সফল উদ্যোক্তা ওয়ারেন বাফেটের বিফলতার গল্প

ওয়ারেন বাফেটের নাম শুনলে আহা-উহু করেন না এরকম লোক পাওয়া দুষ্কর। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সফল ইনভেষ্টর হিসেবে সবাই এক বাক্যে ওয়ারেন বাফেটের নাম নিবেন, তার আওড়ানো বুলি ফাইনান্সিয়াল ইনভেষ্টমেন্ট এনালাইসিসের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়, তার মুখের কথা শোনার জন্যে মানুষ হাজার হাজার ডলার খরচ করে ওমাহা’তে তীর্থযাত্রা করেন। কিন্তু আপনি শুনে টাস্কি খেয়ে যেতে পারেন যে, Berkshire Hathaway নামে যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য ওয়ারেন দাঁড়া করিয়েছেন গত ৫০ বছর ধরে তা ছিল একটা ‘এপিক ফেইলুর’! বাফেট নিজেই এটাকে ব্যাখ্যা করেছেন “I would have been better off if I’d never heard of Berkshire Hathaway.”

Berkshire Hathaway এর সাথে বাফেটের সম্পৃক্ততার শুরু ১৯৬২ সালে, তার অন্য অনেক ইনভেষ্টমেন্টের মতই তিনি এ কোম্পানির ষ্টক কেনেন ৭.৫০ ডলার পার শেয়ার যেখানে এনালাইসিস বলে এ ষ্টকের দাম ২০ ডলার পার শেয়ার হওয়া উচিত। তাই বাফেট স্বস্তা কিছু ষ্টক কিনলেন লাভের আশায়। সেই লাভ আসতে বেশি সময় নিলো না। সেসময় Berkshire এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন Seabury Stanton, তিনি বাফেটকে কফি খেতে ডাকলেন। কফিটা ভাল ছিল, বাফেট জানালেন তার বিক্রিতে আপত্তি নেই যদি ১১.৫০ ডলার পার শেয়ার দাম পান, Stanton রাজি হলেন, দুজন হাত মিলিয়ে মিটিং শেষ হলো। কিন্তু ঝামেলাটা বাধলো তখন যখন Stanton ফর্মাল অফার টা দিলেন ১১.৩৭ ডলার পার শেয়ার! এ ক্ষেত্রে যে কোন বিচক্ষন লোক, এতটুকু কম এমাউন্টে বিক্রি করবে কি না চিন্তা করবে বা বিক্রি না করলেও ধৈর্য্য ধরবে অনুকূল পরিবেশের জন্যে। কিন্তু বাফেট যা করলেন তা তার পার্সোনালিটির সাথে একটু বেমানান। বয়স অল্প ছিল, রক্ত গরম, তিনি ভয়ানক রেগে গেলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন Stanton কে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। যা ভাবা তাই কাজ, শুরু করলেন Berkshire Hathaway স্টক কেনা, যাতে মেজর ষ্টকহোল্ডার হয়ে বোর্ডে বসতে পারেন আর Stanton কে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারেন!

অবস্থাটা চিন্তা করেন, সর্বকালের অন্যতম সেরা ইনভেষ্টর, যার নাম নিলে লোকজন কানের লতিতে হাত দেয় পারলে, তিনি কি না শুধুমাত্র একজন লোককে শায়েস্তা করার জন্যে একটা কোম্পানির মেজরটি ষ্টক কিনলেন! এবং যা হবার তাই হলো, ওয়ারেন বাফেট তার জীবনের সবচেয়ে ভুল ডিসিশন নিয়ে ফেললেন।

Berkshire Hathaway আজকের মত তখন এরকম জায়ান্ট কোম্পানি ছিল না। একটা টেক্সটাইল মিল যারা সাউথ থেকে তুলা আমদানি করে কাপড় বানাতো। তখন পর্যন্ত এয়ার কন্ডিশনিং প্রযুক্তি আসে নাই, এবং Berkshire Hathaway একটা জিনিস চিহ্নিত করেছিল যে যদিও সাউথে কাচামাল এবং শ্রম স্বস্তা ছিল তারপর এরকম ফ্যাক্টরির জন্যে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা এবং কম আর্দ্র্য পরিবেশ দরকার। কিন্তু যখন বাফেট কোম্পানির মেজর স্টকের মালিক হলেন ততদিনে অবস্থা আর আগের মত নাই। এয়ার কন্ডিশনিং প্রযুক্তি চলে এসেছে, দক্ষিনের শ্রম ও কাচামাল সহজলভ্য, Berkshire Hathaway তখন একটা লুজিং কনসার্ন। বাফেট চেয়ারম্যান হলেন, মধুর প্রতিশোধ নিয়ে Stanton কেও সরানো হলো কিন্তু কোম্পানির গতি নিম্নমুখী, সার্ভাইভ করার সুযোগ খোঁজা হলো চ্যালেঞ্জ। বাফেট আরো টাকা ঢাললেন কোম্পানিতে, কোন লাভ হলো না। ষ্টক বিক্রি করতে চাইলেন, কেউ কিনলো না। উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলেন ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিতে।

কিন্তু ততদিনে জল অনেকদূর গড়িয়েছে। ব্যবসা খারাপ হওয়াতে বাফেট বাধ্য হয়েছিলেন কোম্পানির ইনভেষ্টমেন্টে বৈচিত্র্য আনতে, খুব সহজেই চিহ্নিত করলেন ইন্স্যুরেন্স খাতকে। ১৯৮৫ সালে Berkshire তাদের শেষ টেক্সটাইল ফ্যাক্টরিটাও বন্দ করে দেয়। কিন্তু ততদিনে অন্য আরো অনেক বিনিয়োগের সাথে ইন্স্যুরেন্স খাতের বিনিয়োগ Berkshire Hathaway কে পরবর্তী ৫০ বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিনত করার ভিত তৈরি করে দিয়েছে।

২০১০ সালে এসে বাফেট বলেছেন, Berkshire Hathaway তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। তিনি দাবি করেন, যদি Berkshire Hathaway এ ইনভেষ্ট না করে তিনি সরাসরি ইন্স্যুরেন্স খাতে বিনিয়োগ করতেন তাহলে তার সম্পত্তি কয়েকশত গুন বেশি হতো! বাফেট অনেকগুলো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু বাফেট কখনো হাল ছেড়ে দেন নাই, বিনিয়োগে বৈচিত্র্য এনে সফলতা পেয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার হলো, ওয়ারেন বাফেট তার ব্যর্থতা কখনো লুকানোর চেষ্টা করেননি, বরং ব্যর্থতাকে তিনি বুকে ব্যাজ আকারে ধারন করেছেন। যার প্রমান দেখিয়েছেন তিনি Berkshire Hathaway কে ব্র্যান্ড নেম হিসেবে রেখে দিয়ে। যাতে প্রতিদিন কোম্পানির নাম তার ব্যর্থতা মনে করিয়ে দেয় এবং উনি ভুল থেকে শিখতে পারেন।

তথ্যসুত্র: কর্মজীবন ডটকম।

Check for details
SHARE