শর্টকাট ব্যবসায় কোটিপতি চিন্তা, অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা!

সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান গেইটের বিপরীতে যে রাস্তাটা বংশালের দিকে চলে গেছে তার নাম সাতরওজা। এই রাস্তার মাঝামাঝি রওজা শরীফের আশেপাশে বেশ কিছু বিরিয়ানীর দোকান আছে। এর মধ্যে একটি দোকান কাচ্চি বিরিয়ানীর জন্য খুবই বিখ্যাত। দোকানটির নাম কলকাতা কাচ্চি বিরিয়ানী। কাচ্চি বিরিয়ানীর সেরা স্বাদের জন্য প্রয়োজন ভালো সুগন্ধী চাল, মাঝারি ওজনের কম চর্বির খাসির মাংস এবং প্রয়োজনীয় মশলার উপযুক্ত ব্যবহার- যা এই দোকানের মালিক বেশ ভালো করেই অনুসরন করেন। বাড়তি হিসেবে আছে দোকানের কর্মচারীদের আন্তরিক ব্যবহার। ফলে আপনি যখন ক্রেতাকে গ্রহনযোগ্য দামে ভালো জিনিস খাওয়াবেন, তখন লাভ এবং সুনাম দুইটাই যৌক্তিক ভাবে চলে আসে। এই সুত্র অনুসরন করে সাত রওজার কোলকাতা কাচ্চি এখনও টিকে আছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুখোমুখি হয়েছে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার।

গত বছরের দিকে এই দোকানটির অদূরেই একটি নতুন কাচ্চির বিরিয়ানীর দোকান চালু হয়। দোকানটির সাজসজ্জা এবং কর্মকর্তা, কর্মচারীদের মনোভাব কলকাতা কাচ্চির তথা ঐ অঞ্চলের যে কোন খাবারের দোকানের চাইতে বহুগুন আধুনিক এবং দৃষ্টিনন্দন। পাশাপাশি, খাবারের স্বাদ, গুণগতমান এবং পরিমান খুবই আকর্ষনীয়। ফলে চালু হবার অল্প দিনের মধ্যেই এই দোকানটি কলকাতা কাচ্চির বিরিয়ানীর সাথে দারুন প্রতিযোগিতা শুরু করে এবং অচিরেই একটি ভালো অবস্থানে চলে আসে, নতুন শাখাও তৈরী হয়। দোকানটির নাম গ্র্যান্ড নবাব। তাদের এই সাফল্যে দেখে আশেপাশের বেশ কয়েকজন দোকানদার গ্রান্ড নবাবের সাজসজ্জা প্রায় হুবহু নকল করে বিরিয়ানীর দোকান দেয়। নামগুলো অনেকটা এমন, গ্র্যান্ড সুলতান, গ্র্যান্ড শাহজাহান ইত্যাদি।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই দোকানগুলো চালুর কিছুদিন পরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। কলকাতা কাচ্চি ঘর এবং গ্র্যান্ড নবাব মিলে সারা দিনে যদি ১০০০ প্যাকেট খাবার বিক্রি হয়, তাদের হয় ৫০ থেকে ১০০। আমি আনুমানিক একটা পরিসংখ্যান বললাম। গ্র্যান্ড নবাবের সাফল্য দেখে খাবারের দোকান দিয়েছেন এমন ব্যবসায়ীকে আমি কিছুটা ব্যক্তিগতভাবে চিনি। ভদ্রলোকের আয়ের মাধ্যম হচ্ছে পৈত্রিক সুত্রে প্রাপ্ত কিছু দোকানের ভাড়া এবং কয়েক বছরের প্রবাস জীবনে অর্জিত কিছু অর্থ।

গত বছরের শেষের দিকে তাঁর সাথে হঠাৎ আমার রাস্তায় দেখা হয়ে গেলো। অনুরোধ করলেন, এক কাপ চা খেতে। আমিও রাজি হলাম।কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই, আপনার তো বেশ জানা শোনা আছে, আমাকে কোন চালু ব্যবসার সন্ধান দিতে পারেন?
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, চালু ব্যবসা মানে?
তিনি জবাব দিলেন, চালু ব্যবসা মানে, ধরেন বাজারে ভালো চলে, চাহিদা আছে বা ভালো লাভ হয় এমন কোন ব্যবসা।
আমি বললাম, আপনি তো ইতিমধ্যে খাবারের ব্যবসায় আছেনই। খাবারের ব্যবসায় তো অনেক লাভ।
তিনি বললেন, নাহ! ভাই। এত খরচ করে হোটেল দিলাম, কর্মচারীদের বেতনই মাঝে মাঝে উঠে না।
জিজ্ঞেস করলাম, বলেন কি? সমস্যা কোথায়?
তিনি বললেন, জানি না। আমার দোকানের ডিজাইন আর নবাবের ডিজাইনে কোন পার্থক্য নাই। খাবারের দামও বেশি রাখি না। টেস্টও ভালো। তাও কেন যেন আমারটা চলে না। ভাবতেছি, নতুন কোন ব্যবসা শুরু করব।
জিজ্ঞেস করলাম, কিসের ব্যবসা করবেন?
তিনি বললেন, জানি না, খুঁজতেছি। আপনারাও তো ব্যবসা করেন, আমারে একটা লাইন দেখান না।
আমি তেমন কিছু না বলে, হালকা আশ্বাস দিয়ে চলে আসলাম।

প্রিয় পাঠক, যে ঘটনাটি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম, মুলত তা হচ্ছে এই লেখাটির মুল ভাবনা। এই দেশে অধিকাংশ মানুষ কোটিপতি হবার স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসা শুরু করে এবং প্রায় সকলেই অল্প সময়ে দ্রুত বড় ব্যবসায়ী হবার ইচ্ছা পোষন করেন। আশেপাশের মানুষদের জীবনযাত্রা, স্বচ্ছলতা, জীবনকে উপভোগের সুখী উদহারন যখন কারো ব্যক্তিগত আয়ে বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না, তখনই অধিকাংশ মানুষ ব্যবসা করতে আগ্রহী হয়। যার যত উপভোগের ইচ্ছা, তার তত দ্রুত বড়লোক হওয়া চাই। বেশিদিন উপভোগ করতে হলে, বেশি দিন বাঁচতেও হবে। বয়স দ্রুত বাড়ছে, সময় দ্রুত কমছে, তাই সবকিছু উপভোগের জন্য প্রয়োজন তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়া। যেদিন থেকে আপনি তাড়াতাড়ি বড়লোক হবার জন্য ব্যবসা শুরু করবেন, সেদিন থেকেই আপনার ব্যবসায় লস শুরু, আপনার নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ সবই হুমকির মুখে পড়বে। প্রতিনিয়ত আপনাকে যুদ্ধ করতে হবে মিথ্যা এবং প্রতারণার সাথে। এর প্রভাব আপনার ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক এবং জাতীয় পর্যায়ে পর্যন্ত পড়ে। আমাদের অলক্ষ্যে রোপিত হয় দূর্নীতির বিষবৃক্ষ।

অথচ ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে নিজের জন্য পরিশ্রম করা, ভালো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে অন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। একটি দেশের শক্ত অর্থনীতির জন্য দরকার অনেক উদ্যোক্তা। শুধুমাত্র চাকরীজীবি সৃষ্টি করে একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড শক্ত হয় না। ১৯১২ সালে ঐতিহাসিক চৈনিক বিপ্লবের বেশ কিছুদিন পর চীন সরকার তাদের দেশে ১২ বছর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিলো। চীন সরকারের বক্তব্য ছিল, এত ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কি করবে? কোথায় চাকরি পাবে? কেই বা চাকরী দিবে? এত হাজার হাজার বেকারকে চাকরী দেয়ার মত প্রতিষ্ঠান চীনে নেই। এই সময়টায় চীন তাদের ছেলেমেয়েদের নানা ধরনের ট্রেড কোর্সে আধুনিক প্রশিক্ষন দিয়েছিলো। স্বল্প মেয়াদী এই সব কোর্স শিখে চীনের ছেলেমেয়েরা স্বাবলম্বী হয়ে গেলো। প্রতিটি বাড়ি গড়ে উঠল একটা ছোট কারখানায়। পরিবারের সবাই সেখানে কাজ করে। বড় ফ্যাক্টরী করার আলাদা খরচ নেই। ফলে পন্যের উৎপাদন খরচ কমে গেলো। শুরু হলো চাইনিজ অর্থনীতির শক্তিশালী যাত্রা। বর্তমানে যে কোন পন্য স্বস্তায় উৎপাদন করার সক্ষমতায় তাদের ধারে কাছে কেউ নেই। পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে চাইনিজ পন্যের প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিশ্ব বানিজ্যে চীন এক অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি। উপযুক্ত মুল্য দিলে তারা এমন জিনিস বানিয়ে দেবে যার গ্যারান্টি আপনি চাইলে ১০০ বছরও দিতে পারবেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের লেখাপড়ার প্রেক্ষাপট চাকুরীর জন্য নির্মিত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা অবস্থায় আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মনে অবচেতনভাবে চাকুরীর কথা প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। নিজের পায়ে দাড়ানো, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি-এই ধারনাগুলো খুব কমই রয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। পাশাপাশি আমাদের অন্তরে গেঁথে আছে, কাজের মুল্যায়নে জাত ও শ্রেণী চেতনা তথা কাজের উঁচু নিচু শ্রেনীবিভাগ। আমার এক আগের পোস্টে উল্লেখ্য করেছিলাম, এই দেশে ধনী পরিবারের একজন সন্তান বেকার থাকাকালীন সময়ে সমাজে যে সম্মান পায়, গরীব পরিবারের যে সন্তানটি পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বার্থে অথবা একটু বাড়তি আয়ের জন্য যখন কোন ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে যখন ওয়েটার হিসেবে কাজ করে তখন সেই সম্মানের সিকিভাগও তিনি পান না। আমাদের কাছে সে শুধুই একজন সামান্য ওয়েটার। অথচ শিক্ষা বলে কর্মই সকল সম্মানের মানদন্ড।

আমরা যারা ব্যবসা করতে আগ্রহী, তারা অনেকেই জানি না, ব্যবসা শুরু ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা কোথায়? ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা কিভাবে অর্জন করা যায়, ব্যাংক থেকে কিভাবে অর্থনৈতিক সাহায্য পাওয়া যায়? এই পোস্টে এই সকল বিষয়ে সামান্য আলোচনা করা হয়েছে। যদি আগ্রহী কারো মানসিক শক্তি বৃদ্ধিতে কোন সাহায্য হয়, তাহলেই হয়ত কিছুটা সফলতার গন্ধ খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের বিনিয়োগ ধারনা, বৈচিত্রতা এবং সৃজনশীলতা প্রায় শূন্যের কোথায়। এখানে ব্যবসা নির্ধারিত হয়, অন্যরা কি ব্যবসা করে সাফল্য পেয়েছে তাঁর ভিত্তিতে, নিজেদের দক্ষতা বা বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে নয়। উদহারন আমার লেখার প্রথম অংশে।
বিষয়টি এমন নয় যে, যে ব্যবসা অন্য একজন ইতিমধ্যে করেছে, আপনি সেই ব্যবসা করতে পারবেন না। অবশ্যই আপনি অন্যকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে যে কোন ব্যবসায় আগ্রহী হতে পারেন। কিন্তু সেই ব্যবসায় বিনিয়োগের পুর্বে আপনাকে এর খুঁটিনাটি বুঝে নিতে হবে, অন্তত মোটামুটি ধারনা রাখতে হবে। ক্রেতাদের সেই গৎবাঁধাই পন্য কি দেবেন নাকি আরো কিছুটা আকর্ষনীয় করে উপস্থাপন করবেন, গুনগত মান আরো ভালো করবেন, সেটাও আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ন বিবেচ্য বিষয়। মনে রাখবেন, মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তন পছন্দ করে। তাই যে কোন প্রচলিত ব্যবসায় যদি আপনি ইতিবাচক কোন পরিবর্তন এনে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তখন সফলতা একটি লজিক্যাল সিকোয়েন্স।

