সুস্থ্য থাকতে ইফতার ও সেহরীর খাবারে নিয়ম মেনে চলুন

চলছে পবিত্র মাহে রমজান। রমজান মানেই সংযমের মাস। কিন্তু মাসটি ঘিরেই যেন খাবারের উৎসব চলে। ইফতারের সময় বিশেষভাবে প্রাধান্য পায় বিভিন্ন তেলে ভাজা খাবার। আর তাতেই দেখা দেয় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, বুক-পেট জ্বালাপোড়া ও ব্যাথা। সুস্থ দেহে রোজা রাখতে চাইলে সেহরী ও ইফতারীর খাবারে কিছু নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

চলুন তাহলে জেনে নিই এ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:

কেমন হবে ইফতারি:

সারা দিন রোজা রাখার পর অনেক কিছু খেতে ইচ্ছে করে৷ কিন্তু দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে রোজার শেষে শরীর, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুকোষ খাবারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান চায়৷ তাই দীর্ঘ সময় পর ইফতারে খাবারটাও তেমন সহজ ও সুপাচ্য হওয়া চাই।
13453941_984812084965915_1265326063_n

১। ইফতার শুরু করুন খেজুর দিয়ে। ইফতারিতে দু’তিনটা খেজুর খেয়ে নিন। এতে শরীর দ্রুত চাঙ্গা হয়ে উঠবে। কারণ খেজুর চিনি, ফাইবার, শর্করা, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেশিয়ামের একটি সমৃদ্ধ উৎস, যা সারা দিন রোজা রাখার পর খুবই দরকারী।

২। শুরুতেই অনেকখানি পানি বা শরবত পান করবেন না। পানীয় জাতীয় জিনিস ধীরে ধীরে ইফতারের অন্য খাবারের ফাঁকে ফাঁকে খান।

৩। এ ছাড়া ইফতারিতে রাখুন ঘরের তৈরি শরবত, জুস, কচি শসা, মৌসুমি ফল। কারণ ফলে রয়েছে ভিটামিন ও মিনারেল। যা সারা দিনের পানির ঘাটতি পূরণ করবে ও শরীরে জোগাবে পুষ্টি। সবজি ও ফল খেতে হবে নিয়মমতো৷ তা না হলে এই সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্য হবে নিত্যসঙ্গী।

৪। ইফতারিতে তেহারি, হালিমসহ অতিরিক্ত তেলে ভাজা, ভুনা খাবার না খাওয়াই ভালো। এতে বদহজম হতে পারে।

৫।  এই গরমে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি না খেলে হজমের সমস্যা হবে৷ ইফতারের পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটু পর পর পানি খেতে হবে।

৬। কাঁচা ছোলা খাওয়া ভালো। তবে তেল দিয়ে ভুনা করে খাওয়া ঠিক নয়।

৭। বেশি দুর্বল লাগলে ডাবের পানি বা স্যালাইন খেতে পারেন ইফতারের পর।

কি খাবেন সেহরিতে:

সেহরির খাবার স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া প্রয়োজন। বেশি তেল, ঝাল, চর্বির জাতীয় খাবার সেহরিতে খাওয়া উচিত নয়।

১। সেহরিতে ভাতের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সবজি, মাছ অথবা মাংস খেতে পারেন। রোজায় দীর্ঘ সময় উপোস থাকতে হয় বলে সেহরিতে কমপ্লেকস কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত খাওয়ার চেষ্টা করুন। ডায়বেটিস থাকলে খেতে পারেন আটার রুটিও।

২। আঁশযুক্ত খাবার যেমন: লাল আটা, বাদাম, বিনস, ছোলা, ডাল ইত্যাদি খেতে হবে। এগুলো হজম হয় আস্তে আস্তে, তাই অনেক সময় পর খিদে লাগে। রক্তে চিনির পরিমাণ তাড়াতাড়ি বাড়ে না।

৩। প্রতি বেলা মাংস না খেয়ে অন্তত একবেলা মাছ খেতে চেষ্টা করতে হবে।

৪। সেহরিতে কম তেল-মসলাযুক্ত খাবার খেতে চেষ্টা করবেন। এতে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কম হবে। সেহরিতে যাই খান না কেন, প্রচুর পরিমাণে পানি পান করবেন। সেহরি খাওয়ার পর আধা কাপ পানিতে ১ টেবিল চামচ সাদা সিরকা মিশিয়ে পান করুন।

৪। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু সারা দিন না খেয়ে থাকতে হবে, তাই সেহরিতে বেশি বেশি খেতে হবে। এমন ধারণা মোটেই ঠিক নয়। কারণ, চার পাঁচ ঘণ্টা পার হলেই খাদ্যগুলো পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যায়। তাই প্রয়োজনের বেশি না খাওয়াই ভালো।

বজর্ন করুন:

জেনে নিন এমন কয়েকটি খাবার যেগুলো সেহরিতে খেলে রোজা রাখায় কষ্ট বাড়বে। এই খাবারগুলো কখনই সেহরিতে খাবেন না।

১। ডিম :
রোজার রাতের সেহরিতে এই ডিমের কোনো রান্না তরকারি একেবারে খাবেন না। কেননা ডিম খেলে আপনার পেটে গ্যাস তৈরি হতে পারে যা সারাদিনই ডিমের গন্ধযুক্ত ঢেকুরের সৃষ্টি করবে। ফলে আপনি রোজা রেখে অস্বস্তি বোধ করবেন। অসুস্থ হয়ে যাবেন। তাছাড়া হুট করে ব্লাড প্রেসারও বেড়ে যেতে পারে।

২। ডালঃ
বিশেষ করে ডালভুনা, মুগ বা বুটের ডাল। খেতে মসুর ডাল পাতলা করে খান। কেননা ডাল খালি পেটে প্রচুর গ্যাস তৈরি করে। ফলে আপনি সারাদিন পেটের ব্যথা অনুভব করবেন এবং অসুস্থ হয়ে যাবেন।

৩। খিচুরি :
খিচুরি অত্যন্ত গরম একটি খাবার যা শরীরকে গরম করে তোলে। অনেকের আবার পেটের সমস্যাও তৈরি করে। তাই সেহরির রাতে কখনই এই গরম খাবারটি খাবেন না। কেননা এটি আপনার পেট খারাপ করে দিতে পারে এছাড়া অতিরিক্ত গরমের কারণে আপনি শারীরিকভাবে অসুস্থও হয়ে যেতে পারেন।

৪। তেলযুক্ত খাবার :
সেহরিতে কখনই অধিক তেলযুক্ত কোনো খাবার খাবেন না। পোলাও, বিরিয়ানি, ডালের বড়া বা অন্য ভাজাভুজি এড়িয়ে চলুন। এতে বারবার গলা শুকিয়ে যাওয়া সহ নানান ধরণের সমস্যা দেখা দেবে।

৫। লেবু :
খালিপেটে লেবু অত্যন্ত অ্যাসিডিটি করে। তাই সেহরিতে লেবু খাবেন না। তা না হলে আপনার কষ্ট করে রাখা রোজাটি মাকরুহ হয়ে যেতে পারে বাজে ধরনের অ্যাসিডিটির কারণে।

মেনে চলুন:

১। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেড় থেকে দু’লিটার পানি পান করুন।

২। চা, কফির মাত্রা কমিয়ে দিন। তা না হলে পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

৩। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত যেমন: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি রোগ ইত্যাদি রোগীরাও রোজা পালন করতে পারবেন, তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের ডোজ, খাবারদাবার ও নিয়মকানুন জেনে নেওয়া উচিত৷

নিয়মিত রোজা রাখুন। সুস্থ্য থাকুন। শুভকামনা সকলের জন্য।

 

লেখক:

ফাতেমা জা্ন্নাত বৃষ্টি

গনস্বাস্খ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ, সাভার।

Check for details
SHARE