সড়ক দূর্ঘটনায় পা হারিয়েও দমে যাননি!

আকাশেতে কত রং ছিলো, সবুজ লালে রাঙা ঝলমল, তবু দুঃখে ভরা নীল রং, বিধি কেন আমাকে দিলো’ সঙ্গীতের এ দুটি লাইনের সঙ্গে গানটির গীতিকারের রয়েছে জীবন্ত মিল। স্বপ্নের ডানা মেলে যখন মফস্বল শহরের এক গীতিকার উড়েছিল দূর নীল আকাশে ঠিক তখনি যেন তার জীবনে নেমে এলো দুঃখে ভরা নীল বেদনা।

শহরের রাঙাপানি সড়কের সনাতন পাড়া এলাকার বাসিন্দা মিঠুন দেব মিঠু। সনাতন ঘরে জন্ম নেয়া এ মানুষটি অন্য সকল সুস্থ মানুষের মতো হেঁটে-চলে জীবন পরিচালনা করতেন। বাবা ছিলেন কারখানার কর্মচারী, মা সংসার নিয়েই ব্যস্ত। মিঠুন ছিলেন চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে মেজ। ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিলো তার দু’চোখ জুড়ে। মনের ক্যানভাসের আঁকা সকল কথায় তিনি লিখতেন গানে গানে। এসএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছে তার। তারপরই নেমে আসে জীবনের চরম মুহূর্ত। ১৯৯৯ সালে ২২ জুন তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলেন তার বাম পা।

একটি পা হারিয়ে মিঠুন ঘরে বন্দি হয়ে গেলেন। তার দু’চোখ জুড়ে শুধু স্বপ্ন ভাঙার আর্তনাদ। তাই তো তিনি গানে গানে লিখেছেন ‘আলোর পৃথিবী আধারে ভরিবে সব আশা আমার ভেঙে দিয়ে।’

কিন্তু আশা ভাঙার আর্তনাদ শেষ পর্যন্ত তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া এই স্বপ্নবাজ মিঠুন কৃত্রিম পা লাগিয়ে চলতে শুরু করেন নতুনভাবে। জীবন সংগ্রামে পরিবারের বোঝা না হওয়ার জন্য তিনি শেখেন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের মেরামতের কাজ। পরে একটি দোকান দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন।

ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য মেরামতের পাশাপাশি তিনি নিজেই তার জীবনে ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের মেরামতের কাজ শুরু করেন। লিখতে থাকেন তার মনের সকল দুঃখ, কষ্টের কথা গানে গানে। তিনি গানে গানে লেখেন ‘যত দুঃখ আছে এ মনে, সাগরেও নেই তত জল, তবুও তোমারে জানতে দিবো না, কি আগুনে পুড়ি আমি অবিরল।’

এমনই শত গান তিনি রচনা করেন, মাঝে মাঝে সুরও করেন। তার রচিত গান প্রচারের স্বপ্ন নিয়ে তিনি হাজির হন বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি আঞ্চলিক শাখায়। ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি মিঠুনের রচিত ‘মনের যত দুঃখ’ গানটি প্রচার করা হয়। সে দিনের কথা বলতেই তার চোখ ঝলমল করে ওঠে। এ যেনো স্বপ্ন ছুঁয়ে যাওয়ার এক অনুভূতি, প্রতিবন্ধকতা জয় করে স্বপ্ন জয়ের আনন্দ।

প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বপ্নবাজ এ মানুষটির ইচ্ছা তার গান একদিন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, বড় বড় শিল্পীরা তার গান সুর করবে এবং গাইবে। তার এই স্বপ্নপূরণে সবচেয়ে কাছে পেয়েছেন তার মাকে। বর্তমানে বাবা, মা, স্ত্রী ও ৪ বছরের এক সন্তানকে নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন।

তার রচিত গান সম্পর্কে কথা হয় বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি আঞ্চলিক শাখার উপ আঞ্চলিক পরিচালক এসএম মোস্তফা সরোয়ারের সঙ্গে। তিনি জানান, মিঠুন বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি আঞ্চলিক শাখার একজন তালিকাভুক্ত গীতিকার। তার রচিত বেশ কয়েকটি গান প্রচার হয়েছে। তিনি তার জীবনে হাজারো প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তার প্রতিভা বিকাশের জন্য উৎসাহ দিয়ে থাকি। আশা করি তিনি আরও এগিয়ে যাবেন।

তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ বিডি ডটকম।

Check for details
SHARE