শর্টকাটে সফল হওয়ার চিন্তা বাদ দিন!

আজকাল শর্টকাটের যুগ। ঘাঘরা শর্ট হয়ে স্কার্ট থেকে মিনি স্কার্ট হয়ে গেছে সেই কবেই। কলকাতায় দেখে এসেছি মেয়েরা হট্‌ প্যান্ট (মিনি স্কার্টের আরো ছোট ভার্সন)পরে ঘুরছে। বাংলাদেশেও চলে আসবে আশা করি। সিনেমা বানানো এখন এত সহজ যে ফিল্ম থেকে ডিজিটাল ফিল্ম হয়ে এখন শর্টফিল্ম বানানোর চল শুরু হয়ে গেছে। তার আবার ফেস্টিভালও হয়। এদিকে শুধু শিল্প দিয়ে স্ট্যাটাস রক্ষা হয় না, তাই শর্টকাটে কিভাবে বড়লোক হওয়া যায় সেই চিন্তা প্রতিনিয়ত মাথার মধ্যে মাথা ঠুকে মরছে। যে কোন মূল্যে পকেটে টাকা আসতে হবে, সে দুই নম্বরি করে হোক, লোক ঠকিয়ে হোক বা চুরি-ডাকাতি করে।

টাকা না থাকলে যে প্রেমটাও শর্টকাটে হবেনা! প্রথম দুদিন দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়াও, তারপর দুই একটা দামী গিফট্‌ তারপর জমবে আসলে প্রেম। না, ভুল বললাম, আজকাল যে কি হয়েছে জানিনা, প্রেমের মূল পর্বেও বড্ড বেশি শর্টকাট হয়ে যাচ্ছে। যে কারনে আবার ভায়াগ্রার মত ওষুধ দিয়ে শর্টকাটে শক্তিমান হওয়ার চেষ্টা। কিন্তু এতে কি আর মেয়েদের মন পাওয়া যায়? তাই, ব্রেক-আপের পর্বটাও খুব শর্টকাটেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপর কিছুদিনের শর্ট বিরহের বিরতি এবং যথারীতি দুঃখকষ্ট কাট করে আবারো নতুন কাউকে খোঁজা।এবার কিছুটা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনা। তাই, বিয়ের প্ল্যানিং মাথায় রেখে শর্টকাটে কোন চাকরীর চেষ্টা। উপর মহলের কাউকে ধরতে হবে।কিন্তু সেইসব লোকজনের রুমের সামনে যে লম্বা লাইন, সেটাকে কাটিয়ে শর্টকাটে পৌছানোর ব্যবস্থা না করলে চাকরীর আশা দুরাশায় পরিণত হতে পারে।

আবার যদি বা কোনভাবে চাকরী পাওয়াও যায় তো সেটাকে রক্ষা করার জন্য সময়মত রেগুলার অফিসে পৌছানো চাই। এর জন্যও আপনাকে শর্টকাট কিছু রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে যেন অফিস টাইমের জ্যাম এড়ানো যায়। বেসরকারী চাকরী করলে তো কোন কথাই নেই, জীবন এমনিতেই শর্টকাট হয়ে যাবে।শুধু রাতে ঘুমানো বাদ দিলে পুরোটা সময় ‘কর্পোরেট গাই’ হওয়ার চেষ্টাতেই কেটে যাবে। এই কর্পোরেট গাই আর গোয়াল ঘরের গাই এর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য থাকেনা যদিও। দুজনেরই কাজ হলো খালি দুধ দিয়ে যাওয়া, মুখে কোন শব্দ করা যাবেনা।

আর যদি সরকারি চাকরী হয়, তাহলে দেশ ও দশের চিন্তা করে সময়টা বেশি কাটবে। এই চিন্তা করতে করতেই টেবিলে ফাইলের পর ফাইল জমা হতে থাকে। কিন্তু বোকা পাবলিক বোঝেনা কিভাবে শর্টকাটে এই ফাইল বের করতে হবে। যারা বোঝে তারা অবশ্য কাজটা সরকারী অফিস থেকে বের করে আনতে পারে। যদিও পকেটটা খুব শর্টকাটে ফাঁকা হয়ে পড়ে, তাতে কি? সরকারী কর্মচারির সময় নষ্ট করা যাবেনা। চাকরীজীবিদের জীবনে এই ‘সময়’ জিনিষটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। খুব শর্টকাটে প্রমোশন পাওয়ার ব্যাপার থাকে। অফিসের বাইরে সমাজে স্ট্যাটাস মেইন্টেইন করার জন্য শর্টকাটে বাড়ি-গাড়ি করা লাগে। যারা চাকরি করেনা, ক্যারিয়ার হিসেবে অন্য কোন কিছু বেছে নেয় তাদের ব্যাপার আবার আলাদা। বাড়িগাড়ি, টাকাপয়সা এসব জিনিষ এদেরও চাই।

