সঠিক উপায় জানা থাকলে গার্মেন্টস ব্যবসায় কখনও লস হয় না!

সঠিক উপায় জানা থাকলে বিজনেস এর ডিক্শনারিতে লস বলে আসলেই কোনো শব্দ নেই । তো চলূন বিজনেস এর কিছু বাস্তবিক উদহারন নিয়ে আলোচনা করি । ধরুন আপনি তৈরী পোষাকের ব্যবসা করতে আগ্রহী। আপনি মনে করছেন, তৈরী পোষাকের ব্যবসায় ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। আপনার ক্যাপিটাল ১০ লাখ টাকা। আপনাকে সবার আগে এই জানতে হবে এই ব্যবসার খুঁটিনাটি দিকগুলো।

যেমন, তৈরি পোষাকের পাইকারি বাজার কোথায়, খুচরা বাজার কোথায়, পাইকারী এবং খুচরা বাজারের মধ্যে দামের পার্থক্য। যদি নিজে পোষাক প্রস্তুত করতে চান, তাহলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আপনি কোথায় পাবেন, ফ্যাক্টরী কোথায় পাবেন। ফ্যাক্টরীতে কিভাবে অর্ডার দিতে হয় এবং আপনার তৈরীকৃত পোষাকের বাজার কোথায়? বাজারে সকল বয়সী মানুষদের পোষাক পাওয়া যায় এবং আমাদের দেশে তৈরী পোষাকের চাহিদা ব্যাপক। ধরুন আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আপনি বাচ্চা এবং মেয়েদের পোষাক বিক্রি করবেন। প্রাথমিকভাবে আপনি ঠিক করলেন, ঢাকার আশেপাশে অঞ্চলগুলোতে আপনি পাইকারীভাবে পোষাক কিনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করবেন।

এই ক্ষেত্রে প্রথমেই আপনাকে সেই বাজারগুলোতে রেকি করতে হবে। সেখানে বিভিন্ন দোকানদার যারা ঢাকা থেকে পন্য কিনে আনেন তাদের সাথে যোগাযোগ করলেন, তাদের চাহিদা সম্পর্কে অবহিত হলেন। আপনার প্রস্তাবিত কিছু পন্যের নমুনা বা স্যাম্পল দেখিয়ে বাজার যাচাই করলেন। দিনশেষে দেখলেন, এখানে পোষাক সরবরাহ করতে পারলে দিন শেষে সকল খরচ বাদ দিয়ে পার পিসে নূন্যতম ৫/৬ টাকা প্রফিট করতে পারবেন। মার্কেট ধরার জন্য প্রথমে প্রচলিত স্টাইলে কিছুটা কম লাভ করলে ভালো। যদি কিছু অগ্রীম অর্ডার নিতে পারেন, তাহলে সেটা হবে এই পর্যায়ে আপনার সেরা অর্জন। এই অভিজ্ঞতাই আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে দারুন সাহায্য করবে।

এরপর একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে, ব্যাংকে আপনার প্রতিষ্ঠানের নামে একটি কারেন্ট একাউন্ট খুলে আপনার নির্ধারিত মুলধনের দশভাগের একভাগ সেখানে ক্যাপিটাল হিসেবে জমা দিয়ে ব্যবসায় নেমে পড়ুন। ধরে নিন, এই এক লাখ টাকা আপনার সর্বোচ্চ মুলধন। এই এক লাখ টাকায় আপনি বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরীর প্রায় ১০০০/১৫০০ পিস পোষাক পাইকারীভাবে কিনতে পারবেন। সকল খরচ বাদ দিয়ে যদি প্রাথমিকভাবে নূন্যতম ৫ টাকা করে প্রফিট করতে পারেন, তাহলে ৫০০০ থেকে ৭৫০০ টাকা প্রফিট হতে পারে।

যদি মাসে দুইবার পোষাক সরবরাহ করতে পারেন, তাহলে মাসিক লেনদেন দুই লাখ টাকা এবং প্রফিট ১০/১৫ হাজার টাকা। ছোট অবস্থায় এই লেনদেন এবং লাভ কোন অংশেই ছোট নয়। পাশাপাশি, ছোটবড় সকল লেনদেন আপনার ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমেই করুন। মাঝে মাঝে কিছু টাকা জমা দিয়ে, দুই একদিন পর তা আবার তা তুলে ফেলুন। এতে আপনার একাউন্টের বার্ষিক লেনদেন ভালো হবে, আপনার একাউন্ট প্রোফাইল ভারী হবে। যা ভবিষ্যতে খুবই্ কার্যকরী ভুমিকা পালন করবে।

