফ বোট: মারিয়া ব্যেইস ছিলেন একজন পর্যটক, যিনি প্রায়ই সমুদ্র ভ্রমণে যেতেন। কিন্তু এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার কারণে এই নারী উদ্ভাবক বলেছিলেন, শুধুমাত্র পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে মানুষের ডুবে মৃত্যু হতে পারে না। অনেক মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি লাইফ বোট উদ্ভাবন করলেন। এই লাইফবোট ১৮৮২ সালে উদ্ভাবনের পর থেকে এখনো সমুদ্রযাত্রায় জীবন রক্ষাকারী হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক।

Check for details
SHARE