কোয়েলে বাজিমাত!

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার উত্তর কবাখালী গ্রামের কামাল হোসেন (৪৫) জোট পারমিট পাওয়া কাঠবোঝাই গাড়ি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দিতেন। ঠিকানামতো গাড়ি পৌঁছে দিতে পারলে পেতেন তিন হাজার টাকা। তবে দুই মাস ধরে জোত পারমিটের কাঠবোঝাই গাড়ির চলাচল বন্ধ থাকায় সংসার চলছিল না তাঁর। তবে থেমে থাকেননি তিনি। মাত্র এক মাস আগে কোয়েল পাখির চাষ শুরু করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন তিনি।

কোয়েল দ্রুত বাচ্চা দেয়। ডিমও খুব সুস্বাদু। বাজারে এই পাখির মাংসের চাহিদাও রয়েছে প্রচুর। দারিদ্র্য ঘোচাতে কামাল ও তাঁর স্ত্রী পারভিন আক্তার তাই কোয়েল চাষই বেছে নিয়েছিলেন। তবে শুরুতে হাতে নগদ টাকা ছিল না তাঁদের। ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নেন তাঁরা। সে ঋণের টাকায় আগস্টের শেষের দিকে ময়মনসিংহের জারিয়া এলাকা থেকে ৮০০টি কোয়েল এনে শুরু করেন খামার। কোয়েল আনার ১৬ দিনের মধ্যেই ১৫০টি কোয়েল ডিম দেওয়া শুরু করে।

কবাখালী বাজারসংলগ্ন কামাল হোসেনের কোয়েলের খামারে গিয়ে দেখা দেখা যায়, ১৪ ফুট প্রস্থ ও ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ঘরে গড়ে উঠেছে কামাল হোসেনের কোয়েলের খামার। খামারের ভেতরে ডিম সংগ্রহ করছিলেন তিনি। বাইরে ডিমের জন্য অপেক্ষা করছিল লোকজন। কথা হয় কামাল হোসেনের স্ত্রী পারভিন আক্তারের (৩৬) সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘এক মেয়ে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়ছে। আরেক মেয়ে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দেবে। এত দিন গাড়ির কাজ করে সংসার চলেছে। তবে এখন গাড়ি বন্ধ। সংসারে টানাপোড়েনে আলোর দিশারি হয়ে উঠেছে আমাদের এই কোয়েলের খামার। আমি প্রতিদিন কোয়েলের ১০০টি ডিম সেদ্ধ করে রাখি। বাড়িতে এসে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা প্রতিটা ডিম পাঁচ টাকা করে কিনে নিয়ে যায়। কোয়েলের ডিম বিক্রির টাকায় সংসারের খরচ মেটাচ্ছি।’

কামাল হোসেন বলেন, ‘অনেক চিন্তাভাবনা করেই মাত্র ২১ দিন আগে এই কোয়েলের খামার গড়ে তুলেছি। ময়মনসিংহের জারিয়া এলাকা থেকে ৫০০ স্ত্রী জাতের কোয়েল ও ৩০০ পুরুষ জাতের কোয়েল সংগ্রহ করে এনেছি। এক জোড়া কোয়েল কিনতে খরচ পড়েছে ২০০ টাকার মতো। এসবের মধ্যে ১৫ দিন পর থেকেই ১৫০টি কোয়েল ডিম পাড়ছে। এখন প্রতিদিন বিকেলে ১৫০টি ডিম সংগ্রহ করি। প্রতিটা ডিম বিক্রি করছি পাঁচ টাকায়। এলাকায় চাহিদাও রয়েছে।

ডিমের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আরও ৩০০ কোয়েল আনতে বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ যাচ্ছি। আর প্রতি জোড়া কোয়েল বিক্রি করছি ২৫০ টাকায়। কোয়েল পালনের একটি লোহার খাঁচা বিক্রি করছি ৩০০ টাকায়। একটি খাঁচায় ছয়টি কোয়েল পালন করা যায়। প্রতিদিন কোয়েলের ডিম বিক্রি করে ৭৫০ টাকা আয় হয়। কোয়েলের খাদ্যের পেছনে খরচ হয় ৩৫০ টাকা। ফলে আমার ৪০০ টাকা প্রতিদিন আয় হচ্ছে।’ ১২ কিলোমিটার দূরে বাঘাইহাট থেকে কোয়েল কিনতে এসেছেন মো. রমজান ও মো. রাসেল। তাঁরা জানান, ৫০০ টাকা দামে দুই জোড়া কোয়েল কিনেছেন তাঁরা।

কোয়েলের সেদ্ধ ডিম কিনতে এসেছে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মো. জাকারিয়া ও সাকিবুল হাসান। তারা বলে, স্কুলের টিফিনের টাকা দিয়ে প্রতিদিন তারা কোয়েলের ডিম কিনে খায়। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বলে বারবার খেতে ইচ্ছে হয়।
রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের পরামর্শক পলাশ নাগ প্রথম আলোকে বলেন, কোয়েলের ডিমে প্রচুর আমিষ, ভিটামিন বি-১, ভিটামিন বি-২, লোহা, ফসফরাস, এনাজাইম ও অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে। এই ডিম খেলে শরীরের সব ধরনের পুষ্টির অভাব পূরণ হয়। শরীরের কার্যক্ষমতাও বাড়ে।

পাবলখালী কৃষি ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গীতা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘কামাল হোসেন কোয়েলের খামার করে সফলতা পেয়েছেন। দীঘিনালার জন্য কোয়েলের খামার একটি নতুন সম্ভাবনা। আমি এখনো সরেজমিনে খামারটি দেখিনি। খামারটি দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।’

Check for details
SHARE