নিয়মিত ব্যাংকে যান, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে কিছুটা যোগাযোগ রাখুন। একজন ভালো নিয়মিত ক্লায়েন্ট হিসেবে ব্যাংকে আপনার পরিচয় নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, পাইকারী বাজার, কাঁচা বাজারে যত বেশি ঘোরাফেরা করবেন, পরিচিত মুখ হবেন ও ভালো ব্যবহার এবং সৎ ভাবে কাজ করবেন ততবেশি ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করবেন।

এই পাইলট প্রজেক্ট যদি ৫০ ভাগও সফল হয়, ততক্ষনে এই খাতের অনেক খুঁটিনাটিই জেনে যাবেন। তখন বাজারের চাহিদা বুঝে আরো কিছু টাকা চাইলে বিনিয়োগ করতে পারেন। এটা হবে তুলনামুলক নিরাপদ বিনিয়োগ। পাশাপাশি, নতুন ক্রেতা এবং বাজার তৈরী করুন। একজন ভালো ব্যবসায়ী চেষ্টা করেন অল্প সময়ে তার মুলধনকে বার বার ব্যবহার করতে। যতবার মুলধনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবেন, ততবেশি লাভ হবে। তবে মনে রাখবেন, অতি লোভে তাতি নষ্ট।

এরপর ধীরে ধীরে আপনি মুল ব্যবসায় প্রবেশ করবেন। তবে কোনভাবেই আপনার নির্ধারিত মুলধনের অর্ধেকের বেশি আপনি এই পর্যায়ে বিনিয়োগ করবেন না। বাকি মুলধন হচ্ছে, আপনার রিস্ক নেয়ার সাহস। ব্যবসার সাথে ঝুঁকি জড়িত। তবে এই ঝুঁকিটা হতে হবে ক্যালকুলেটিভ রিক্স। আপনার ব্যবসা এক বছর অতিবাহিত হলে, যথাযত ক্রেতা তৈরী হলে, বাজার বড় হলে, আপনি ধীরে ধীরে পোষাক তৈরী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করুন।

চেষ্টা করুন প্রতিমাসে নূন্যতম ১০/১৫ হাজার পিস তৈরী পোষাক সরবরাহ করতে। মনে রাখবেন বড় স্কেলে পোষাক সরবরাহ পিস হিসেবে হয় না, ডজন হিসেবে হয়। হিসেবের সুবিধার জন্য পিস হিসেবে আলোচনা করছি। এই পর্যায়ে যদি সব খরচ বাদ দিয়ে আপনি ১০ টাকা পার পিস প্রফিট করতে পারেন, তাহলে মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা আপনি আয় করছেন।

আপনি চাইলে এই পর্যায়েই থাকতে পারেন অর্থাৎ ব্যবসা চাইলে নাও বাড়াতে পারেন। যদি আপনি আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আরো উঁচুতে দেখতে চান, তাহলে আরো শেকড়ে যেতে হবে, অর্থাৎ পোষাক তৈরীর কথা চিন্তা করতে হবে। এই সংক্রান্ত সকল খরচ এবং তথ্য আপনি নিজেই জোগাড় করতে পারবেন। একটা ফ্যাক্টরী দেয়া মানে হচ্ছে আপনার নিজস্ব কিছু ক্রেতা প্রস্তুত, আপনার নিজের একটি শোরুম আছে এবং যেখানে আপনি পাইকারী ও খুচরা বিক্রি করেন। ঐ পর্যায়ে না গেলে, ফ্যাক্টরী দিয়ে বিপদে পড়তে হবে।

প্রথমেই এক লাইনের (সাধারনত ২০ টা মেশিন নিয়ে এক লাইন তৈরী হয়) ফ্যাক্টরী না দিয়ে, আপনার প্রতিষ্ঠানের নামে দুই তিনটা পুরানো মেশিন নিয়ে পরীক্ষামুলক কাজ করতে পারেন। যদি আপনার নিজের অর্ডার এই দুই তিনটা মেশিনে না কুলায়, তাহলে আরো কিছু পুরানো মেশিন কিনতে পারেন। হাতে টাকা থাকলেও আপনি এই পর্যায়ে ব্যাংকের দারস্ত হতে পারেন।

ধরে নিচ্ছি, এই পর্যায়ে আসতে আপনার প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে, এই তিন বছরে আপনার প্রতিষ্ঠানের মাসিক টার্নওভার ২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০ লাখ হয়েছে (মাসিক টার্নওভার মানে হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিমাসে কত টাকার লেনদেন করে)। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। যেহেতু আপনি দীর্ঘদিন ব্যাংকের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছেন, আপনার মাধ্যমে ব্যাংক উপকৃত হয়েছে, ব্যাংকের ম্যানেজার আপনাকে ভালো একজন ক্লায়েন্ট হিসেবে চেনে।

এই পর্যায়ে আপনি যদি এসএমই লোনের জন্য এপ্লাই করেন, তাহলে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই ব্যাংক স্বউদ্যোগে আপনাকে লোন দিয়ে দিবে। এটা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। তবে বেশি টাকা লোন না নিয়ে, ৫ লাখ টাকা লোন নিয়ে তা দিয়ে মেশিনারী কিনে এক বছর ব্যবসা করে দ্রুত যদি সময়ের আগে ফেরত দিতে পারেন, তাহলে আপনি ব্যাংকের একজন সেরা কাস্টমার হিসেবে বিবেচিত হবেন। এই পরিচয়, এই ভালো সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ন, যা ভবিষ্যতে কাজে দিবে।

মনে রাখবেন, ব্যাংক কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। ব্যাংক নিজে একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের কাছে আপনার আমার অর্থ গচ্ছিত থাকে। ইচ্ছেমত লোন তারা দিতে পারে না। দায়িত্বের ব্যাপার থাকে। যারা ব্যাংক লোন দেয় না বলে চিৎকার করেন, তারা সঠিক পদ্ধতি অনুসরন করেন না বলেই আমি শতভাগ নিশ্চিত। সঠিক কাগজপত্র থাকলে, নিয়ম অনুসরন করলে এবং ধৈর্য ধরলে ব্যাংক আপনার পিছনে দৌড়াবে।

এইভাবে আস্তে ধীরে আপনি ছোট ছোট টাইম ফ্রেম এবং পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাবেন। একটা পর্যায়ে আপনার পরিশ্রম, ভালোবাসা, বুদ্ধি, মেধা, সততা এবং সর্বপরি যোগ্যতা দিয়ে হয়ত বড় একটি ফ্যাক্টরীর মালিক হয়ে যেতে পারেন। বিদেশী বায়ারের জন্য নিজে চেষ্টা করবেন, যোগাযোগ করবেন, বিজিএমই এর সাহায্য নিবেন। ১০ বছর পর যদি সব ঠিক থাকে তাহলে আপনার প্রতিষ্ঠানে হয়ত ১০/১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

মনে রাখবেন ব্যবসা মুলত একটি বটবৃক্ষের বীজের মত। ধীরে ধীরে তা মহিরূহতে পরিনত হয়। রাতারাতি বড়লোক হবার কোন বৈধ পদ্ধতি নেই। সম্প্রতি দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ইনভেস্ট করছে খাবারের ব্যবসায়, আমদানি, রপ্তানিতে। কারন কথিত আছে, এই সকল ব্যবসা খুবই লাভজনক। অথচ প্রতিটি ব্যবসাই লাভজনক, যদি তা সঠিক পরিকল্পনায় করা যায়। তাই অভিজ্ঞতা থাকুক বা না থাকুক, কিছু বুঝুক বা না বুঝুক অন্যের দেখাদেখি অনেকেই ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন।

কেউ সফল হচ্ছেন আবার কেউ মাঝপথে দিশা হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সেই বিফল অংশকে মাথায় রেখে এই বিশাল বড় পোস্টটি। আশা করি এই উদহারন থেকে তারা ব্যবসা সম্পর্কে অল্প কিছু ধারনা পাবেন। এমন নয় যে, এই পোস্ট পড়ে সকলেই সফল ব্যবসায়ী হবেন, তবে সফল ব্যবসায়ী হবার ধাপগুলো সম্পর্কে হয়ত কিছুটা পরিষ্কার ধারনা পাবেন।

তথ্যসূত্র: ব্যবসা ও মার্কেটিং টিপস বাংলাদেশ ফেসবুক পেইজ।

Check for details
SHARE