কোয়ালিটি নিরীক্ষায় এপেক্স সেরা!

চামড়া খাতের বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) নিরীক্ষিত কারখানার সংখ্যা বাংলাদেশে মাত্র একটি। ২০১৫ সালে এপেক্স ফুটওয়্যারের ট্যানারি ইউনিট এলডব্লিউজির নিরীক্ষায় সেরা মান অর্থাৎ গোল্ড কারখানার মর্যাদা পায়। এখন পর্যন্ত অ্যাপেক্স ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো কারখানা এলডব্লিউজির সনদ পায়নি।

অবশ্য এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে চামড়া খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলো। বিশ্বে মোট ৪৩০টি ট্যানারি ও চামড়াজাত পণ্যের কারখানা এলডব্লিউজির নিরীক্ষা সনদ পেয়েছে। যার মধ্যে চীনের ৭৫টি, ভারতের ১০৫টি, ব্রাজিলের ৬৩টি, ইতালির ২৬টি ও ভিয়েতনামের ১৪টি।

এমনকি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানেরও তিনটি কারখানা এলডব্লিউজির মানসনদ পেয়েছে। চামড়া খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে এলডব্লিউজির সনদ জরুরি।

পোশাক খাতে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) লিড সনদ পোশাক কারখানাকে ক্রয়াদেশ ও ভালো দাম পেতে সহায়তা করে, তেমনি চামড়া খাতেও এলডব্লিউজির সনদ ভালো বৈশ্বিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য জরুরি।

চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশ মূলত এমন বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে, যেখানে ব্র্যান্ড মূল্য নেই। ফলে এ দেশের রপ্তানিকারকেরা পণ্যের দাম কম পান।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এখন আমরা যে জুতা ১৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি করছি, ভালো ব্র্যান্ডের ক্রেতার কাছে তার দাম ২৫-৩০ ডলার পাওয়া যাবে।

এতে পরিমাণ একই থাকলেও রপ্তানি আয় অনেক বেড়ে যাবে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে ভালো ব্র্যান্ডের ক্রেতা পাওয়া কঠিন।’ দেশের ট্যানারিগুলো ঢাকার হাজারীবাগে থাকার সময় পরিবেশদূষণের দায়ে ভালো ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারত না। ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারে চামড়া শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার পর এখন সেখানেও নদীদূষণের অভিযোগ উঠছে।

সাভারে প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। এই সিইটিপি দিয়ে এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া যাবে বলে আশাও করছেন না উদ্যোক্তারা। এ জন্য এপেক্স ও বে ট্যানারি আলাদা সিইটিপি নির্মাণে সরকারের কাছে আবেদন করেছে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাভারের সিইটিপি দেখাতে আমরা এলডব্লিউজির প্রতিনিধিদের নিয়ে এসেছিলাম। তারা দেখে বলেছে, সিইটিপি পুরোপুরি অকার্যকর। এরপর আমরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বলেছি, বড় ট্যানারিগুলোকে নিজেদের সিইটিপি নির্মাণের অনুমতি দিতে, নইলে চামড়া খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।’

এলডব্লিউজির সদস্য ৬৬টি বড় ব্র্যান্ড
২০০৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস, টিম্বারল্যান্ডের মতো কয়েকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও পাদুকা উৎপাদকেরা মিলে এলডব্লিউজি গঠন করে। পরিবেশ সুরক্ষা করে কীভাবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করা যায়, তা নিশ্চিত করাই সংস্থাটির লক্ষ্য। এলডব্লিউজির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, সংস্থাটি কারখানা নিরীক্ষার জন্য সাধারণ একটি মান কাঠামো তৈরি করে।

সে অনুযায়ী নিরীক্ষা করে কারখানাগুলোকে গোল্ড, সিলভার, ব্রোঞ্জ ও সাধারণ কারখানায় শ্রেণিভুক্ত করে। কারখানা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে তারা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্যান্য উপাদানের ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার ইত্যাদি নানা বিষয় খতিয়ে দেখে।

বিশ্বের ৬৬টি বড় বড় ব্র্যান্ড এলডব্লিউজির সদস্য। এ তালিকায় রয়েছে অ্যাডিডাস, নাইকি, আলদি, ক্লার্কস, কোচ, বাটা, কোল হ্যান, ডায়েচম্যান, ডেকার, এইচঅ্যান্ডএম, এইলিন ফিশার, আইকিয়া, টিম্বারল্যান্ড, টমি হিলফিগার প্রভৃতি ব্র্যান্ড।

জানতে চাইলে এপেক্স ফুটওয়্যারের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ম্যানেজার মো. ফিরোজ আলম তালুকদার বলেন, এসব বড় ব্র্যান্ডের কাছে পণ্য বিক্রি করতে এলডব্লিউজির নিরীক্ষিত ট্যানারি থেকে চামড়া কিনতে হয়।

অন্যদের বাড়ছে, বাংলাদেশের কমছে
সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া খাতের সার্বিক রপ্তানি আয় কমেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বৃদ্ধির প্রবণতার পর গত বছরই এ খাতে রপ্তানি আয় কমল। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয় ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১২ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমলেও বাড়ছে ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের। ভিয়েতনামের ভেনডটকম নামের একটি অনলাইন পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভিয়েতনাম চামড়া ও পাদুকা রপ্তানি করে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি।

ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় ৬ আগস্ট প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, দেশটির কাউন্সিল ফর লেদার এক্সপোর্টার্স (সিএলই) আগামী ছয় বছরে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য ঠিক করেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া খাতে ভারতের রপ্তানি আয় হয়েছে ৫৭৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ কোটি ডলার বেশি।

পাকিস্তানের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত মে পর্যন্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১১ মাসে দেশটি চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ৪৮ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি।

তথ্যসূত্র: প্রথমআলো ডটকম।

Check for details
SHARE