হালাল উপার্জনের সুন্দরতম পথ ব্যবসাকে বেছে নিয়েছি!

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা হালাল হওয়ার জন্য যে সমস্ত শর্তাবলি আছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো পণ্যের যে গুণাগুণ বর্ননা করা হবে, বাস্তবে পণ্যের মাঝে সেই গুণাগুণ বজায় রাখা। যদি পণ্যের বর্ণিত গুণাগুণ ও বাস্তব গুণাগুণ এক না হয় তাহলে, সে-পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ হবে না।

এম মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজ- ১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারি তার মাতুলালয় চাদঁপুর জেলার মতলব থানাধীন পশ্চিম লালপুর মিয়াজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে তিনি একজন মেধাবী আলেম, অভিজ্ঞ অর্থনীতি বোদ্ধা, দক্ষ আলোচক, যোগ্য প্রশিক্ষক এবং উদীয়মান তরুণ ব্যবসায়ী। তার দাদাবাড়িও একই থানার এখলাছপুর গ্রামে। তার বাবা মাহফুজুর রহমান ছিলেন পাকিস্তান আমলে এখলাছপুর প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার আব্দুল আজিজের দ্বিতীয় পুত্র, সে আমলে যার ছাত্র ছিলেন সাবেক পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, আল-রাজী হাসপাতালের কর্ণধার ডা. মোস্তফা জামানসহ বর্তমান সময়ের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। ইবনে মাহফুজের শৈশব কাটে নানাবাড়িতে।

ছাত্রজীবনে তিনি নিজগ্রাম এখাছপুর প্রাইমারী স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়াশোনা করেন। কিন্তু পিতার চাকরির সুবাদে ১৯৯১ থেকে বহুবার পিতার সাথে মাদরাসার পরিবেশে যাতায়াতের এক পর্যায়ে সকলের বাধা ও আপত্তি উপেক্ষা করে ১৯৯৪ সালে স্কুল ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের কাশীপুরে ‘কাছেমুল উলুম মাদানিয়া’ মাদরাসায় ইবতেদায়ি বিভাগে ভর্তি হন।

২০০২ সালে একই মাদরাসায় হেদায়েতুন্নাহু (মাধ্যমিক প্রথমস্তর) পড়া শেষ করেন তিনি। এরপর ২০০৩ সালে মুন্সিগঞ্জের রিকাবি বাজার মাদরাসা ও ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া মাদারাসায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর সমাপন করে নারায়ণগঞ্জ দেওভোগ মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (স্নাতকোত্তর) সম্পন্ন করেন। জনাব মোফাজ্জল ছাত্রজীবন থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মাদরাসার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাস সমাপ্ত করার পর ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতির ধারায় আরো বেশি সংযুক্ত হন তিনি।

বর্তমানে তিনি বারাকাত এন্টারপ্রাইজেস (এন্টারপ্রাইজেস, বারাকাত মার্কেটিং কর্পোরেশন, বারাকাত কনজ্যুমার প্রোডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, বারাকাত লজেষ্টিক) এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। এছাড়া আস্হাব কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের মার্কেটিং ডিরেক্টর, কালার মিডিয়া প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স-এর চেয়ারম্যান, বুশরা ট্রেড ইন্টান্যাশনাল কর্পোরেশন (বিটিআইসি) লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রিয়েল স্টেট অ্যান্ড হাউজিং ডেভেলপমেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড মার্কেটিং ব্যবসার একজন দক্ষ কর্ণধার।

কর্মজীবনে এসে তিনি বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের অধীনে ইসলামী অর্থনীতি ও মার্কেটিং উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং দেশে ও দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত অর্থনীতি বিষয়ক নানা কর্মশালায়ও অংশগ্রহণ করেছেন। দেশ ভ্রমণ ইতোমধ্যে এম মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজের একটি আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি মালয়েশিয়া, ভারত, নেপাল, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কমার্শিয়াল সেমিনারে অংশগ্রহণ করে সুনাম কুড়িয়েছেন।

শিক্ষাজীবন থেকেই আমি ছোট-খাট ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। অথবা এভাবে বলা যায়, আমার কর্মজীবন মূলত ছাত্রজীবন থেকেই শুরু হয়েছে। প্রিয় দাদা ও আপন ছোট ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকাহত বাবা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাদের পরিবারে সীমাহীন দুর্ভোগ নেমে আসে। নিজের শিক্ষা-উপকরণের খরচ যোগাতে তখন শহরের পাইকারি মার্কেট থেকে স্টেশনারী সামগ্রী কিনে সহপাঠীদের কাছে বিক্রি করতাম।

বাবার চিকিৎসা খরচ ও অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে চললে বাবার জমানো অর্থকড়িও ফুরিয়ে আসে, তখন একদিকে পরিবার ও অন্যদিকে বাবার চিকিৎসার ভাবনায় মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে সরাসরি ব্যবসায় নেমে যাই। গার্মেন্টস থেকে রিজেক্ট তৈরি পোশাক কিনে ফেরি করে কিংবা ফুটপাতে বসে বিক্রি শুরু করি। তখন আমার বন্ধু, সহপাঠী ও দীনি ভাইদের মধ্যে কয়েকজন মহামানব ফেরেশতার মতো এগিয়ে এসেছিলেন, যাদের কাছে সারাজীবন আমি ঋণী হয়ে থাকবো।

আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন। অর্থাৎ পারিবারিক প্রয়োজনের খাতিরেই প্রথমে আমাকে ব্যবসার পথ বেছে নিতে হয় এবং সেই ছেলেবেলা থেকে নানা কারণে এই ভাবনাটা আমার মধ্যে প্রবল আকারে দানা বেঁধে ওঠে যে, অনেক ভালো কাজ করা এবং অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সচ্ছলতা খুব প্রয়োজন। ধীরে ধীরে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে, দীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যেই হালাল অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসাই সবচেয়ে সুন্দরতম পথ।

চুন খেয়ে মুখ পোড়ার পর দই দেখে ভয় পাওয়ার মতো অবস্থা হলে যা হয়- আমাদের অবস্থাও এখন তদ্রুপ হয়েছে। কো-অপারেটিভ বা সমবায় সমিতি নামধারি কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ প্রতারিত হয়েছে ঠিক। তারা যেমনিভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা মেরেছে, ঠিক তেমনিভাবে কিছু সাধারণ মানুষও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের টাকা মেরে উদ্যোক্তাদের সর্বস্বান্ত করেছে। এজন্যে কি আমরা সকল ‘সাধারণ মানুষ’কে প্রতারক বলি?

দুয়েকজন মানুষের প্রতারণার কারণে যদি আমরা সকল ‘সাধারণ মানুষ’কে প্রতারক না বলি বা অবিশ্বাস না করি তাহলে কেন, দুই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণে সকল কো-অপারেটিভ ব্যবসা বা সমবায় সমিতিকে প্রতারক মনে করব? সরকার কো-অপারেটিভ ব্যবসার বা সমবায় সমিতির অনুমতি দিতে নারাজ- এ কথাটি মনে হয় ঠিক নয়। বরং এভাবে বলা উচিত যে, যাতে করে কোনো কো-অপারেটিভ ব্যবসা অথবা সমবায় সমিতি দ্বারা কোনোভাবে আর সাধারণ মানুষ প্রতারিত না হয়- এদিকে লক্ষ্য রাখতেই অনুমোদন প্রক্রিয়াটাকে নিখুঁত ও স্বচ্ছ করার চেষ্টা করছে সরকার।

কয়েক বছর পূর্বে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন মুফতি সাহেবের সাথে পরামর্শ করেছিলাম, কিন্তু তাদের কাছ থেকে আশানুরুপ সাড়া পাইনি। আমাদের দেশে যে সমস্ত পণ্য ইমপোর্ট হয় সেগুলোর ইগ্রেডিয়েন্স শতভাগ হালাল কি না তা নিয়ে সংশয় থাকাটা খুবই স্বাভাবিক, যেহেতু আমাদের দেশে মুসলিম ও অমুসলিম সকল দেশ থেকেই খাদ্য ও প্রসাধনী আসে। সমস্যা নিরসনের জন্যে হালাল সার্টিফিকেশন পদ্ধতি চালু করা অতীব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সর্বস্তরের বিজ্ঞ মুফতি ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত একটি প্রতিনিধি দল অবশ্যই থাকবেন, যাদের নিয়ে হালাল সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠিত হবে।

আরও আগেই এই পরিম-লে আলেমদের এগিয়ে আসা দরকার ছিল। তারা হয়তো ভাবছেন যে, আমাদের দেশের মানুষ এখনও বাহিরে খাবারের প্রতি এতোটা অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। অথচ আমাদের দেশের উৎপাদিত পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের অধিকাংশের উপকরণ কিন্তু বিদেশ থেকেই আসে। সুতরাং আমাদের দেশের ৯০ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনে এ বিষয়ে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

ব্যবসায়ী যদি সরকারকে সঠিকভাবে কর প্রদান না করেন তবে রাষ্ট্র ও সরকারি উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্থ হবে যা ইসলামি আইন ও দেশীয় সংবিধান অনুযায়ী অপরাধ। তবে বর্তমানে কর দিলে সরকারের অনেক শরীয়ত পরিপন্থী কাজের সাথে শামিল হওয়ারও নামান্তর হয়ে যায়। রাষ্ট্রকেও এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে যেন, ব্যবসায়ীদের প্রতি এমন অতিরিক্ত কর আরোপ না করা হয়, যার কারণে সাধারণ মানুষের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে। কেননা, ব্যবসায়ীরা তার করের অর্থটি পণ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই আদায় করে থাকে। তাই সরকারের উচিত এ বিষয়টি বিবেচনা করে ব্যবসায়ীদের প্রতি সুবিধাজনক কর আরোপ করা।

সলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা হালাল হওয়ার জন্য যে সমস্ত শর্তাবলি আছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো পণ্যের যে গুণাগুণ বর্ননা করা হবে, বাস্তবে পণ্যের মাঝে সেই গুণাগুণ বজায় রাখা। যদি পণ্যের বর্ণিত গুণাগুণ ও বাস্তব গুণাগুণ এক না হয় তাহলে, সে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ হবে না। যে-কোনো কোম্পানীর বিজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্যই থাকে, তাদের পণ্যের গুণাগুণ বর্ণনা করা। সুতরাং বাস্তবে যদি পণ্যের সাথে তাদের বর্ণিত গুণাগুণের মিল খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিজ্ঞাপন মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হবে এবং মিথ্যা বিজ্ঞাপন থেকে উপার্জিত অর্থ কিছুতেই হালাল হতে পারে না।

তথ্যসূত্র: প্রিয় ডটকম।

Check for details
SHARE