২১ কোটি বেতনের সিইও ছিলেন শরণার্থী!

ভারতীয় গৃহস্থালির রান্নাঘরে তিনি না থেকে পারেননি। নারীদের কাছে তাঁর ওপরে কোনো ব্র্যান্ড নেই। বিজ্ঞাপনে তাঁকে দেখলে একটু ভুতুড়ে লাগলেও, স্রেফ তাঁর উপস্থিতিই বিশ্বাসযোগ্যতা আর ব্র্যান্ডভ্যালু বাড়ায়। তিনি হলেন ধর্মপাল গুলাটি, মশলার জগতে কয়েক দশক ধরে কর্তৃত্ব করে চলা এমডিএইচ মশলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অধিপতি।

ভারতজুড়ে তিনি একজন কিংবদন্তী হিসেবে পরিচিত। দেখতে যদিও খুব চমৎকার নন, কিন্তু বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার অসাধরণ প্রণোদনামূলক গল্প জানতে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে দেশবিভাগের বেদনাবিধূর অতীতে।

তিনি পাকিস্তানের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিপিষ্ট হয়ে দশবছর বয়সে স্কুলের পাট চুকিয়ে বাবার মশলার ব্যবসায় লেগে যান। কিন্তু অস্থিরমতি যুবক এমন আনাড়ি বয়সে সহজেই হতাশ ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং বারবার ব্যবসা পরিবর্তন করতে থাকেন। মশলার পর ধরেন সাবানের ব্যবসা। এরপরই লাগলেন আবার কাপড়ের ব্যবসায়। খুব একটা সুবিধে না করতে পেরে হলেন পুরোদস্তুর ধান ব্যবসায়ী।

কিন্তু এসব ব্যবসার কোনোটিই তিনি বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। শেষ পর্যন্ত বাবার ব্যবসাতেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য, মশলার ব্যবসায় যেই একটু থিতু হচ্ছিলেন তখনই দেশভাগের ট্রাজেডি নেমে এলো লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে।

তিনি জানতে পারলেন, তাঁর জন্মস্থান শিয়ালকোট পড়েছে পাকিস্তানের অংশে! সাতচল্লিশের দেশভাগের তিন হপ্তা পর শতশত হিন্দু ও শিখের সঙ্গী হয়ে পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতের অমৃতসর এসে পৌঁছুলেন এবং সেখানে শরণার্থী ক্যাম্পে দিনকয়েক অবস্থান করে চলে এলেন দিল্লীতে।

পাকিস্তান ত্যাগ করার আগে বাবা তাঁকে যে ১৫০০ রুপি দিয়েছিলেন, তার সিংহভাগই খরচ করলেন ঘোড়ার টং কেনাতে। এরপর দু’আনা পয়সায় কনাট থেকে কারলবাগ যাত্রী পারাপার শুরু করলেন।

এই দিনগুলো ছিলো চরম দারিদ্র্য ও উদগ্র কষ্টের দিন। সারাদিন যাত্রী হাঁকাহাঁকি করেও দিনশেষে ধর্মপালজ্বীর চাহিদা মেটানোর মত অর্থ নিয়ে ঘরে ফেরা হতো না। ঋণের দায়ে মানুষ তাঁকে হাঁটোঘাটে অপমান করতো। ফলে তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গে আর একটা দিনও কাটাতে চাইলেন না। শিগগির টং বেঁচে একটা দোকান ভাড়া নিয়ে মশলার দোকান দিয়ে বসলেন আবার!

বাবার শেখানো মশলা তৈরির জাদুকরী পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে মাহাশিয়ান ডি হাটি (এমডিএইচ) নামে মশলা বানাতে শুরু করলেন। মাত্র মাসকয়েকের মধ্যেই মানুষের মুখেমুখে এই মশলার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। এই যশকে কাজে লাগাতে একটুও ভুল করলেন না ধর্মপাল।

১৯৫৩ সালে চাঁদনী চকে বিশাল ব্যয়ে দ্বিতীয় দোকান খুলে বসলেন তিনি। দিনদিন বাড়তে থাকলো আয়। ছয় বছর পরে কীর্তিনগরে ব্যাপক পরিসরে মশলা উৎপাদনের জন্য প্রথমবারের মত এক টুকরো জমি কিনলেন।

‌বর্তমানে এমডিএইচ তাদের ৬০ টির বেশি পণ্য ১০০ টিরও বেশি দেশে বিক্রয় করে থাকে। স্ত্রী, একপুত্র ও ছয় কন্যার দায়িত্ব মাথায় নিয়েও একটি সফল ব্যবসা দাঁড় করাতে পেরেছিলেন ধর্মপালজ্বী। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ধনুক ভাঙা পণ তাঁর ব্যবসাকে ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, ইরান, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে পৌঁছিয়ে দিয়েছে।

এত বছরের কঠোর পরিশ্রম ফলে এমডিএইচ বর্তমানে ১৫০০ কোটি রুপির একটি প্রতিষ্ঠান। ধর্মপাল এখন সর্বোচ্চ বেতনধারী সিইও। সর্বশেষ তিনি কত বেতন নিয়েছেন জানেন? – ২১ কোটি রুপি!

শুধু সেরা একজন উদ্যোক্তাই নন, ধর্মপাল একজন মানবহিতৈষী মানুষও বটে। বেতন থেকে পাওয়া আয়ের ৯০ শতাংশই তিনি অসহায় মানুষের সহায়তায় ও কল্যাণমূলক কাজে বিলিয়ে দেন! তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা এমডিএইচ ২০ টিরও বেশি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে! তিনি ‘মহাশয় চুনি লাল চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ চালান, যার অধীনে ২৫০ টি বেডের একটি হাসপাতালের দেখভাল করা হবো। বস্তির বাসিন্দাদের জন্য তিনি একটি মোবাইল হাসপাতালও চালান। এই ট্রাস্টের আছে চারটি স্কুলও। দরীদ্র জনগনকে আর্থিক সহায়তাও দিয়ে থাকে এই ট্রাস্ট।

আদর্শবান এই মানুষটির মতে, কেউ যদি তার সেরাটা ঢেলে দিতে পারে, সেরাটাই তার কাছে ফিরে আসবে। বিস্ময়কর সাফল্যগাঁথায় ভরা এই মানুষটির জীবনকথায় যুবকদের জন্য রয়েছে উৎসাহ ও প্রণোদনা। তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র হচ্ছে, ‘পৃথিবীকে তুমি সেরাটা দাও, পৃথিবীও তোমার জন্য তার সেরাটাই করবে।’

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE