Yahoo! প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার পেছনে ভুল সিদ্ধান্তগুলো!

এক সময়ের দাপুটে সার্চ ইঞ্জিন ইয়াহুর ইন্টারনেট ভিত্তিক ব্যবসা মাত্র ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে সম্প্রতি অধিগ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়্যারলেস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভেরিজন। ১৯৯৪ সালে জেরি ইয়ং এবং ডেভিড ফিলো নামের দুই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইয়াহু। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে অবশ্য এটি সার্চ ইঞ্জিন ছিল না। সে সময় ইয়াহু অধিক পরিচিত ছিল ‘ইয়াহু ডিরেক্টরিজ’ যা ব্যবহারকারীদের কাছে ছিল তুমুল জনপ্রিয় একটি ওয়েব সেবা। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে ইয়াহু বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ‘ডট কম’ যুগের শুরুর সেই সময়টাতে ইয়াহুর শেয়ারের মূল্য থাকত অনেক বেশি।

২০০০ সাল থেকে অনলাইন সার্চের জন্য গুগল সার্চ ব্যবহার করতে শুরু করে ইয়াহু। পরবর্তী চার বছরের মধ্যে নিজেদের সার্চ ইঞ্জিন ডেভেলপ করে প্রতিষ্ঠানটি যা ২০০৪ সালে চালু করা হয়। গুগলের জিমেইলের সাথে টেক্কা দিতে ২০০৭ সাল থেকে আনলিমিটেড ইমেইল স্টোরেজ দিতে শুরু করে ইয়াহু।

২০০৮ সালে বেশ বড় একটি ধাক্কা খায় ইয়াহু। টিকে থাকতে এ বছর বিপুল সংখ্যক কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়। মজার বিষয় হলো, এ বছরই ৪৪.৬ বিলিয়ন ডলারে ইয়াহুকে কিনে নিতে চেয়েছিল মাইক্রোসফট। কিন্তু প্রস্তাবিত এই মূল্যে ইয়াহুকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, এমন যুক্তি দিয়ে তাতে রাজি হয়নি ইয়াহুর পরিচালনা পর্ষদ। পরবর্তী তিন বছরের অবশ্য ইয়াহুর বাজারমূল্য ২২.২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

২০১২ সালে আবারও ধাক্কা খায় ইয়াহু। নতুন সিইও হিসেবে স্কট থম্পসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মী ছাঁটাইয়ের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। চিফ প্রোডাক্ট অফিসার ব্ল্যাক আরভিংসহ বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় নির্বাহী চাকরি ছেড়ে দেন। এরই কিছুদিন পর ২ হাজার কর্মী ছাঁটাই করার ঘোষণা দেয় ইয়াহু। তবে খুব বেশিদিন থম্পসন এই দায়িত্বে থাকতে পারেননি। একই বছরের জুলাইতে নতুন সিইও হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন মারিসা মেয়ার। মেয়ার পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে ইয়াহু। এর মধ্যে আছে ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম টাম্বলার। ২০১৩ সালে অপর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রকমেল্ট অধিগ্রহণ করে সার্চ ইঞ্জিন ইয়াহু।

মূলত মারিসা মেয়ারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সবার প্রত্যাশা ছিল ঘুরে দাঁড়াবে ইয়াহু। মারিসা মেয়ারের কর্মকাণ্ডে তেমন প্রতিফলনও ছিল। তবে সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এ বছরের শুরুর দিকে ইয়াহুকে অধিগ্রহণের জন্য দাম হাঁকাতে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর সবশেষে সফল হয় ভেরিজন।

ইয়াহুর যত ভুল পদক্ষেপ
ইয়াহুর এই পরিণতির জন্য প্রতিষ্ঠানটির নেওয়া কিছু ভুল পদক্ষেপকেও দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। এখন পর্যন্ত এমন কিছু সুযোগ পেয়েছিল ইয়াহু যেগুলো গ্রহণ করলে ইয়াহু এখন থাকতে পারতো প্রযুক্তির বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে। ইয়াহুর এমনই কিছু ভুলের কথা জেনে নেওয়া যাক-

সুযোগ পেয়েও কমদামে গুগলকে না কেনা
গুগল চালু হওয়ার ১৯৯৮ সালে মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিল ইয়াহু। কিন্তু তখন ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। ইয়াহু তখন হয়তো ভেবেছিল অনলাইন জগতে তাদের এই একক আধিপত্য বজায় থাকবে যুগ যুগ ধরে। মজার বিষয় হলো, এই সুযোগ আবারও পেয়েছিল ইয়াহু। ২০০২ সালে ৩ বিলিয়ন ডলারে নিজেদের স্টার্টআপ বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে আবারও ইয়াহুর দরজায় কড়া নেড়েছিলেন পেজ ও ব্রিন। কিন্তু এবারও রাজি হলো না ইয়াহু।

ফেসবুক কেনার সুযোগ হাতছাড়া করা
২০০৬ সালে যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে ফেসবুক, তখন মাত্র এক বিলিয়ন ডলারে এটি ইয়াহুর কাছে বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্ক জাকারবার্গ। কিন্তু ইয়াহু দাম হাঁকায় ৮৭৫ মিলিয়ন। মাত্র ১২৫ মিলিয়ন ডলারের জন্য সোনার ডিমপাড়া এই হাঁস ছেড়ে দিল ইয়াহু।

মাইক্রোসফটের ডাকে সাড়া না দেওয়া
আবারও একটি বড় সুযোগ পেয়েছিল ইয়াহু। ২০০৮ সালে এসে মাত্র ৪.৮ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি হতে রাজি হলেও ২০০৮ সালে মাইক্রোসফটের ৪৪ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণের প্রস্তাবে রাজি হয়নি ইয়াহু। অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, এমন কারণ দেখিয়ে তাতে তখন সায় দেয়নি প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা। ইঞ্জিন

সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে ব্যর্থ হওয়া
অনলাইন জগতে ইয়াহুর আবির্ভাব হয়েছিল একেবারে উপযুক্ত একটি সময়ে। কিন্তু বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিভিন্ন সময়ে ব্যর্থ হয়েছে ইয়াহু। ইয়াহুর একটি বড় ব্যর্থতা ছিল সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে না পারা। ওয়াই কম্বিনেটরের কো-ফাউন্ডার পল গ্রাহাম একসময় কাজ করেছেন ইয়াহুতে। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট নিয়ে বিনিয়োগকারীরা ছিলেন বেশ আগ্রহী। এর একটি অন্যতম কারণ ছিল ইয়াহুর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি। আর তাই তারা বিভিন্ন ইন্টারনেট স্টার্টআপে বিনিয়োগ করতে শুরু করলেন।

স্টার্টআপগুলো গ্রাহক পাওয়ার জন্য এই টাকা দিয়ে ইয়াহুতে বিজ্ঞাপন দিতো। এর মাধ্যমে ইয়াহু্র আয় বাড়তে লাগলো এবং বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে আগ্রহী হতে থাকলো।’ ইয়াহু ঠিকঠাকমতোই চলছিল। কিন্তু এ সময় ‘শখের বশে’ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করে ইয়াহু। এর মধ্যে আছে জিওসিটিজ, টাম্বলার ও ব্রডকাস্ট ডট কম। এর মধ্যে টাম্বলার ও ব্রডকাস্ট অধিগ্রহণকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইঞ্জিন

সফল সেবাগুলো ব্যর্থ হওয়া
ইয়াহুর সফল কিছু ওয়েব ভিত্তিক সেবার মধ্যে অন্যতম ছিল ইয়াহু অ্যানসার, ইয়াহু মেইল এবং ফ্লিকর। কিন্তু অধিগ্রহণের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে এদিকটায় একেবারেই কোনো উন্নয়ন করেনি ইয়াহু। আর এরই ফলশ্রুতিতে এই বাজারগুলো দখল করে নেয় যথাক্রমে কোরা, জিমেইল এবং ইনস্টাগ্রাম।

আলিবাবার শেয়ার বিক্রি
২০০৫ সালে চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার ৪০ শতাংশ শেয়ার মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারে কিনেছিলেন জেরি ইয়াং। সে হিসেবে এখন আলিবাবায় ইয়াহুর ৮০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার থাকতো। কিন্তু ২০১২ এবং ২০১৪ সালে এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিক্রি করে দেয় ইয়াহু। বর্তমানে ইয়াহুর হাতে আছে আলিবাবার ১৫ শতাংশ মালিকানা।

তথ্যসুত্র: ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE