সাহসী নারীর সময় জয়ের গল্প!

নেতৃত্বের সহজাত গুণ তাঁর মধ্যে ছিল কৈশোর থেকেই। মেধা, দক্ষতা ও সদিচ্ছা থাকলে নারীরাও যে পুরুষের কাতারে থাকতে পারেন। হাটতে পারেন কণ্টকভরা পথেও- তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট’র (ভিপি) দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

ডানপিটে মেয়ে, তাই প্রশ্রয় পেলে জড়িয়ে যেতে পারেন রাজনীতিতে- এমন ভয়ে সব সময় আতঙ্কিত থাকতেন তাঁর বাবা। মেয়ে যেনো বিপথে না যায় সে জন্য অদৃশ্য দেয়াল ছিলো তাঁর চারপাশে। ‘যে জলোচ্ছ্বাস আচড়ে পড়ে পাড়ে তাকে কী বেধে রাখা যায়’- মৃদু হেসে বলেন মর্জিনা। তাঁর কথাই বলছিলাম এতোক্ষণ। পুরো নাম মর্জিনা আক্তার মর্জু। বাংলাদেশ পুলিশের একমাত্র নারী অফিসার ইনচার্জ (ওসি)। বর্তমানে সদরঘাট থানা পুলিশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।

২০০৩ সালে সারদা পুলিশ একাডেমিতে এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশে উপ-পরিদর্শক (এসআই) হিসেবে যোগ দেন মর্জিনা। শিক্ষানবীশ এসআই হিসেবে কক্সবাজার সদর ও রামু থানায় কাজ করেন। চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর মর্জিনাকে প্রথম পদায়ন করা হয় কক্সবাজার জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায়।

তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা ডিবি পুলিশে দুই বছর কাজ করেছি। সেসময় পুরো কক্সবাজারের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে গৃহপরিচারিকার তথ্য সম্বলিত ডাটাবেজ তৈরি করেছিলাম। আমার নেতৃত্বে ডিবির একটি টিম ছিল। পুরো কক্সবাজার জুড়ে অভিযান চালাতাম। মাদকবিরোধী অসংখ্য অভিযান চালিয়েছি। তৎকালীন পুলিশ সুপার বনজ কুমার মজুমদার স্যারের পরামর্শ ও সহযোগিতায় অনেক কঠিন কাজও করতে পেরেছিলাম সহজে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট কক্সবাজারে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত শেষে চার্জশিট দিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা ডিবি পুলিশের এসআই মর্জিনা। ‘ভয়ংকর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণের জন্য দিনরাত কাজ করেছেন তিনি। জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

সে সময়ে পরিচিতজন, আশেপাশের মানুষ, অনেকেই বলেছিলো- ‘মেয়েটির সাহস কতো- জঙ্গি নিয়ে খেলছে’। হ্যাঁ জঙ্গি নিয়ে ‘খেলেছেন’ মর্জিনা। কক্সবাজারের এপার-ওপার তছনচ করে সংগ্রহ করেছেন সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ। ২০০৭ সালে জঙ্গিদের অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দিয়েছেন তিনি। জঙ্গিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আদালতে সাক্ষী দিয়েছি’ – বলেন মর্জিনা আক্তার মর্জু।

১৯৯৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে এসএসসি পাস করেন তিনি। ১৯৯৫ সালে এইচএসসি’র ফলাফলে দ্বিতীয় বিভাগ পান। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১০ম স্থান অর্জন করে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম সরকারি বিএড কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি স্কাউট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। গার্ল ইন স্কাউটিং বিভাগের প্রথম ব্যাচের একজন ছিলেন মর্জিনা। ছিলেন লিডার ট্রেনার। অর্জন করেন উডব্যাজ।

২০০৭ সালে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ডবলমুরিং থানায় পদায়ন করা হয় মর্জিনাকে। এরপর ২০০৮ সালে কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে জানতে মর্জিনাসহ চার পুলিশ কর্মকর্তাকে নেপাল পাঠানো হয়। সেখান থেকে ফিরে নগরীর দামপাড়ায় পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে পদায়ন করা হয়। ২০০৯ সালে কোতোয়ালী থানায় বদলি করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর জোনের উপকমিশনার বনজ কুমার মজুমদার।

২০১১ সালে সেকেন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন পাঁচলাইশ থানাতে। সেখান থেকে ডবলমুরিং থানায়। ২০১২ সালে পাড়ি জমান জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন সুদানে। মিশনে যাওয়ার ১৫ দিনের মাথায় পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পান মর্জিনা। ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদানের দারফুরে ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেন হিউম্যান রাইটস অফিসার, মুভকন অফিসার ও সর্বশেষ জেন্ডার অফিসার হিসেবে। ২০১৪ সালে মিশন থেকে ফেরার পর তাকে ১১ এপিবিএনে পদায়ন করায়, সেখান থেকে রিক্যুইজিশন দিয়ে তাকে সিএমপিতে নিয়ে আসেন তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম।

২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল সদরঘাট থানায় নতুন করে সৃষ্ট পরিদর্শক (তদন্ত) পদে পদায়ন করা হয় মর্জিনাকে। ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল একই থানায় তাঁকে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশের একমাত্র নারী ওসি মর্জিনা আকতার মর্জু।

১৪ বছরের পুলিশ জীবনে অনেক প্রাপ্তি মর্জিনার। ২০১৩ সালে সুদানের দারফুরে শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘শান্তি পদকে’ ভূষিত হন তিনি। মাঠ পর্যায়ে সুনামের সাথে কাজ করা ও পুলিশি তদন্তে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা ও সাহসিকতার জন্য তাঁকে ‘উইমেন পুলিশ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মত ৩১ জন নারী পুলিশ সদস্যকে এই অ্যাওয়ার্ড দেয় বাংলাদেশ পুলিশ। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশ সপ্তাহে ‘২০১৬ সালে মাঠ পর্যায়ে’ সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন যথাযথ পুলিশী সেবা প্রদান ও ভাল কাজের মূল্যায়ন স্বরূপ ওএচ’ং ঊীবসঢ়ষধৎু ইধফমব অর্জন করেন পুলিশের সাহসী এই নারী সদস্য।

২০১৬ সালের ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর স্পেনের বার্সেলোনা শহরে অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের (আইএডব্লিউপি) ৫৪তম বার্ষিক সম্মেলন। এতে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান ডিআইজি মিলি বিশ্বাস, সদর দপ্তরের দুইজন এআইজি, ডিএমপির একজন এডিসি ও সিএমপির পরিদর্শক মর্জিনা। মাঠপর্যায়ে কর্মরত নারী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা গ্রামে ১৯৭৮ সালের ৩ নভেম্বর জন্ম নেয়া মর্জিনা আট ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চম। বাবা মৃত মোহাম্মদ রফিক। মা জয়নব বেগম। ২০০৮ সালে ব্যাংকার আরিফুল আজমকে বিয়ে করেন মর্জিনা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নাজিরহাট শাখায় ম্যানেজার (অপারেশন্স) হিসেবে কর্মরত আছেন আরিফুল আজম। তাঁদের এক মেয়ে নুজহাত মার্জিয়া আজমি ও এক ছেলে আজলান মালিক আবির।

পুলিশের কাজ ও সংসার জীবন দুটোই সমানভাবে উপভোগ করছেন মর্জিনা। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য চাকরির সঙ্গে পুলিশের চাকরি মেলানো যাবে না। অনেক সময় রাত দুইটা-তিনটায় বাসায় ফিরতে হয়। স্বামী এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেন না। বরং অনুপ্রেরণা দেন। আমি চাই, এভাবেই যেনো সারাজীবন মানুষকে সার্ভিস দিতে যেতে পারি।

একজন নারী হিসেবে নয় বরং বাংলাদেশ পুলিশের একজন কর্মী হিসেবে বলতে চাইÑ নারী-পুরুষের কোনো বিভেদ নয়, দায়িত্ব পেলে মানুষের মধ্যে যে দায়বোধ সৃষ্টি হয়- তা-ই যে কাউকে স্বতন্ত্র বানাতে পারে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ক্লিক ম্যাগাজিন ডটকম।

Check for details
SHARE