চাকরিভীতি থেকেই উদ্যোক্তা বনে যাওয়া!

শরদিন্দু একটি দেশীয় পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি দেশী কাঁচামাল ও জনশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব নকশায় পোশাক উৎপাদন করে ক্রেতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। পোশাকের চমত্কার সব নকশা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পেছনে কাজ করছেন একজন নারী। তিনি হাবিবা সুরভী।

অনলাইন ও অফলাইন— দুই মাধ্যমেই চলছে শরদিন্দুর বিক্রিবাট্টা। আজকের আয়োজনে থাকছে শূন্য থেকে শুরু করা উদ্যোগী এ নারীর কথা—চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটা উক্তি বিশ্বাস করি খুব। কথাটা অনেকটা এ রকম— তুমি যে কাজটা খুব ভালো পারো, সেটা কখনো বিনামূল্যে কোরো না।

সে বিশ্বাস থেকেই আমার মনে হয়েছে, আমি যা ভালো পারি সবচেয়ে বেশি, তা নিয়েই কিছু করা যায়— এভাবেই বলছিলেন পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান শরদিন্দুর প্রতিষ্ঠাতা। চীনা দার্শনিকের উক্তি মেনে নিয়ে নিজের ভালো লাগা কিংবা সবচেয়ে ভালো পারেন যে কাজ, সেটিকেই বেছে নিয়েছেন স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকেই যেকোনো নকশা, বিশেষ করে পোশাক নকশার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ ঘিরে ছিল তার। নিজের নকশা করা পোশাক দেখে কাছের মানুষজন প্রশংসাও করেছেন অনেক। সব মিলিয়ে তার মতে, আমার সবচেয়ে ভালো কিংবা শক্তিশালী দিক হচ্ছে পোশাকে নকশা করতে পারা।

যেহেতু আমি অনেক আগে থেকেই পোশাকে নকশা করি, তাই এ শক্তিকেই আমি কাজে লাগাব বলে ভাবি। সেই সঙ্গে তিনি আরো বলেন, পোশাক শুধু পরিধেয়ই না, বরং এর মাধ্যমে মানুষ অব্যক্ত কথাও প্রকাশ করতে সক্ষম। আমার কাছে মনে হয়, প্রতিটা পোশাক জীবন্ত, কথা বলে। কোনো পোশাক চঞ্চলতা, উচ্ছলতা বোঝাচ্ছে তো কোনো পোশাক আবার উৎসবের গান গাইছে।

তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরুর কথা জানতে চাইলে সুরভীর মুখে শোনা হয় সে গল্প। তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবা। হাতখরচের টাকা জোগাড় করার জন্য খণ্ডকালীন বেশকিছু চাকরি করেছেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণেই হয়তোবা চাকরি করা হয়নি বেশিদিন।

সবসময়ই ভাবতেন নিজে কিছু করবেন। নিজে কিছু করা, ভালো লাগা ও নিজের সবচেয়ে ভালো পারা কাজের সম্মিলন ঘটাতেই শরদিন্দুর শুরু। হাবিবা সুরভী বলেন, প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা স্বভাবের আমি। এ কারণে খণ্ডকালীন চাকরিতে বেশি দিনথিতু হতে পারিনি। অন্যদিকে বিভিন্ন জায়গায় খণ্ডকালীন কাজের কারণে আমার মনে এক ধরনের চাকরিভীতি কাজ করে।

তখন ভাবতাম, এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি, তাই চাকরি না করলেও চলবে। কিন্তু একটা সময় হয়তো আমাকে কিছু করতেই হবে। এ চিন্তা থেকেই ভাবলাম, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হওয়ার আগেই যদি এমন কিছু করতে পারি, যাতে আমাকে চাকরি করতে না হয়, তাহলেই মুক্তি মিলবে অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা থেকে।

সময়টা ২০১৬ সালের ১৪ জুন। স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সাতপাঁচ ভাবনা থেকে কার্যক্রম শুরু হয় শরদিন্দুর। প্রযুক্তি যখন মানুষকে এতদিক থেকে সহায়তা দিচ্ছে, সেদিক থেকে পিছিয়ে থাকবেন কেন উদ্যোগী নারীরা। হাবিবা সুরভীও তাই ব্যবসা শুরুর প্লাটফর্ম হিসেবে বেছে নিলেন অনলাইন মাধ্যম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শরদিন্দু নামে একটি পেজ ও ওয়েবসাইট, এভাবেই শুরু। বছর না গড়াতেই সুরভীর নকশা করা পোশাক বেশ সাড়া ফেলে ফ্যাশনপ্রেমীদের মধ্যে। ক্রেতার চাহিদা ও আগ্রহই সুরভীর শরদিন্দুর মূল চালিকাশক্তি। তবে ক্ষণে ক্ষণে সুরভীর ছোট্ট প্রচেষ্টা প্রসার লাভ করছে, সেটা বেশ ভালোই টের পাওয়া যায়।

কেননা দুই বছরে পা দিতেই অনলাইনে দাপিয়ে ব্যবসা করা শরদিন্দুর প্রথম আউটলেটও খোলা হয়েছে এ বছর। ধীরে ধীরে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সুরভীর নাম যেন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। অবশ্য এসব কৃতিত্বের ভাগীদার হিসেবে সুরভী তার এক বন্ধুর কথাও উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, শরদিন্দু শুরু করার এক বছর পর আমার সঙ্গে যুক্ত হন আমার এক বন্ধু তানবীর হোসেন রিফাত। প্রচণ্ড সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী এমন কাউকে আসলে সে সময় প্রয়োজন ছিল। তার সম্পৃক্ততার পর আমি পোশাকে নকশা, কন্টেন্ট ক্রিয়েট, কাস্টমার কেয়ার ইত্যাদি বিষয়ে নজর দিই আর রিফাত প্রডাক্ট ফটোগ্রাফি, প্রডাকশন, মার্কেটিং ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

শুধু একটি আউটলেটই না, বরং শরদিন্দুর কারখানা রয়েছে, যেখানে ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট, কারচুপি নিয়ে কাজ করা হয়। কারখানা, আউটলেট, অনলাইন সব মিলিয়ে শরদিন্দুর হয়ে কাজ করছেন শতাধিক কর্মী। ছোটবেলায় ইঞ্জিনিয়ার হতে চাওয়া মেয়েটির উদ্যোক্তা বনে যাওয়ার পেছনে পরিবারের যথেষ্ট সহযোগিতা ছিল।

ছেলেবেলার চাওয়া পূরণ হয়নি বলে কোনো অভিযোগ নেই নিজের প্রতি। তিনি বলেন, আসলে ছেলেবেলায় কেউ কিছুই হতে চায় না। কেননা সে সময়ের চাওয়াগুলো হয় অবাস্তব। আমরা ছোটবেলায় যা বলতাম, সেসব আসলে বড়দের শিখিয়ে দেয়া বুলি।

ঠিক তেমনই আমি উচ্চ মাধ্যমিকের আগ পর্যন্ত বলতাম, ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। অথচ একটু বড় হতে হতে বুঝতে পারলাম, আমি ভালোবাসি পোশাকে নকশা করতে। আমি আমার চাওয়া অনুযায়ীই কিন্তু কাজ করে যাচ্ছি। ভালো লাগার কাজে যে কখনই ক্লান্তি ভর করতে পারে না, সেটা হাবিবা সুরভীকে দেখে ভালোভাবে টের পাওয়া যায়।

দুই বছর ধরে একটু একটু করে গড়ে তোলা শরদিন্দুর কোনো কাজে কখনো ভ্রূ কুঁচকে আসেনি তার। তিনি বলেন, শরদিন্দুকে এতটুকু এগিয়ে নিয়ে আসার পেছনে পরিশ্রম করতে হয়েছে অনেক। তবে সেটা কখনো খারাপ অনুভূতি দেয়নি। বরং মাঝে মাঝেই মনে হয় দিনটা ২৪ ঘণ্টার বদলে ৪৮ ঘণ্টার হলে ভালো হতো। তাহলে আরো অনেক কিছু করতে পারতাম।

স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন হাবিবা সুরভী। তার সব স্বপ্ন এখন শরদিন্দুকে ঘিরেই। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শরদিন্দুকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন। উত্তরে বলেছেন, দু-তিন বছর পর সব উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিটা ঘরে যেন অন্তত একটা করে শরদিন্দুর শপিং ব্যাগ খুঁজে পাওয়া যায় পণ্যসমেত।

তথ্যসূত্র: বনিকবার্তা।

Check for details
SHARE