শূন্য থেকে সফল! সাত’শ শ্রমিক আজিজারের ফ্যাক্টরীতে!

শুরু করেছিলেন শূন্য হাতে। কাজ করতেন অন্যের কারখানায়। বগুড়ার আজিজার রহমান ওরফে মিলটন আজ সাতটি কারখানার মালিক। সেখানে কাজ করছেন ২০ প্রকৌশলী-কর্মকর্তাসহ ৭০০ শ্রমিক। সাশ্রয়ী দামের কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে আজিজার আজ ‘কৃষকবন্ধু’। আজিজার সম্পর্কে বগুড়ার ব্যবসায়ীদের অনেকে বলেন, তাঁকে দেখে আমরা কাজের অনুপ্রেরণা পাই। আজিজার সহায়-সম্পত্তি, জমি-গাড়ি করেছেন। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে সেই আগের মানুষটিই আছেন। শহরের নামী এলাকায় জমি থাকা সত্ত্বেও তিন ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন কারখানার ভেতরেই।আজিজার বলেন, ‘নিজের পরিশ্রম আর চেষ্টায় এত দূর এসেছি, ভাবতে অবাক লাগে। আবার কৃষি ও কৃষকের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দে বুকটা ভরে ওঠে।’

সেই দিনগুলো: জন্ম শহরের দক্ষিণ কাটনারপাড়ার ছোট্ট বাড়িতে। ভাইবোন মিলিয়ে সাকল্যে সাতজন। বড় আজিজার। ভালো পরিচ্ছদ তো দূরের কথা, ছেলেমেয়েদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতেই হিমশিম খেতেন বাবা ফেরাজউদ্দিন। ১৯৭৫ সালে ফেরাজউদ্দিন প্রজেক্টর মেরামতের কাজ শেখেন। উত্তরের বিভিন্ন শহর ঘুরে এ যন্ত্র মেরামত করতেন। এতে কিছু আয় হতো। এরপর ‘বগুড়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে’ শিখলেন অগভীর নলকূপ মেরামতের কাজ।আজিজার তখন শিশু। স্কুলে পড়ে। বন্ধুরা পরে আসত রঙিন জামা। আজিজারের এক কাপড়েই কাটত সারা বছর।

অন্যরা শহরের ‘ঠাকুরের বিরিয়ানি’ খেতে যেত, মাত্র ২৫ পয়সা জোটাতে না পেরে যাওয়া হতো না তাঁর। এভাবে এসএসসি পাস করলেন, শহরের করনেশন ইন্সটিটিউশন থেকে। সময়টা ১৯৮৫ সাল। টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারলেন না কলেজে। বাবার সঙ্গে কারখানায় শ্রমিক বনে গেলেন আজিজার। অচল যন্ত্রকে সচল করার কাজ করতে হতো তাঁকে। ছোট্ট কচি হাতে ঘা-ফোসকা পড়ে যেত। সারা মাস পর মজুরি মোটে ৭০০ টাকা। দুই টাকা বেশি রোজগারের আশায় করতেন ওভারটাইম। একটু বিশ্রাম নিলেই সুপারভাইজারের ধমক।

সংগ্রামের শুরু: এভাবেই কেটে যায় কৈশোর। একসময় যন্ত্রাংশ মেরামতে হাত পাকল। একদিন নিজেই একটা লেদ যন্ত্র বসানোর কথা ভাবলেন।

বাড়িতে এসে নিজের ইচ্ছার কথা জানালেন মাকে। মা শেষ সম্বল গয়না বেচে দিলেন কিছু টাকা। ছোট বোন দিলেন তাঁর জমানো কিছু। এভাবে ১৯৮৯ সালে ৩০ হাজার টাকায় লেদ যন্ত্র কিনে বসালেন বগুড়া শহরের রেলওয়ে মার্কেটে। সারা দিন অন্যের কারখানায় কাজ করে ঘরে ফিরে মধ্যরাত অবধি কাজ করতেন নিজের কারখানায়।

হাড়কাঁপানো শীতে একখানা গরম কাপড় কেনার জন্য ৫০০ টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মরার লেদটা বিকল হয় ঠিক তখনই। আজিজারের আর শীতের কথা মনে থাকে না। ওই টাকায় যন্ত্রাংশ কিনে ঠিক করেন লেদটি।

পরের বছর চাকরি ছেড়ে দিয়ে মন দিলেন নিজের কারখানায়। মেরামতের কাজ বাদ দিয়ে ভাবলেন নিজেই কিছু তৈরি করার কথা। তখন থেকে শুরু হলো তাঁর উৎপাদনমুখী শিল্পের যাত্রা। ১৯৯০ সালে বিসিক থেকে ক্ষুদ্র প্রকৌশল ঋণ হিসেবে একটা আধুনিক লেদ ও ড্রিল যন্ত্র পেলেন, সঙ্গে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। ছয় মাসের মধ্যে সেই টাকার বেশির ভাগই সংসারের ধারদেনা মেটাতে ব্যয় হয়ে গেল।

অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে লেদে সেচ যন্ত্রের পাম্প তৈরিতে লেগে পড়লেন। নাম দিলেন ‘মিলটন পাম্প’। দিনে একটা করে পাম্প বানাতে পারতেন। খরচ পড়ত তিন হাজার টাকা। বেচতেন দুই হাজার টাকা লাভে। প্রথম থেকেই ফাটাফাটি বাজার পেল তাঁর পাম্প।