তো কি করা যায়? হ্যা, শর্টকাটে যদি খ্যাতিলাভ করা যায়, তারকা হওয়া যায় তাহলে সম্ভব।ফেসবুক তো আছেই। যদি ছেলে হও তো প্রতিদিন কিছু জ্ঞানের বানী/উপদেশ ছাড়ো স্ট্যাটাস হিসেবে(নিজে পার্সোনাল লাইফে সেসব মানো না মানো কিছু যায় আসে না), আর মেয়ে হও তো একটু ক্লিভেজ বের করে প্রতিদিন ছবি পোষ্ট করো। অল্প দিনেই ফলোয়ার লাখ ছাড়িয়ে যাবে।যারা ভার্চুয়াল জগতের অর্জন দিয়ে সন্তুষ্ট হতে চায় না তাদের শর্টকাটে স্টার হওয়ার জন্য টেলিভিশনে রিয়েলিটি শো আছে, ইউটিউবে নিজের একটা চ্যানেলে খুলে “যা খুশি তাই” টাইপ কনটেন্ট দিয়ে ভিডিও বানিয়ে আপলোড করার অপশন তো থাকছেই। যাই হোক, চাকরী করুক, ব্যবসা করুক বা শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করুক, এসব করতে গেলে অনেক কষ্ট করা লাগে।

কিন্তু কেউ কেউ আবার এত বেশি চালাক যে শর্টকাটে ‘জাতে’ ওঠার জন্য দেশেই থাকতে চায়না। যা করার বিদেশে করব। তো এদের জন্য আবার শর্টকাটে ইংরেজী শেখার কোর্সও আছে।লিখিত গ্যারান্টি সহকারে। কেউ ছয় মাসে, কেউ তিন মাসে আবার কেউ ৩০ দিনেই ইংলিশ শেখানোর চ্যালেঞ্জ দিয়ে বই বিক্রি করছে হরদম।এই জাতে ওঠার ব্যাপারটা শুধু ইংলিশে কথা বলা দিয়ে হয়না। মেয়ে হলে তাকে শর্টকাটে ফর্সা হওয়ার জন্য নিয়মিত ফেয়ারনেস ক্রিম মাখতে হবে এবং সঙ্গে ফেসবুকের ছবিগুলো এডিট করার জন্য ফটো এডিট করাও শিখতে হবে। আর ছেলে হলে শর্টাকাটে সিক্স প্যাক বানানোর জন্য পাড়ার মোড়ে মোড়ে জিম আছে।

যদিও এই জিমে যাওয়ার ব্যাপারটা প্রতিবছর ৩০ ডিসেম্বর রাত ১১:৫৯ টায় ফেসবুকের পোষ্ট দেয়ার সময় মনে পড়লেও, ১ জানুয়ারী দুপুর বেলায় ঘুম থেকে উঠে বমি করতে করতে আর মনে থাকেনা। নিউ ইয়ার রেজ্যুলুশনের হ্যাংওভারটাও খুব শর্টকাটে দূর হয়ে যায় মাথা থেকে।এদিকে আবার খোলা বাতাসে ঘুরে যে মনটা একটু ফ্রেশ করব সে উপায়ও নেই। আগে রিকশায় চড়ে হাওয়া খাওয়া রীতিমত একটা রোম্যান্টিক ব্যাপার ছিল। আজকাল ব্যাটারি চালিত রিকশা এসে শর্টকাটে সব জায়গায় যাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এইসব রিকশা যেভাবে রাস্তায় চলে তাতে করে পরলোক গমনের রাস্তাটাও যে কোন মুহূর্তে শর্টকাট হয়ে যেতে পারে।

আর এদিকে আমার অবস্থা একবার ভাবুন, শুরুতেই ভেবেছিলাম শর্টকাটে আজকের লেখাটা শেষ করব, কিন্তু কতবড় হয়ে গেল! শর্টকাট ব্যাপারটা আসলে সবার সঙ্গে যায়না। শর্টকাটে কারও কারও হয়ত ভাগ্যটা ফাটে, আবার অনেকেরই জীবনে শর্টকাট ব্যাপারটা খাটেনা।

লেখক: ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান।
তথ্যসুত্র:ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE