রাখাল ফেরিওয়ালা থেকে সফল মাল্টা চাষী!

এক সময়ের রাখাল-ফেরিওয়ালা এই তরুণ উদ্যোক্তা মোসলেম উদ্দিনের স্বপ্ন পূরণের গল্প শুরু হয়েছে লেবুর চাষ দিয়ে। ঠিক ৭-৮ বছর বয়সে অন্যের বাড়ির রাখাল ছিলেন তিনি। বাবা হতদরিদ্র হওয়ায় পড়াশোনা তো দূরের কথা, তিন বেলা খাবারই জুটতো না। ৫-৬ বছর অন্যের বাড়িতে কাজ শেষে ফেরি করে বাদাম, বড়ই আচার ও ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। এ পেশায় জীবন চলে ১০-১২ বছর।

জীবনের ঘানিটানা মোসলেম উদ্দিন নতুন জীবন শুরু করেন লেবু চাষ দিয়ে। চাষি মোসলেম উদ্দিন প্রায় ৫ বছর ধরে লেবু চাষ করে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছেন। তিনি টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার গজারিয়া উত্তরপাড়া এলাকায় জমি লিজ নিয়ে সাড়ে ৬ একর জমিতে লেবুর চাষ করছেন। তিনি প্রতিবছর ১৪-১৫ লাখ টাকা আয় করছেন শুধু লেবু বিক্রি করেই। এছাড়াও তিনি সিডলেস জাতীয় গুটি কলম লেবুর চারা বিক্রি করে বছরে ৫-৬ লাখ টাকা আয় করছেন।

মোসলেম উদ্দিন তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে বলেন, “শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কথা নয়। বেকার ঘরে বসে না থেকে ফল-ফুল ও সবজির বাগান করে বিপুল পরিমাণ আয় করা যায়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। এ মাটিতে যেকোন ধরনের ফসলাদি ফলানো সম্ভব, কিন্তু এতে থাকতে হবে কঠোর প্রচেষ্টা। যেকোন বয়সের নারী-পুরুষও এগিয়ে আসতে পারেন এ পেশায়।”

লেবুর পর মাল্টা চাষেও নীরব বিপ্লব ঘটেছে তরুণ উদ্যোক্তা মোসলেমের। মোসলেম উদ্দিন সাড়ে ৪ একর জমিতে বারি-১ জাতের মাল্টা চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে বিদেশি ফল মাল্টা চাষ করে সফল হয়েছেন তিনি। উপজেলায় বৃহৎ আকারে মাল্টার চাষ হওয়ায় অনেকেই তার বাগানটি দেখতে আসেন। তার বাগানে ৮৫০টি মাল্টা গাছ রয়েছে।

সম্প্রতি মাল্টার বাগান পরিদর্শনে গিয়ে কথা হয় গজারিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের জয়েন উদ্দিনের ছেলে মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় গত দেড় বছর আগে লিজ নেয়া সাড়ে ৪ একর জমিতে মাল্টা গাছ লাগান। এক বছরের মধ্যেই গাছে ফুল ও ফল দেখা যায়। ফলও ভালো হবে বলে তিনি আশা করছেন। লাভজনক হলে এবং কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা পেলে আরো জমিতে মাল্টা বাগান করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

তবে মাল্টা নতুন চাষ করায় কেমন হবে-এ নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে তিনি নিয়মিত পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন বলে তিনি জানান। মোসলেম উদ্দিন আরও বলেন, “নিজে পড়াশোনা করতে পারি নাই। দুই ছেলে এক মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করবো। বড় ছেলে নাজমুল হাসান চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট ছেলে নাঈম হাসান ক্লাস ফোর ও মেয়ে নদী ক্লাস টু-তে পড়ছে। মেয়ের নামেই বাগানের নাম নদী লেমন গার্ডেন’। সব মিলিয়ে বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সুখেই আছি।”

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফায়জুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “মোসলেম উদ্দিন একজন মডেল চাষি। লেবু চাষ করে সে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মাল্টা চাষেও তার সফলতা দেখা যাচ্ছে।” মাল্টা চাষ বিষয়ে তিনি বলেন, “নাতিশীতোষ্ণ ও উষ্ণমণ্ডলীয় জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য উপযোগী ও ফলনের জন্য অনুকূল। অতিপুষ্টি ও ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল মাল্টা। সাধারণত মে থেকে জুন মাস মাল্টা গাছ রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে পানি সেচের ব্যবস্থা থাকলে সারা বছর রোপণ করা যায়।”

তিনি আরও বলেন, “প্রথম বছর প্রতি গাছ থেকে ১০০-২০০টি, দ্বিতীয় বছর ২৫০-৩০০ ও তৃতীয় বছর থেকে ৩৫০-৪০০টি ফল সংগ্রহ করা যাবে। কৃষকরা এ ফল চাষে আগ্রহী হবেন বলে আশা করছি। এসব চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব।’’

তথ্যসূত্র: ফার্মস এন্ড ফার্মার ২৪ ডটকম।

Check for details
SHARE