সুস্বাস্থ্যে সঠিক খাবারই ওষুধ

সবাই সুখের সন্ধানী । সকল সৌন্দর্য ও সুখের মূলে রয়েছে সুস্বাস্থ্য।“ বল দেখি এ জগতে সুখী বলি কারে, / সতত আরোগী যেই , সুখী বলি তারে ।“ – ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখা কবিতার লাইনটি থেকেও সুখের সংজ্ঞা পাওয়া যায় । অর্থাৎ সুখী হবার মূলমন্ত্র হল সুস্বাস্থ্য । সুস্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ও সুখ একটি পর্যায়ক্রমিক ধারা । সুখী-সুন্দর জীবন-যাপন করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন রোগমুক্ত , সুস্বাস্থ্য । সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রথম এবং প্রধান শর্ত হল সুষম খাবার । আর এই সুস্বাস্থ্যের প্রধান অন্তরায় হল রোগ ।
রোগমুক্তির জন্য আমাদের ওষুধ সেবন করতে হয় ।ওষুধ সবারই পরিচিত , একটি অপ্রিয় বস্তু । ওষুধ বলতে আমরা জানি – যা আমাদের রোগ ভাল করে । চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ওষুধ হল- যা রোগ নির্ণয়ে , প্রতিকারে ও প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয় । সেক্ষেত্রে বলা যায়- খাদ্যও একটা ওষুধ । কারণ খাদ্য দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী করে ।

ওষুধ আমাদের দেহের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে উল্টেপাল্টে দেয় । তাই সব সময় ওষুধ খাওয়া ভাল নয় । নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে শরীর ভাল করলেও নির্দিষ্ট মাত্রার উপর এটি একটি বিষ । প্রত্যেক ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে । কোন একটি ওষুধ একটি রোগ ভাল করতে গিয়ে আরেকদিকে সমস্যা বাধায় । যেমন- অতিরিক্ত পেইনকিলার কিডনির সমস্যা করে । গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় ।

খাদ্য আমাদের বেঁচে থাকার জন্য জ্বালানী হিসেবে কাজ করে । খাদ্য বলতে আমরা যা খাই তা-ই নয় ; বরং শরীরকে সুস্থ্য রাখতে আমরা যা খাই তা-ই খাদ্য । খাদ্য দেহে শক্তি জোগায় , রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী করে । তাই রোগের প্রতিকারে ওষুধের পরিবর্তে রোগ প্রতিরোধে ওষুধ হিসেবে আমরা সঠিকভাবে সুষম খাবার গ্রহন করতে পারি । এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে । উপরন্তু খাবারের প্রতি সবারই দৃষ্টিভঙ্গি পজিটিভ । উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সিনথেটিক কারখানায় প্রস্তুত ক্যালসিয়াম ও আয়রন একসঙ্গে গ্রহন করলে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয় কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত খাদ্য গ্রহণ করলে মানবশরীর তা যথাযথভাবে গ্রহণ করে । বোতলে প্রাপ্ত ১০০০ মিলিগ্রাম এস্করবিক এসিডের (ভিটামিন- সি) তুলনায় আমলকী বা পেয়ারায় প্রাপ্ত অল্প পরিমান ‘ভিটামিন – সি’ এর কার্যকারিতা অনেক বেশি । তাই গবেষকরা বলে থাকেন- Nature is the best healer. অর্থাৎ নিরাময়ের ক্ষেত্রে প্রকৃতিই সেরা।

খাবার-দাবার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান বা সচেতনতা না থাকার পরিণাম বিভিন্ন রকম রোগ (যেমন- ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, ক্যান্সার, ভিটামিনের স্বল্পতা সহ অন্যান্য রোগ) প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকা আর শারীরিক বা মানসিক দুর্বলতা । বর্তমানে অনেকেই ভুলে গেছে যে, পুষ্টিকর ,সুষম খাবার গ্রহণ করে,স্বাস্থ্যবিধি মেনে সঠিক জীবন যাপনের মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য গড়ে তোলা সম্ভব ।আজ ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই ছোটখাট সমস্যার জন্য বিখ্যাত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে নামকরা হাসপাতালে ছুটে চলছে । ব্যয়বহুল ডায়াগনস্টিক টেস্ট করে, বিদেশি দামি দামি ওষুধের সংস্কৃতি চালু করছে । তারা ভাবছে স্বাস্থ্যকে সুন্দর রাখতে হলে এটাই করণীয় সঠিক উপায় । এই ভুল ধারনার কারণে আজ ধনী-দরিদ্র সকলের স্বাস্থ্যে বাসা বেঁধেছে রোগ-শোক ।

যে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য অবস্থা যত ভাল সে দেশ তত উন্নত । আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ জন মানুষের বিগত তিন মাসের ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে গড়ে প্রায় ১৭২ জন মানুষ অসুস্থ্য থাকে । গবেষণায় দেখা যায় যে , একজন ব্যক্তি রোগাক্রান্ত অর্থাৎ অসুস্থ্য হলে গড়ে ৫০০টাকার উপরে খরচ হয় যা নিম্নবিত্ত পরিবারের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক । ফলে পরিবারটি অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়ে । টাকা বাঁচিয়ে সঠিক খাবার না খেয়ে অসুস্থ্য হয়; অসুস্থ্য হয়ে জমানো টাকা খরচ করে । লক্ষ্যনীয় যে এতে জমানোর চেয়ে খরচের পরিমান বেশি হয়।দারিদ্র্য ও অসুস্থ্যতা চক্রাকারে চলতে থাকে ।

পৃথিবীর সকল দেশের মধ্যে জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে আমেরিকা । ২০১৪ সালের WHO ( World Health Organization ) এর রিপোর্ট অনুযায়ী আমেরিকা সরকার বছরে জনপ্রতি স্বাস্থ্যখাতে খরচ করে ৯৪০৩ ডলার । অন্যদিকে কিউবা সরকার খরচ করে জনপ্রতি ২৪৭৫ডলার । আমেরিকা সরকারের স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কিউবার থেকে অনেক বেশি । স্বাভাবিকভাবেই , আমেরিকার মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেশি হবার কথা ; কিন্তু বিস্ময়কর এই যে, দুই দেশেরই গড় আয়ু প্রায় সমান । আমেরিকার গড় আয়ু ৬৯.১ এবং কিউবার মানুষের গড় আয়ু ৬৯.২ । স্বাস্থ্য সেবায় ব্যয়ের বিশাল এই পার্থক্য সত্ত্বেও কিউবার জনগণের গড় আয়ু আমেরিকার প্রায় সমান হবার প্রধান কারণ কিউবার সরকার স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে রোগ প্রতিকার কর্মসূচি নয় বরং স্বাস্থ্য কর্মসূচি বিশেষত প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে নিশ্চিত করে ।

প্রায় ৭৫% রোগ মানসিক এবং খাবারের কারণে হয়ে থাকে । বাকি প্রায় ২৫% হয়ে থাকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস আক্রান্ত , ক্ষত , আঘাত , দুর্ঘটনা ইত্যাদির কারণে । খাবার গ্রহণে যেহেতু শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরী হয় তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য ওষুধের চেয়ে- নিরাপদ,সুষম খাবার বেশি কার্যকর । কারণ ওষুধ রোগ হবার পর তা প্রতিকার করে অন্যদিকে খাবার রোগ হওয়া থেকে শরীরকে রক্ষা করে অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ করে। বলা হয়ে থাকে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয় । তাই চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রিসের সাথে তাল মিলিয়ে বলছি- “ আপনার খাদ্যই হোক আপনার ওষুধ এবং ওষুধ-ই হোক আপনার খাদ্য ।“

লেখক:
সোনিয়া সুলতানা নওরিন
উদ্যোক্তার খোঁজে ডটকম।

Check for details
SHARE