বিনিয়োগে সৃজনশীলতা শব্দটা হয়ত বহুল প্রচলিত নয়। তবে এর মুল অর্থ সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি। বিনিয়োগের সৃজনশীলতা মানে হলো নিত্য নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা। সবাই যা করছে, গতানুগতিক ধারা অবলম্বন না করে, নতুন নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করা। যেমন ধরুন, গুলশান বাড্ডা লিংক রোডে নতুন যে রাস্তাটি লেকের পাড় দিয়ে হাতির ঝিলের দিকে প্রবেশ করেছে, সেখানে বিকেলের দিকে অনেকেই বন্ধুবান্ধব বা পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন। এই মানুষজনের আসা যাওয়াকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি অনেকেই সেখানে স্ট্রীট ফুডের অস্থায়ী দোকান দিয়েছেন। সেখানে কি কি পাওয়া যায়? চা থেকে শুরু করে চটপটি, ফুচকা, হালকা ফাস্টফুড। ঐ রাস্তার একজন সাহস করে একটি ছোট্ট কফিশপ দিয়েছেন। সেখানে নানা রকম কফি অল্প দামে পাওয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত কি তা এই মুহুর্তে বলা সম্ভব নয়, তবে এটা সত্য যে আমি প্রতিনিয়ত সেই দোকানে বাড়তি ভীড় দেখি। এই দোকানটি হচ্ছে ঐ রাস্তার প্রেক্ষাপটে সৃজনশীল বিনিয়োগের উদহারন।

আমি শতভাগ নিশ্চিত, এই দোকানটি যদি সাফল্য লাভ করে, তাহলে এই দোকানের আদলে আরো বেশ কয়েকটি কফি শপ অচিরেই সেখানে গড়ে উঠবে। ব্যবসায় এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে কিন্তু আন্তরিক এবং কৌশলি না হলে বিনিয়োগ শতভাগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। বলাবাহুল্য, এখানে কোন কোটিপতি ব্যক্তি বিনিয়োগ করবেন না, এখানে বিনিয়োগ করবেন, ভাগ্য উন্নয়নে সুযোগ সন্ধানী সাধারন মধ্যবিত্ত মানুষ। এই মধ্যবিত্ত মানুষের বিনিয়োগ যদি ক্ষতিগ্রস্থ বা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে তাহলে তাদের পাশে দাঁড়ানো জন্য কেউ নেই। সরকার তো দূরে থাক নিজের মানুষও এই সময়ে হয়ত মুখ ফিরিয়ে নেন। আমাদের বিশ্লেষকরা বলেন, অবকাঠামোর সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারনে দেশে বেসরকারী বিনিয়োগ বাড়ছে না। এটা হয়ত বড় ব্যবসা বা শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিন্তু আমাদের মত মধ্যবিত্তের জন্য ‘আস্থার’ অভাবই হচ্ছে বিনিয়োগ করে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারন। প্রায় সকল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় দেশের ব্যাংকের তারল্য বাড়ছে। ব্যাংকগুলো এখন প্রচুর অলস অর্থ নিয়ে বসে আছে।

তাই তুলনামুলক কম ঝুঁকির বিনিয়োগের জন্য সবার আগে প্রয়োজন-
১) যে কাজে বিনিয়োগ করবেন, সেই কাজ সম্পর্কে আপনার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা।
২) আলোচ্য বিষয়ে আপনার আগ্রহ বা প্যাশন।
৩) মার্কেট রিসার্চ।
৪) একটি সম্ভাব্য পাইলট প্রজেক্ট।
৪) সম্ভাব্য ক্রেতা সম্পর্কে ভালো ধারনা।
৫) কাস্টমার কেয়ার।

তত্বীয় কথা না বলে, কিছু বাস্তবিক উদহারন দিচ্ছি। ধরুন আপনি তৈরী পোষাকের ব্যবসা করতে আগ্রহী। আপনি মনে করছেন, তৈরী পোষাকের ব্যবসায় ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। আপনার ক্যাপিটাল ১০ লাখ টাকা। আপনাকে সবার আগে এই জানতে হবে এই ব্যবসার খুঁটিনাটি দিকগুলো। যেমন, তৈরি পোষাকের পাইকারি বাজার কোথায়, খুচরা বাজার কোথায়, পাইকারী এবং খুচরা বাজারের মধ্যে দামের পার্থক্য। যদি নিজে পোষাক প্রস্তুত করতে চান, তাহলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আপনি কোথায় পাবেন, ফ্যাক্টরী কোথায় পাবেন। ফ্যাক্টরীতে কিভাবে অর্ডার দিতে হয় এবং আপনার তৈরীকৃত পোষাকের বাজার কোথায়?

বাজারে সকল বয়সী মানুষদের পোষাক পাওয়া যায় এবং আমাদের দেশে তৈরী পোষাকের চাহিদা ব্যাপক। ধরুন আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আপনি বাচ্চা এবং মেয়েদের পোষাক বিক্রি করবেন। প্রাথমিকভাবে আপনি ঠিক করলেন, ঢাকার আশেপাশে অঞ্চলগুলোতে আপনি পাইকারীভাবে পোষাক কিনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করবেন। এই ক্ষেত্রে প্রথমেই আপনাকে সেই বাজারগুলোতে রেকি করতে হবে। সেখানে বিভিন্ন দোকানদার যারা ঢাকা থেকে পন্য কিনে আনেন তাদের সাথে যোগাযোগ করলেন, তাদের চাহিদা সম্পর্কে অবহিত হলেন। আপনার প্রস্তাবিত কিছু পন্যের নমুনা বা স্যাম্পল দেখিয়ে বাজার যাচাই করলেন। দিনশেষে দেখলেন, এখানে পোষাক সরবরাহ করতে পারলে দিন শেষে সকল খরচ বাদ দিয়ে পার পিসে নূন্যতম ৫/৬ টাকা প্রফিট করতে পারবেন। মার্কেট ধরার জন্য প্রথমে প্রচলিত স্টাইলে কিছুটা কম লাভ করলে ভালো। যদি কিছু অগ্রীম অর্ডার নিতে পারেন, তাহলে সেটা হবে এই পর্যায়ে আপনার সেরা অর্জন। এই অভিজ্ঞতাই আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে দারুন সাহায্য করবে।

এরপর একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে, ব্যাংকে আপনার প্রতিষ্ঠানের নামে একটি কারেন্ট একাউন্ট খুলে আপনার নির্ধারিত মুলধনের দশভাগের একভাগ সেখানে ক্যাপিটাল হিসেবে জমা দিয়ে ব্যবসায় নেমে পড়ুন। ধরে নিন, এই এক লাখ টাকা আপনার সর্বোচ্চ মুলধন। এই এক লাখ টাকায় আপনি বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরীর প্রায় ১০০০/১৫০০ পিস পোষাক পাইকারীভাবে কিনতে পারবেন। সকল খরচ বাদ দিয়ে যদি প্রাথমিকভাবে নূন্যতম ৫ টাকা করে প্রফিট করতে পারেন, তাহলে ৫০০০ থেকে ৭৫০০ টাকা প্রফিট হতে পারে। যদি মাসে দুইবার পোষাক সরবরাহ করতে পারেন, তাহলে মাসিক লেনদেন দুই লাখ টাকা এবং প্রফিট ১০/১৫ হাজার টাকা। ছোট অবস্থায় এই লেনদেন এবং লাভ কোন অংশেই ছোট নয়। পাশাপাশি, ছোটবড় সকল লেনদেন আপনার ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমেই করুন। মাঝে মাঝে কিছু টাকা জমা দিয়ে, দুই একদিন পর তা আবার তা তুলে ফেলুন। এতে আপনার একাউন্টের বার্ষিক লেনদেন ভালো হবে, আপনার একাউন্ট প্রোফাইল ভারী হবে। যা ভবিষ্যতে খুবই্ কার্যকরী ভুমিকা পালন করবে। নিয়মিত ব্যাংকে যান, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে কিছুটা যোগাযোগ রাখুন। একজন ভালো নিয়মিত ক্লায়েন্ট হিসেবে ব্যাংকে আপনার পরিচয় নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, পাইকারী বাজার, কাঁচা বাজারে যত বেশি ঘোরাফেরা করবেন, পরিচিত মুখ হবেন ও ভালো ব্যবহার এবং সৎ ভাবে কাজ করবেন ততবেশি ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করবেন।

এই পাইলট প্রজেক্ট যদি ৫০ ভাগও সফল হয়, ততক্ষনে এই খাতের অনেক খুঁটিনাটিই জেনে যাবেন। তখন বাজারের চাহিদা বুঝে আরো কিছু টাকা চাইলে বিনিয়োগ করতে পারেন। এটা হবে তুলনামুলক নিরাপদ বিনিয়োগ। পাশাপাশি, নতুন ক্রেতা এবং বাজার তৈরী করুন। একজন ভালো ব্যবসায়ী চেষ্টা করেন অল্প সময়ে তার মুলধনকে বার বার ব্যবহার করতে। যতবার মুলধনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবেন, ততবেশি লাভ হবে। তবে মনে রাখবেন, অতি লোভে তাতি নষ্ট।

এরপর ধীরে ধীরে আপনি মুল ব্যবসায় প্রবেশ করবেন। তবে কোনভাবেই আপনার নির্ধারিত মুলধনের অর্ধেকের বেশি আপনি এই পর্যায়ে বিনিয়োগ করবেন না। বাকি মুলধন হচ্ছে, আপনার রিস্ক নেয়ার সাহস। ব্যবসার সাথে ঝুঁকি জড়িত। তবে এই ঝুঁকিটা হতে হবে ক্যালকুলেটিভ রিক্স। আপনার ব্যবসা এক বছর অতিবাহিত হলে, যথাযত ক্রেতা তৈরী হলে, বাজার বড় হলে, আপনি ধীরে ধীরে পোষাক তৈরী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করুন। চেষ্টা করুন প্রতিমাসে নূন্যতম ১০/১৫ হাজার পিস তৈরী পোষাক সরবরাহ করতে। মনে রাখবেন বড় স্কেলে পোষাক সরবরাহ পিস হিসেবে হয় না, ডজন হিসেবে হয়। হিসেবের সুবিধার জন্য পিস হিসেবে আলোচনা করছি। এই পর্যায়ে যদি সব খরচ বাদ দিয়ে আপনি ১০ টাকা পার পিস প্রফিট করতে পারেন, তাহলে মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা আপনি আয় করছেন।

আপনি চাইলে এই পর্যায়েই থাকতে পারেন অর্থাৎ ব্যবসা চাইলে নাও বাড়াতে পারেন। যদি আপনি আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আরো উঁচুতে দেখতে চান, তাহলে আরো শেকড়ে যেতে হবে, অর্থাৎ পোষাক তৈরীর কথা চিন্তা করতে হবে। এই সংক্রান্ত সকল খরচ এবং তথ্য আপনি নিজেই জোগাড় করতে পারবেন। একটা ফ্যাক্টরী দেয়া মানে হচ্ছে আপনার নিজস্ব কিছু ক্রেতা প্রস্তুত, আপনার নিজের একটি শোরুম আছে এবং যেখানে আপনি পাইকারী ও খুচরা বিক্রি করেন। ঐ পর্যায়ে না গেলে, ফ্যাক্টরী দিয়ে বিপদে পড়তে হবে। প্রথমেই এক লাইনের (সাধারনত ২০ টা মেশিন নিয়ে এক লাইন তৈরী হয়) ফ্যাক্টরী না দিয়ে, আপনার প্রতিষ্ঠানের নামে দুই তিনটা পুরানো মেশিন নিয়ে পরীক্ষামুলক কাজ করতে পারেন। যদি আপনার নিজের অর্ডার এই দুই তিনটা মেশিনে না কুলায়, তাহলে আরো কিছু পুরানো মেশিন কিনতে পারেন। হাতে টাকা থাকলেও আপনি এই পর্যায়ে ব্যাংকের দারস্ত হতে পারেন।

ধরে নিচ্ছি, এই পর্যায়ে আসতে আপনার প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে, এই তিন বছরে আপনার প্রতিষ্ঠানের মাসিক টার্নওভার ২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০ লাখ হয়েছে (মাসিক টার্নওভার মানে হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিমাসে কত টাকার লেনদেন করে)। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। যেহেতু আপনি দীর্ঘদিন ব্যাংকের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছেন, আপনার মাধ্যমে ব্যাংক উপকৃত হয়েছে, ব্যাংকের ম্যানেজার আপনাকে ভালো একজন ক্লায়েন্ট হিসেবে চেনে। এই পর্যায়ে আপনি যদি এসএমই লোনের জন্য এপ্লাই করেন, তাহলে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই ব্যাংক স্বউদ্যোগে আপনাকে লোন দিয়ে দিবে। এটা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। তবে বেশি টাকা লোন না নিয়ে, ৫ লাখ টাকা লোন নিয়ে তা দিয়ে মেশিনারী কিনে এক বছর ব্যবসা করে দ্রুত যদি সময়ের আগে ফেরত দিতে পারেন, তাহলে আপনি ব্যাংকের একজন সেরা কাস্টমার হিসেবে বিবেচিত হবেন। এই পরিচয়, এই ভালো সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ন, যা ভবিষ্যতে কাজে দিবে। মনে রাখবেন, ব্যাংক কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। ব্যাংক নিজে একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের কাছে আপনার আমার অর্থ গচ্ছিত থাকে। ইচ্ছেমত লোন তারা দিতে পারে না। দায়িত্বের ব্যাপার থাকে। যারা ব্যাংক লোন দেয় না বলে চিৎকার করেন, তারা সঠিক পদ্ধতি অনুসরন করেন না বলেই আমি শতভাগ নিশ্চিত। সঠিক কাগজপত্র থাকলে, নিয়ম অনুসরন করলে এবং ধৈর্য ধরলে ব্যাংক আপনার পিছনে দৌড়াবে।

এইভাবে আস্তে ধীরে আপনি ছোট ছোট টাইম ফ্রেম এবং পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাবেন। একটা পর্যায়ে আপনার পরিশ্রম, ভালোবাসা, বুদ্ধি, মেধা, সততা এবং সর্বপরি যোগ্যতা দিয়ে হয়ত বড় একটি ফ্যাক্টরীর মালিক হয়ে যেতে পারেন। বিদেশী বায়ারের জন্য নিজে চেষ্টা করবেন, যোগাযোগ করবেন, বিজিএমই এর সাহায্য নিবেন। ১০ বছর পর যদি সব ঠিক থাকে তাহলে আপনার প্রতিষ্ঠানে হয়ত ১০/১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

মনে রাখবেন ব্যবসা মুলত একটি বটবৃক্ষের বীজের মত। ধীরে ধীরে তা মহিরূহতে পরিনত হয়। রাতারাতি বড়লোক হবার কোন বৈধ পদ্ধতি নেই। সম্প্রতি দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ইনভেস্ট করছে খাবারের ব্যবসায়, আমদানি, রপ্তানিতে। কারন কথিত আছে, এই সকল ব্যবসা খুবই লাভজনক। অথচ প্রতিটি ব্যবসাই লাভজনক, যদি তা সঠিক পরিকল্পনায় করা যায়। তাই অভিজ্ঞতা থাকুক বা না থাকুক, কিছু বুঝুক বা না বুঝুক অন্যের দেখাদেখি অনেকেই ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। কেউ সফল হচ্ছেন আবার কেউ মাঝপথে দিশা হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সেই বিফল অংশকে মাথায় রেখে এই বিশাল বড় পোস্টটি লিখলাম। আশা করি এই উদহারন থেকে তারা ব্যবসা সম্পর্কে অল্প কিছু ধারনা পাবেন। এমন নয় যে, এই পোস্ট পড়ে সকলেই সফল ব্যবসায়ী হবেন, তবে সফল ব্যবসায়ী হবার ধাপগুলো সম্পর্কে হয়ত কিছুটা পরিষ্কার ধারনা পাবেন।

পাশাপাশি দেশের সরকারের কাছে আবেদন থাকবে, আমাদের দেশে মধ্যবিত্তদের কথা চিন্তা করে, বিনিয়োগের ব্যাপারে যথাযথ সচেতনতা এবং প্রশিক্ষন প্রদান করা। উদ্যোক্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযত পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। পরিচিত অনেক মানুষ, ব্যবসা করার ‘লাইন ঘাট’ খুঁজে। তাদের কাছে অনুরোধ, অন্যের কাছে পরামর্শ না চেয়ে, নিজে একদিন মাঠে নামুন, সারাদিন আপনার পছন্দের ফিল্ডে ঘুরাঘুরি করুন, অন্যের কাছে জিজ্ঞেস করার চাইতে কোন অংশে কম জানবেন না। আর যা জানবেন, সেটাই আপনার ব্যবসা শুরুর অনুপ্রেরণা, মুলধন।

তথ্যসুত্র: সামহোয়্যার ব্লগ।
মূল লেখা পড়তে লিংক: http://www.somewhereinblog.net/blog/mozaddid/30178529
Check for details
SHARE