সফলতা যে নারীর পদতলে!

করাচির একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ক্যারিয়ার শুরু করেন রোকিয়া আফজাল রহমান। বর্তমানে যিনি পরিচিত সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে। দায়িত্ব পালন করছেন মাইডাস ফিন্যান্সিং লিমিটেডের পরিচালক, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক ও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে। এছাড়া বাংলাদেশ ফেডারেশন অব উইমেন এন্টারপ্রেনার্স প্রেসিডেন্ট হিসেবেও কাজ করছেন সফল এ নারী।

পাকিস্তানের শহর করাচিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকে কাজ শুরু করেন এক বাঙালি নারী। এ ঘটনা বেশ সাড়া ফেলেছিল। কেননা সে সময় তো খুব অল্প সংখ্যক নারী ব্যাংকে কাজ করতেন। কয়েক যুগ আগের জন্য এটা বিস্ময়কর ঘটনা বটে। বলছি ১৯৬২ সালের কথা। সে সময় করাচির একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ক্যারিয়ার শুরু করেন রোকিয়া আফজাল রহমান।

করাচিতে বেড়ে ওঠা রোকিয়া আফজালের শৈশব, কৈশোর আর তরুণবেলার পুরোটাই কেটেছে সেখানে। ছয় ভাই, ছয় বোনের মধ্যে বেশ ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন তিনি। সে সময় ভাইদের সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে বেড়াতেন ছোট্ট রোকিয়া। শৈশব-কৈশোরের রঙিন স্মৃতি এখনো তাকে বিমোহিত করে। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। এর পর ব্যাংকিংয়ের ওপর করেন পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা।

পড়াশোনার পর্ব শেষ করে যোগ দেন করাচির একটি ব্যাংকে। যদিও সে সময় চাকরি করাটা সবাই খুব ভালো চোখে দেখত না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তাকে বাবা সাহস জুগিয়েছিলেন। করাচিতে দুই বছর চাকরি করার পর চলে আসেন বাংলাদেশে। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যাংক ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পান। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে রোকিয়া আফজাল জানান, আমাদের সময়ে তো প্রযুক্তিগত এত সুবিধা ছিল না। সব হিসাবনিকাশ হাতে করতে হতো। তবুও খুব আনন্দ পেতাম কাজ করতে। সবচেয়ে ভালো লাগত যখন নিজের টাকায় কাউকে কোনো উপহার দিতে পারতাম, কিংবা যখন বুঝতে পারলাম আমি স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছি।

তবে শুধু চাকরিতে থেমে থাকলে চলবে না, এটা বুঝতে পেরেই রোকিয়া আফজাল ১৯৮০ সালে গড়ে তোলেন কৃষি ব্যবসা। আরআর কোল্ড স্টোরেজ নামে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমদিকে আলু আমদানি-রফতানি করত। ধীরে ধীরে সে ব্যবসা বড় হয়েছে। আরো একটি এগ্রো ব্যবসা শুরু করেন তিনি। সেটিতেও সফলতার ছাপ রাখেন। ছোট পরিসরে শুরু করলেও এখন সেখানে ১৫ হাজার কৃষক কাজ করেন, তার তত্ত্বাবধানে।

তার এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা কৃষকদের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণের ব্যবস্থাও করেন তিনি, যাতে তারা নিজেরা কিছু করতে পারে। এসব ভালো উদ্যোগের জন্যই হয়তোবা খুব তাড়াতাড়িই সবার প্রশংসা জমা হয়েছে সফল এই নারীর অর্জনের ঝুলিতে। অন্যদিকে বেশ কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন এই ব্যবসাকেন্দ্রিক।

এগ্রো বিজনেসের পাশাপাশি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন গণমাধ্যম, ইন্স্যুরেন্স ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও। মাইডাস ফিন্যান্সের বোর্ডের আমন্ত্রিত সদস্য তিনি। মাইডাসের আওতায় নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছেন রোকিয়া। এখন তার প্রকল্প থেকে নারী উদ্যোক্তারা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোন নিতে পারেন। বিভিন্ন উত্সবকে কেন্দ্র করেও ঋণ নিতে পারবেন তারা।

সফল এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার সুবাদে আমি একটা বিষয় সম্পর্কে বেশ স্পষ্ট ধারণা পেয়েছি। সেটা হচ্ছে, নারী চাইলেই সব পারে। শুধু চাইতে হবে। এখন নারী উদ্যোক্তাদের লোন দেয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলো বেশ সাহায্য করছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি এখন সুবিধা দিচ্ছে অনেক, সেটা বুঝে নিতে পারলেই সফলতা আরো সহজ হয়ে ধরা দেবে।’

এর সঙ্গে তিনি আরো জুড়ে দেন নারী মাত্রই মাল্টি টাস্কার। ঘরসংসার সামলে কীভাবে বাইরে কাজ করতে হয়, সেটা নারীর থেকে ভালো কেউ জানে না। আর তাই নারী যখন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে, তখন সে সফলতা ছিনিয়ে নিয়েই আসে।

নারীর ক্ষমতায়নে প্রবলভাবে বিশ্বাসী এই নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিজ উদ্যোগে একটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৪ সালে ১৫০ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে তার সেই সংগঠন উইমেন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে কাজ শুরু করেন রোকিয়া। ১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে গড়ে উঠে উইমেন ইন স্মল এন্টারপ্রাইজ (ওয়াইজ)। এখন সংগঠন দুটি সারা বাংলাদেশে নারীদের নিয়ে কাজ করছে।

অন্যদিকে ২০০৬ সালে শুরু হয় বাংলাদেশ ফেডারেশন অব উইমেন এন্টারপ্রেনার (বিএফডব্লিউই)। বিভিন্ন শহরে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীরা কাজ করছেন। বিএফডব্লিউইর আওতায় রয়েছে প্রায় ৫০ লাখ নারী। তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এই সংগঠনেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রোকিয়া আফজাল। এখানেই শেষ নয়। সফল এই নারী দায়িত্ব পালন করছেন নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে।

কঠোর পরিশ্রম আর সাহস তাকে সফল করেছে। এতটা পথ হেঁটে আসা এই নারীর অর্জনের ঝুলি পূর্ণ হয়েছে নানা পুরস্কারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৯৯ সালে মন্টে কার্লোতে লিডিং উইমেন এন্টারপ্রেনার অব দ্য ওয়ার্ল্ডের তকমা নিজের করে নেয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক কর্তৃক নির্বাচিত সেরা ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব, জনতা ব্যাংকের প্রাইম কাস্টমার, আমেরিকান চেম্বারের ২০০৩ সালের সেরা ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব, ভারতের প্রিয়দর্শিনী পুরস্কার, দেশবন্ধু পুরস্কারসহ আরো অনেক পুরস্কার রয়েছে তার দখলে। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে তার কাছে বড় প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা।

ভ্রমণবিলাসী মানুষ রোকিয়া আফজাল। কাজের খাতিরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হলেও শুধু ঘোরার উদ্দেশ্যেই ঘুরতে যাওয়া হয়ে ওঠে না সেভাবে। সফল এই নারীর ভালো লাগার আরো একটি কাজের মধ্যে রয়েছে বই পড়া। ভ্রমণে বের হবেন আর বই নিবেন না সঙ্গে, এটা হতেই পারে না তার ক্ষেত্রে।

অবসর তেমন মেলে না রোকিয়া আফজালের, তবুও সময় পেলে ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনীদের সঙ্গে কাটাতে পছন্দ করেন। পরিপাটি থাকলে মন ভালো থাকে, এই নীতি অনুসরণ করেন সর্বদা। তাই পোশাকে বাড়তি জৌলুস পছন্দ না হলেও সমসাময়িক পরিপাটি সাজ তার পছন্দ। সময়-সুযোগের অভাবে রান্না করা হয় না সেভাবে, তবে রান্না করতে বেশ ভালোবাসেন, ভালোবাসেন মুখরোচক আচার বানাতে। সব মিলে বলা যায়, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে এ প্রবাদটি যেন তার জন্যই তৈরি হয়েছে।

তথ্যসূত্র: বনিকবার্তা ডটকম।

Check for details
SHARE