সেরা ব্যবসায় জাহাজ রপ্তানী!

৫ বছরে ২৫ জাহাজে আয় ১৫০ মিলিয়ন ডলার: ৬ দেশের জন্য ২১ জাহাজ নির্মাণের কাজ চলছে : নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিয়ে ব্যাংকঋণের সুদ কমলে বাজার আরো খুলে যাবে। ‘আদার বেপারীর জাহাজের খবর’ পুরনো এই প্রবাদ বাক্যটির অর্থই হলো জাহাজের কারবার অনেক বিশাল কাজ-কারবার! পুরনো জাহাজ আমদানি করে ভেঙে ব্যবসা করা অর্থাৎ শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের ব্যবসায় থেকে নতুন জাহাজ তৈরি বা শিপবিল্ডিং ইয়ার্ডের ব্যবসার জগৎ বিশাল ব্যাপক। সমুদ্রগামী মার্চেন্ট জাহাজ এমনকি যুদ্ধজাহাজ-নৌযানের মানসম্মত নির্মাণ ও রফতানিকারক নতুন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই করে নিয়েছে বাংলাদেশ। যদিও এ মুহূর্তে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এই খাতটি। অস্ত্রশস্ত্র ও ভোগ্যপণ্যের পর বিশ্বের সেরা এবং পুরনো ব্যবসায় খাত হচ্ছে জাহাজ নির্মাণ। আগের সীমিত গÐি নিছক পুরনো জাহাজ ভেঙে লোহা-লক্কর সংগ্রাহক দেশের পরিচিতি থেকে বেরিয়ে আসলেও অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় এই খাতের বলিষ্ঠ অবস্থান এখনও আয়ত্তে আসেনি।

যদিও তা নাগালে এসেই হাতছানি দিচ্ছে। খাতটিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অবকাঠামো সৃজন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন। আরও দরকার শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রধানত দরকার সর্বাধুনিক মানের শিপইয়ার্ড। বাংলাদেশে তৈরি জাহাজ কেনার জন্য ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও আফ্রিকান কয়েকটি দেশ থেকে সরবরাহ অর্ডার (ফরমায়েশ) পাওয়া যাচ্ছে। তবে ইয়ার্ডসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো, শিল্প প্রসারে সহায়তা ও প্রণোদনা সুবিধা নিশ্চিত না হলে অচিরেই বিরাট সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ থেকে গত ৫ বছরে মোট ২৫টি সাগর-মহাসাগরগামী জাহাজ রফতানির মাধ্যমে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আয় করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা সত্তে¡¡ও দেশের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ২১টি জাহাজ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যেগুলো রফতানি করা হবে ৬টি দেশেÑ নরওয়ে, ডেনমার্ক, কেনিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গামবিয়া ও ভারত। আগামী এক বছরে রফতানিমুখী সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা মূল্যের জাহাজ নির্মাণের কাজ চলবে। এই আয় দ্বিগুণ অনায়াসেই উন্নীত হতে পারে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পখাতে রফতানি আয়ে প্রকৃত মূল্য সংযোজনের হার শতকরা ৩৪ থেকে ৩৮ ভাগ। গার্মেন্টস খাতসহ অধিকাংশ রফতানিমুখী শিল্পে রফতানি আয়ে এত অধিক পরিমাণে মূল্য সংযোজন আসে না।

এদিকে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে সরকারের সমন্বিত সহযোগিতা ও সুনির্দিষ্ট সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছে সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমুর সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সভায়। রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণশিল্প মালিকদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপবিল্ডিং অব বাংলাদেশ (এইওএসআইবি) নেতৃবৃন্দের সাথে শিল্পমন্ত্রীর এ সভা সূত্রে জানা গেছে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগকৃত মূলধনের উচ্চহারের সুদে গৃহীত ঋণের ভর্তুকি প্রদানের জন্য সরকারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সভায় এইওএসআইবি’র জেনারেল সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন জাহাজ নির্মাণশিল্পের বর্তমান অবস্থা, বিশ্ববাজারের আলোকে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণশিল্পের পরিস্থিতি এবং বিগত বছরগুলোতে দেশের অথনৈতিক উন্নয়নে এ শিল্পখাতের অর্জন ও অবদানের বিষয় তুলে ধরেন। এইওএসআইবি জানায়, জাহাজ নির্মাণ শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি পোশাক শিল্পের মতোই আরও একটি প্রধান রফতানি খাতে পরিণত হয়েছে। খাতটি অতি স্বল্প সময়ে বিশ্ববাজারে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুণগত মানসম্মত ২৫টি জাহাজ রফতানির মাধ্যমে গত ৫ বছরে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আয় হয়েছে। ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু দেশ তাদের নতুন জাহাজ নির্মাণের জন্য যোগাযোগ করছে। চাহিদা সামনে রেখে জাহাজ নির্মাণশিল্প মালিকরা প্রত্যাশা করছেন, প্রতি বছর ৩০টি জাহাজ বাংলাদেশের শিপ ইয়ার্ডসমূহে নির্মিত হবে। যার মূল্য বছরে এক হাজার কোটি টাকা।

ইঞ্জিঃ সাখাওয়াত হোসেন জানান, আশাব্যঞ্জক ফলাফল সত্তে¡ও বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আর্থিক সমস্যা মোকাবেলা করে যেতে হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণশিল্পে যারা অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছেন তারা সবাই এখন সমস্যায় রয়েছেন। সরকার ভর্তুকি না দিলে এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকা কঠিন হবে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ এবং ২০ বছর মেয়াদে দেয়া হলে এ শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কেননা জাহাজ তৈরি ও রফতানিকারক চীন, কোরিয়া, ভারতসহ অন্যসব দেশের জাহাজ নির্মাতারা তাদের মূলধন বিনিয়োগে সরকারের কাছ থেকে অত্যন্ত স্বল্প সুদের হারে ঋণসুবিধা, ভর্তুকি ও বিশেষ রফতানি সহায়তা লাভ করে থাকে। যেমনÑ জাপান, কোরিয়া, চীনে প্রায় ২৫ বছর মেয়াদে ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। ভারত ১০ বছর মেয়াদে ২০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে। ক্রম বিকাশমান জাহাজ নির্মাণ শিল্পখাতকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হলে জিডিপি বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হবে। একই সাথে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য হাসিল করা সহজতর হবে।

এদিকে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা আইএমও’র আইএসপিএস কোড (জাহাজ ও বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ)সহ বিভিন্ন বিধি-প্রবিধান ও কনভেনশন অনুযায়ী, জাহাজ-ট্যাংকার স্টিমারের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নততর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত লে-আউটের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর জন্য ২৫ বছরের বেশি পুরনো জাহাজসমূহ পরিত্যক্ত ঘোষণা করে এর বদলে প্রত্যেক দেশকেই নতুন জাহাজ প্রতিস্থাপনের বাধ্যবাধকতা আরোপিত হচ্ছে। এতে কেবল ইউরোপীয় দেশগুলোকেই বছরে প্রায় ৩ হাজার জাহাজের স্থলে নতুন জাহাজ যোগ করতে হবে। এ অবস্থায় চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের সবক’টি শিপইয়ার্ড গত ৫/৭ বছরে অগ্রিম বুকড হয়ে গেছে। তবে সেসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক সুলভে দক্ষ, অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ শ্রম সুবিধা রয়েছে। বঙ্গোপসাগর উপকূল ও নদ-নদী অববাহিকায় অনুকূল ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে ইয়ার্ড স্থাপনের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের নামি-দামি শিপিং লাইন ও কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের দিকে অধিকতর ঝুঁকে পড়ছে। তারা এখানে জাহাজ নির্মাণ ও ক্রয়-কারবার লাভজনক বিবেচনা করছে। এ ব্যাপারে চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাজ নির্মাণশিল্প বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এনামুল বাকী জানান, জাহাজ নির্মাণ ও রফতানিখাত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ব্যবসায় খাত। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য এ শিল্পের বিকাশ প্রয়োজন। কেননা এটি একটি মাদার ইন্ডাস্ট্রি। একে ঘিরে অনেক ধরনের উপখাত, লিংকেজ সহজেই গড়ে উঠবে। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের পথ সহজেই খুলে যাবে। সাগর উপকূল ঘেরা ও নদীমাতৃক দেশ হওয়ার কারণে এদেশে মানসম্মত সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের উপযোগী শিপইয়ার্ড স্থাপন সুবিধাজনক। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম প্রতিযোগী হলেও বাংলাদেশ জাহাজনির্মাণ খাতে সুবিধাজনক অবস্থানে উঠে আসার সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

শিপিং পোর্ট সার্কেল জানায়, পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে সুলভ, সহজ মাধ্যম হচ্ছে নৌ-পথ। বিশ্বে ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় খনিজ জ্বালানির সঙ্কট বৃদ্ধির কারণে আধুনিক মানসম্মত ও উন্নত প্রযুক্তির জাহাজ, ট্যাংকার, নৌযান নির্মিত হচ্ছে। এতে জ্বালানি সাশ্রয় ও কারিগরিভাবে নিরাপদ জাহাজ নির্মাণই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এ কারণে জাহাজ কেনার চাহিদা বেড়ে গেছে। জাহাজ নির্মাতা উন্নত দেশগুলোর কাছে ইয়ার্ড, জনবল ও অবকাঠামো সুবিধা খালি না থাকার কারণেই বাংলাদেশের জন্য এ খাতে খুলে গেছে অর্থনৈতিক বহুমুখী সম্ভাবনার দ্বার। আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রগামী জাহাজ-নৌযান নির্মাণের উপযোগী সুপরিসর পর্যাপ্ত ইয়ার্ড চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা শহরের অদূরেই গড়ে তোলা সম্ভব। যা এখন সময়োচিত উদোগে কাজে লাগানোই অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র: ডেইলি ইনকিলাব ডটকম।

Check for details
SHARE