পাঁচ বছরের মাথায় দিনে ২০০ পাম্প তৈরি হতে থাকে। বাজারে পাম্পের চাহিদার সঙ্গে বাড়তে থাকে ব্যবসা। নিজের কারখানার পাশাপাশি স্থানীয় আরও ২০টি লেদ কারখানার সঙ্গে চুক্তি করে পাম্প উৎপাদন করেন আজিজার। ১৯৯৭ সালে রেলওয়ে মার্কেটের পাশাপাশি বিসিকে প্লট নিয়ে পাম্প তৈরির আধুনিক কারখানা দেন।

ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প: ২০০৩ সালে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়ার রুগ্ণ ও দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শিল্প ‘ফিরোজ মেটাল ওয়ার্কস’ কিনে তা চালু করেন। এই কারখানায় দিনে বর্তমানে ৪০০ টিউবওয়েল তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় দুই হাজার রকমের কৃষি ও হালকা প্রকৌশল পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এখানে। আজিজারের চারটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে পানি তোলার সেচ পাম্প, হস্তচালিত নলকূপ, রিকশা-ভ্যান, কলের লাঙলের যন্ত্রাংশ, খোয়া-সিমেন্ট-বালু মেশানোর যন্ত্রাংশ। যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে সিমেন্ট ও সাবান কারখানার; পাটকল, তেলকল ও চিকন সেমাই কলের। তৈরি হচ্ছে সব ধরনের মোটর ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশও।

সরেজমিন: গত বুধবার বগুড়া-রংপুর মাটিডালি সড়কের পাশে শহরের বিসিক শিল্পনগরে আজিজারের কারখানায় গিয়ে দেখা যায় এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। কারখানার এক পাশে পুরোনো লোহা-লক্করের স্তুপ। কারিগর বাদশা মিয়া জানান, এসব গলিয়ে নানা জিনিস বানানো হবে।

পাশের কারখানাটিতে তৈরি হচ্ছে নলকূপ ও সেচ পাম্প। শ্রমিকদের কেউ লেদ মেশিনে পিস্টন বানাচ্ছেন, কেউ বানানো পাম্প শেষবারের মতো মসৃণ করছেন। নারীশ্রমিকেরা পাম্প ও টিউবওয়েল রং করছেন। রংমিস্ত্রি যুবতী রানী বলেন, এখানে প্রায় ১০০ নারীশ্রমিক কাজ করছেন। সারা দিন রঙের কাজ করে একেকজন গড়ে দুই থেকে তিন শ টাকা করে রোজগার করছেন।

দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে: দেশে বাজার পাওয়ার পর ২০০৮ সাল থেকে ভারতে পাম্প রপ্তানি শুরু করেন আজিজার। তিনি বলেন, ‘রপ্তানি পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপের কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারিনি। ফলে রপ্তানি শুরুর ছয় মাস পর বন্ধ করে দিতে হয়।’

আজিজার তাঁর কারখানার উৎপাদিত পণ্য দেখাতে এবং কাজ শিখতে নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, থাইল্যান্ড, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় তাঁর পণ্য প্রদর্শন এবং বাণিজ্য সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী, সচিব ও উপদেষ্টা আজিজারের কারখানা পরিদর্শন করেছেন। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে গিয়েছেন ভারতের টাটা, জাপানের জাইকা ও নেপালের সচিব পর্যায়ের প্রতিনিধি। ২০১২ সালে সারা দেশ থেকে তিনজন শিল্পোদ্যোক্তাকে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। এই তিনজনের একজন মনোনীত হন আজিজার।

যন্ত্রের সঙ্গে বসবাস: শিল্পকারখানা ছাড়াও আজিজারের ৭৭ শতক জায়গার ওপর রয়েছে দুটি গুদাম, শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকায় তাঁর রয়েছে এক একর জায়গা। কারখানার পণ্য পরিবহনের জন্য রয়েছে সাতটি ট্রাক, রয়েছে দুটি বাস ও দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি।

আজিজার বলেন, ‘কারখানার যন্ত্র আমার কাছে সন্তানের মতো। সারা রাত কারখানায় কাটিয়ে দিই। সকালে কিছুক্ষণ ঘুমাই। এসব সন্তান ছেড়ে আলিশান বাড়িতে ঘুম ধরে না, তাই যন্ত্রের সঙ্গে বসবাস করছি।’

একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে অর্জনটা কী, জানতে চাইলে আজিজার বলেন, ‘কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে সবাই ভিড় ঠেলে একনজর আমাকে দেখতে আসেন। আর বলেন, “ওই যে মিলটন পাম্পের মালিক।” তখন নিজেকে ধন্য মনে হয়।’

বগুড়া বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক আবদুল মজিদ বলেন, ‘কঠোর পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা আর সাধনার মাধ্যমে সাফল্যকে জয় করার বড় উদাহরণ আজিজার রহমান। তিনি অন্য উদ্যোক্তাদের জন্য দৃষ্টান্ত।’

তথ্যসুত্র: প্রথমআলো ডটকম।

Check for details
SHARE