‘শুধু ব্যবসা নয়; বেকার সমস্যা সমাধানেও কাজ করেছি!’

সাক্ষাতকার প্রতিবেদনটি অর্থসূচক থেকে সংগৃহীত: পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল বাজারজাতের মধ্য দিয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা গ্রুপ। তাদের মূল ব্যবসা পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট। বর্তমানে পোল্ট্রি খাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, গম, ভূট্টা, সয়াবিন, ডাল বাজারজাত করছে গ্রুপটি। আগামীতে এই খাতের কমপক্ষে ৫ শতাংশ বাজার দখলে নিতে চায় তারা। একইসঙ্গে বেকার সমস্যার সমাধানেআবদান রাখার স্বপ্ন দেখেন ঢাকা গ্রুপের কর্ণধার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ।

গত ২১ বছরে ঢাকা গ্রুপে যুক্ত হয়েছে ১১টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম হলো টয়ো ফিড মিলস, এনআর ট্রেডিং, আল আমিন পোল্টি ফিড, আল আমিন ফিডস, সাদ বিল্ডার্স, আল আমিন এগ্রোভেট, এমএম হসপিটাল ইত্যাদি। এই গ্রুপের সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আছেন আবুল কালাম আজাদ। তার বলিষ্ঠ নের্তৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রুপটি।

আগামীতে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করার জন্য একটি সতন্ত্র অর্থনৈতিক জোনের পরিকল্পনা রয়েছে ঢাকা গ্রুপের। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে জমিও কিনেছে তারা। সম্প্রতি অর্থসূচকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় পোল্ট্রি খাতের সমস্যা-সম্ভাবনাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন আবুল কালাম আজাদ। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন অর্থসূচকের নিজস্ব প্রতিবেদক গিয়াস উদ্দিন।

অর্থসূচক: কবে এবং কীভাবে ঢাকা গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছে?
আবুল কালাম আজাদ: ১৯৯৬ সাল থেকে ব্যবসা করছে ঢাকা গ্রুপ। আল আমিন পোল্ট্রি ফিড দিয়ে এই গ্রুপের ব্যবসা শুরু। বাজারজাত করে আসছি পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল। তারপর যুক্ত হয় এই খাতের মেডিসিন। এরপর কনজুমারে পর্যায়ে গম, ভূট্টা, সয়াবিন এবং ডাল বাজারজাত শুরু হয়। পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল নিজেদের কাছে থাকায় ফিড তৈরির মিল দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন ফিড বাজারজাত করছি।

অর্থসূচক: বর্তমানে কোন কোন খাতে ঢাকা গ্রুপের বিনিয়োগ আছে?
আবুল কালাম আজাদ: ঢাকা গ্রুপের মূল বিনিয়োগ ট্রেডিং ব্যবসায়। এই গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনআর ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পোল্ট্রি ও মানুষের খাদ্য বাজারজাত করা হচ্ছে; পুঁজিবাজারেও কিছু বিনিয়োগ আছে।

অর্থসূচক: ঢাকা গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার কত? বর্তমানে জনবল কেমন?
আবুল কালাম আজাদ: বর্তমানে প্রায় ৩০০ মানুষ সরাসরি আমাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এই গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় হাজার কোটি টাকা।

অর্থসূচক: ঢাকা গ্রুপের অন্যতম অঙ্গ প্রতিষ্ঠান টয়ো ফিড নিয়ে পরিকল্পনা কী?
আবুল কালাম আজাদ: প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে আমাদের মুরগির মাংস ও মাছ প্রয়োজন। আর মাছের খাবার প্রস্তুত করতে টয়ো ফিড মিলকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পোল্ট্রি শিল্পের বিকল্প কিছু নেই। পোল্ট্রি এবং ফিস বাংলাদেশে একটি বড় সম্ভাবনাময় খাত। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চাহিদাও বাড়ছে।

অর্থসূচক: পোল্ট্রি শিল্পে মেজর প্লেয়ার কারা?
আবুল কালাম আজাদ: পোল্ট্রি শিল্পের মেজর প্লেয়ার হলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে রয়েছে- থাইল্যান্ডের সিপি বাংলাদেশ, নিউ হোপ ইত্যাদি। আর স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে কাজী ফার্মস, প্যারাগন, কোয়ালিটি, নারিশ, আফতাব গ্রুপ।

অর্থসূচক: টয়োটা ফিডের অবস্থা কেমন?
আবুল কালাম আজাদ: কিছুদিন আগেই আমরা এই ব্যবসা শুরু করেছি। অল্পদিনে ব্যপক সাড়া পেয়েছি। আমাদের টার্গেট সারা দেশে যে পরিমাণ ফিডের চাহিদা আছে তার কমপক্ষ ৫ শতাংশ দখলে নেওয়া।

অর্থসূচক: নিরাপদ পোল্ট্রি পেতে হলে পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদনকারীদের কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?
আবুল কালাম আজাদ: নিরাপদ পোল্ট্রির জন্য অবশ্যই কাঁচামাল একটি অন্যতম উপাদান। কাঁচামাল ভালো না হলে ফিড ভালো হবে না; ফিড ভালো না হলে পোল্ট্রি ভালো হবে না। এখানে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারের মনিটরিং বাড়াতে হবে। ফিড মিলে কোনো ভেজাল কাঁচামাল ব্যবহার করা যাবে না।

অর্থসূচক: পোল্ট্রি খাদ্য শিল্পের বর্তমান বাজারের আকার কত? সমস্যা ও সম্ভাবনা কতটুকু?
আবুল কালাম আজাদ: পোল্ট্রি শিল্পের আকার সংক্রান্ত পর্যাপ্ত পরিসংখ্যান না থাকলেও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের সম্ভাবনা অনেক। দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন। এই চাহিদা পূরণে মিট, পোল্ট্রি এবং ফিস প্রয়োজন। আমাদের দেশে বর্তমানে বছরে মাথাপিছু মাংস গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৪ কেজি। অন্যান্য দেশের তুলনায় এটি অনেক কম। এই চাহিদা পূরণ করার সহজ উপায় হলো সস্তা পোল্ট্রি। তাই সামনে এর চাহিদা আরও বাড়বে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে। ফলে আগামীতে মাংসের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে।

তবে পোল্ট্রি শিল্পে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। বর্তমানে দেশে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ব্যবসা করছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের ব্যবসা করতে হয়। তারা বিদেশ থেকে সাশ্রয়ী ফান্ড নিয়ে আসায় উৎপাদন ব্যয় কম হয়। কিন্তু আমাদের উচ্চ সুদের ফান্ড ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাদের তুলনায় আমাদের প্রফিট মার্জিন কম।

যে প্রক্রিয়ায় পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ করার কথা- সেভাবে করা যাচ্ছে না। পোল্ট্রি ফিড তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ভূট্টা শুকানোর জন্য অটোমিটিং মেশিন বা চাতাল নেই। ফলে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। এতে আমাদের আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে। এতে অনেক অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বিষয়ে সরকারের একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন।

অর্থসূচক: গত পাঁচ বৎসরে পোল্ট্রি খাদ্য শিল্পের প্রবৃদ্ধি কেমন হয়েছে?
আবুল কালাম আজাদ: এর সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে বিভিন্ন উৎসের তথ্য মতে, গত ৫ বছরে এই শিল্পে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে গত এক বছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল এর চেয়ে বেশি। চাহিদার বেশি উৎপাদন করতে পারলে সেটি দেশের বাহিরে রপ্তানি করার সুযোগ আছে।

অর্থসূচক: ঢাকা গ্রুপের কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার চিন্তা আছে?
আবুল কালাম আজাদ: একটি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখার জন্য পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে, ওই কোম্পানির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। একইসঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইলে খুব সহজে সেখান থেকে মূলধন উত্তোলন করা যায়। এতে দেশ ও দেশের অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখা যায়। ঢাকা গ্রুপের কিছু প্রতিষ্ঠান হয়তোবা আগামী দিনে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে পারি।

অর্থসূচক: ঢাকা গ্রুপ নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
আবুল কালাম আজাদ: ইতোমধ্যে ঢাকা গ্রুপের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এই গ্রুপের ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করতে আমরা সরকারের কাছে একটি অর্থনৈতিক জোনের জন্য আবেদনের চিন্তা করছি। এর মাধ্যমে দেশের ১৬ কোটি মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকতে চাই। আমরা আরও বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে চাই।

অর্থসূচক: ঢাকা গ্রুপ কী দিন দিন একাই বড় হচ্ছে? নাকি সিএসআরএ তাদের কোনো অবদান আছে?
আবুল কালাম আজাদ: আমরা আমাদের সাধ্যমত কাজ করছি। কুমিল্লা শহরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি। এবার প্রথমবারের মতো পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে রেকর্ড গড়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা মডেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটিতে শতভাগ পাস করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট ৭৬ জন পরীক্ষার্থী ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ৫৪ ছেলে ও ২২ মেয়ে। কলেজের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ শতাংশকে বিনামূল্যের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। এছাড়া শীত বা বন্যায় সাধ্যমত সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ঢাকা গ্রুপ।

তথ্যসূত্র: অর্থসূচক ডটকম।

Check for details
SHARE