সফলতা নয় ব্যর্থতার গল্প!

জামিল কিছু করতে চায়। হাতে কিছু পুঁজিও আছে। খুঁজছে ভাল একটা আয়ের উৎস। একটা ভাল ব্যবসা। তার এক আত্নীয় একটা বড় এনজিও’র উচ্চ পদে চাকরি করেন। তিনি বললেন, তুমি অর্ডার সাপ্লায়ের কাজ শুরু করতে পার। আমাদের বিভিন্ন প্রজেক্টে অনেক ধরনের জিনিস লাগে। সেগুলো থেকে তুমি কোন একটা শুরু কর। কাজ পেতে আমি আমার পক্ষে সম্ভব এমন সব সহযোগীতাই তোমাকে করব।

জামিল স্ট্যাডি শুরু করল। বিজনেসের ডকুমেন্টস রেডি করল। এনজিও কর্মকর্তা তাকে এনলিস্টেড হবার ব্যবস্থা করে দিলেন। সে বিভিন্ন টেন্ডারের শিডিউল কেনা শুরু করল। এতদিনে অবশ্য সে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে যে, সে কি করবে।

শুরুতেই তার ঝোক ছিল উৎপাদনধর্মী কিছুর প্রতি। বিদেশী জিনিস কিনে এনে দিয়ে দেয়াটা লাভজনক হলেও তার খুব একটা পছন্দের ছিল না। সুতরাং সে, এনজিও’র বিভিন্ন প্রজেক্টে প্রয়োজন হয় এমন ব্যাগ উৎপাদন করিয়ে সরবারহ করার আইডিয়াটিই বেছে নিল। সারাদিন বংশালে, সদরঘাটে ঘুরাঘুরি করে র’ম্যাটেরিয়ালস সম্পর্কে আইডিয়া নিল। ঢাকার আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কারখানার সাথে কথা বলল। ইতোমধ্যে ছোট ছোট কিছু কাজও করল। ফলে তার কনফিডেন্সটা একটু বেড়েছে এই সুযোগে।

বছর না ঘুরতেই সেই এনজিও অনেক বড় এমাউন্টের একটা টেন্ডার দিল। জামিল শিডিউল কিনল। আবারো বংশাল এবং বিভিন্ন কারখানায় দৌড়াদৌড়ি করে প্রাইস নিয়ে সে টেন্ডার বিড করল। জামিলের প্রাইস ভাল কিন্তু নতুন বলে টেন্ডার পাবে কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। এবারতার আত্মীয় কর্মকর্তা তাকে সহায়তা করল। সে তরুন উদ্যোক্তা বলে এনজিও কর্মকর্তাদের সিম্পেথি পেয়ে অবশেষে বল তার কোর্টে।

একই টেন্ডার বিড করেছিল বংশালের একটা সিন্ডিকেট। তারা কয়েকটা নামে টেন্ডার দেয় এবং প্রতিবছর পা্য় তো তারা। পরে ভাগাভাগি করে কাজ করে দিয়ে লাভও ভাগাভাগি করে নেয়। এবছর টেন্ডার না পেয়ে তারা একটু অবাক হল। এনজিও’র প্রকিউরমেন্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে জেনে নিল টেন্ডার কে পেয়েছে, তার বিজনেস স্ট্যাটাস ইত্যাদি।

সিন্ডিকেট এবার তার ভয়াবহ খেলা শুরু করল। এক ঘন্টার মধ্যে বংশাল থেকে ঐ অর্ডারের জন্যে প্রয়োজনীয় ফেব্রিক সব কিনে ফেলল। সংশ্লিষ্ট কালারের কোন ফেব্রিক বাজারে নাই। জামিল বংশালে যায়। ফেব্রিক নেই। কবে আসবে তারা বলতে পারছে না। কেউ কেউ বলছে মাসখানেক পরে যোগাযোগ করেন। এলসি দেব, ফেব্রিক আসবে। সময় লাগবে। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী যে সময়ের মধ্যে পণ্য ডেলিভারী দিতে হবে তা ভাবলেই জামিলের মাথা নষ্ট হবার যোগাড়।

একমাস ঘুরেও জামিল ফেব্রিক পেল না। একবার ভাবল, করব না। সিকিউরিটি মানিটা লস হবে হোক। আবার ভাবে, আত্মীয়ের কাছে তার মান সম্মানের কথা। তিনি কাজটা পেতে হেল্প করেছেন কিন্তু এখন করতে না পারলে তারও সম্মান যাবে। নিজের কাছে হেরে যাওয়ার কথা মনে হলেও জামিল চোখে অন্ধকার দেখে। আবারো সে আশায় বুক বেঁধে বংশালে ঘোরে।

এবার জানা গেল আসল কাহিনী। জামিল শুনল সিন্ডেকেটের এই কর্মের কথা। সে অবাক হল। এত ফেব্রিক কিনে রেখেছে ! কাজ পায়নি বলে আরেক জনকে মার্কেট থেকে বের করতে এত টাকা বিনিয়োগ ?! পরে ফেব্রিক দিয়ে ওরা করবে কি ?

বংশালে এক ব্যবসায়ী হেসে উত্তর দিল – ভাই এটা ওদের কাছে কোন টাকা না। আর ফেব্রিক ওরা লসে বেচবে না। এই যে ৩/৪ মাসের জন্যে ফেব্রিক নাই। তাতে করে রোল প্রতি ২০০-৩০০ টাকা বেশি দাম হয়ে যাবে। পরে ওরাই আবার এটা বিক্রি করে দেবে। তাছাড়া এই বংশালে ফেব্রিকের ব্যবসা করে, ফেব্রিক আনে ওরাই কিংবা ওদেরই কোন না কোন আত্মীয় স্বজন। আর নয়তো ওরা লোকাল ব্যাগ বানিয়ে পাইকারী বাজারে বেচে দিবে। লস ওরা কোন ভাবেই করবে না।

জামিল বুঝল তার কোন উপায় নেই। পরিশেষে কয়েক জনের সাথে পরামর্শ করে জামিল চায়না থেকে ফেব্রিক আনানোর ব্যবস্থা করল। এনজিওতে আবেদন করে ডেলিভারীর সময় কিছুটা বাড়িয়ে নিল। অবশেষে মোটামুটি জোড়া তালি দিয়ে, দিন রাত একাকার করে জামিল অর্ডার ডেলিভারী দিল।

পুরো প্রজেক্টটি সম্পন্ন করার মত পুঁজি তার হাতে ছিল না। সে কিছু টাকা ধারও করেছিল। বিল পাওয়ার পরে শোধ করবে এমন পরিকল্পনা করেই ধার করেছিল। বিল সে ঠিকই পেয়েছে। কিন্তু এলসি করা থেকে কম সময়ের বাউন্ডারির মধ্যে কাজ শেষ করতে গিয়ে টোটাল প্রজেক্টে তার লসের পরিমান অনেক। জামিল এরপরে এই ব্যবসাটা ছেড়েই দিল।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষনীয়: ১) কাজের পূর্বেই প্রোপার সোর্স এনশিওর করতে হবে। ২) প্রতিটা সোর্সের ২/৩ টা করে ব্যাকআপ সোর্স ও প্ল্যান থাকতে হবে। ৩) বাঘের সাথে লড়তে গেলে এটলিস্ট নেকড়ে হতে হবে। মানে, বড় কাজ করার জন্যে নূন্যতম যোগ্যতাটুকু অর্জন করেই সাহসটা করতে হবে।

তথ্যসূত্র: টেক্সটাইল ল্যাব ব্লগপোষ্ট।

Check for details
SHARE