সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করায় ইস্পাত ব্যবসায় সফলতার তুঙ্গে!

ব্রিটেনে বসবাসকারী ভারতীয় ধনকুবের লক্ষ্মী মিত্তাল। পরিশ্রম আর দৃঢ়তার বলে যিনি এখন ব্রিটেনের একজন আদর্শ উদ্যোক্তা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইস্পাত কম্পানি আরসেলরমিত্তালের চেয়ারম্যান ও সিইও। ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাব অনুযায়ী লক্ষ্মী মিত্তালের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ১৭.২ বিলিয়ন ডলার।

৬৮ বছর বয়সী এ উদ্যোক্তা বিশ্বের ৬২তম বিলিয়নেয়ার এবং ভারতের তৃতীয় বৃহৎ ধনী। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে থাকা ধনী এশিয়ানদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। ব্রিটেনের রাজনীতিবিদদের কাছে দাতা হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মী মিত্তাল শিক্ষা ও ক্রীড়ায়ও দান করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউট খোলার জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন।

তাঁর দানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হবে ‘লক্ষ্মী মিত্তাল সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট।’ এতে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করার সুযোগ পাবে। থাকবে ২৫০টি অনুষদ। লক্ষ্মী মিত্তাল বলেন, ‘ভারত কিংবা এর প্রতিবেশী দেশে যাদের জন্ম, আমার এবং আমার পরিবারের কাছে তাদের গুরুত্ব অনেক। কারণ তারা আমার জন্মস্থানের উন্নয়নে অবদান রাখবে।’

ভারতের রাজস্থানের চুরু জেলায় ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন লক্ষ্মী নারায়ণ মিত্তাল। এরপর তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। সেখানে বাবা মহন লাল মিত্তাল একটি ইস্পাতের ব্যবসা গড়ে তোলেন। মূলত বাবার কাছ থেকেই ব্যবসার হাতেখড়ি। তিনি কলকাতার সেন্ট জেবিয়ার্স কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

স্নাতক সম্পন্ন করার পর মিত্তাল বাবার গড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর ১৯৭৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায় একটি ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলেন। এটির নাম দেন আরসেলরমিত্তাল। ৮০-এর দশক পর্যন্ত পারিবারিক ব্যবসার অংশ হিসেবেই ইন্দোনেশিয়ায় এ ব্যবসা দেখাশোনা করেন লক্ষ্মী মিত্তাল। ধারণা করা হয়, পারিবারিক বিভেদের জেরে ১৯৯৫ সালে তিনি ব্যবসা নিয়ে পুরোপুরি আলাদা হয়ে যান। পরে তিনি ব্রিটেনের লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস ও ব্যবসা শুরু করেন।

দীর্ঘ এ যাত্রায় মিত্তাল এখন বিশ্ব ইস্পাত ব্যবসায় একটি অনুকরণীয় নাম। তাঁর গড়া আরসেলরমিত্তাল ব্রিটেন ছাড়িয়ে বিশ্বের ১৪ দেশে ব্যবসা বিস্তৃত করেছে। গত বছর এ কম্পানির নেট মুনাফা হয় ৪.৬ বিলিয়ন ডলার। রাজস্ব বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮.৭ বিলিয়ন ডলার। মিত্তালকে বর্তমানে ইস্পাতশিল্পের অন্যতম পথিকৃত অ্যান্দ্রো কারনেগির সঙ্গে তুলনা করা হয়। যার একটি বৈশ্বিক স্বপ্ন ছিল এবং দৃঢ়তা ও পরিশ্রমের ফলে তিনি তাতে সফল হয়েছিলেন।

নিজের ব্যাবসায়িক সাফল্য নিয়ে এ ধনকুবের বলেন, গত ২০ বছরে আমাদের অনেক ঘটনাচক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিগুলোতে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পেরেছি। সে কারণেই একটি টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলতে পেরেছি, যা বিশ্বের ১ নম্বরে রয়েছে।

তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সবাইকেই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এটি তোমার দৃঢ়তা ও ত্যাগের ওপর নির্ভর করছে তুমি কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে এবং সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, দিন শেষে আবেগকে দূরেই সরিয়ে রাখতে হয়।

মিত্তাল দেশ ছেড়ে এলেও মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত যেন ভারতকেই লালন করছেন। তাই তো ভারতীয় অ্যাথলেটদের সহায়তার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলেন মিত্তাল চ্যাম্পিয়নস ট্রাস্ট। ৯ মিলিয়ন ডলার দিয়ে তিনি এ ট্রাস্টের যাত্রা শুরু করেন। যার মাধ্যমে অলিম্পিকে অংশ নেওয়া ভারতের অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণসহ নানা সহযোগিতা করা হয়। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিভাগের ৪০ জন অ্যাথলেটকে সহযোগিতা করছে। তিনি ভারতে একটি ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খোলার লক্ষ্যে কাজ করছেন।

মিত্তাল চ্যাম্পিয়নস ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি শিক্ষাসহ সমাজের নানা উন্নয়নেও সহযোগিতা করেন। ২০০২ সালে ভারতে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজিতে সহযোগিতা করেন। ২০০৭ সালে রিলিফ সহযোগিতায় এক মিলিয়ন পাউন্ড দান করেন।

একজন দানশীল ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও দারুণ সফল মিত্তাল। তাঁর প্রতিষ্ঠান আরসেলরমিত্তাল নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে তিন গুণ বড়। এ ছাড়া লন্ডনভিত্তিক কুইন্স পার্ক র‌্যাংগার্স ফুটবল ক্লাবে তাঁর ১১ শতাংশ মালিকানা রয়েছে।

ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাবে ২০০৫ সালে লক্ষ্মী মিত্তাল বিশ্বের তৃতীয় বৃহ ধনী হন। ২০০৫ সালে সানডে টাইমস তাঁকে ‘বিজনেস পারসন অব ২০০৬’ ঘোষণা করে। ফিন্যানশিয়াল টাইমস তাঁকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। প্রফেশনাল সেক্টর নেটওয়ার্ক, উইকিপিডিয়া, ফোর্বস ম্যাগাজিন।

Check for details
SHARE