মোটরসাইকেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে!

মোটরসাইকেলের অন্যতম দেশীয় ব্র্যান্ড রানার। দামে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও গুণগত মানে ভালো হওয়ায় বাজারে দ্রুতই জনপ্রিয়তা পেয়েছে রানারের মোটরসাইকেল। বর্তমানে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এই ব্র্যান্ডের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে সঙ্গে কথা বলেছেন রানার অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান।

রানার দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করেছে। বাজারে এখন আপনাদের অবস্থান কেমন?
হাফিজুর রহমান খান: আমরা ২০০৭ সালে কিছু যন্ত্রাংশ সংযোজনের মাধ্যমে কারখানায় কাজ শুরু করি। ২০১১ সালে এসে পাঞ্চিং, পেইন্টিং, পেস্টিং—এসব কাজ যোগ করে আমরা উৎপাদনকারীর মর্যাদা পাই। এর আগপর্যন্ত আমরা সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানই ছিলাম। কিন্তু ২০১১ সালের পর মোটরসাইকেলের বাজার কমে গিয়েছিল, এর প্রভাব পড়ে আমাদের ওপর।

যে কারণে আমরা তখন নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারিনি। এরপর যখন বাজার বাড়তে শুরু করল, তখন আমাদের বিক্রির পরিমাণও বাড়ে এবং সেটা এখনো অব্যাহত। এ জন্য আমরা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আমরা এখন ইঞ্জিন উৎপাদন করতে চাই। আশা করছি, আগামী বছরের জুনের মধ্যে আমরা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন তৈরির কারখানা স্থাপনের কাজ শেষ করতে পারব।

এই প্রক্রিয়ার শুরুটা কীভাবে হবে?
হাফিজুর রহমান খান: ইঞ্জিনের কিছু কিছু যন্ত্রাংশ আমরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করব। মোটরসাইকেলে যেমন চেসিস, ফুয়েল ট্যাংকার, শিট মেটালের মতো আইটেম দিয়ে আমরা উৎপাদন শুরু করেছি। একইভাবে ইঞ্জিনের ক্ষেত্রেও আমরা কাজ শুরু করব। একটা ইঞ্জিনে ছোট ছোট প্রায় ২০০ রকমের যন্ত্রাংশ থাকে। তবে একটি ইঞ্জিনে প্রধান যেসব অংশ থাকে, সেগুলোর কিছু কিছু আমরা তৈরি করতে পারব। এগুলোর সবকিছু বানানো সহজ বিষয় নয়। ভারত এখনো ইঞ্জিনের অনেক কিছু জাপান থেকে নিয়ে আসে।

ইঞ্জিন কারখানা করার জন্য আপনারা কত টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছেন?
হাফিজুর রহমান খান: আমরা এ বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছি। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে আমরা পুঁজিবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছি। ওই টাকা দিয়ে ইঞ্জিন কারখানা হবে। এ ছাড়া নতুন আরও কিছু মডেল বাজারে ছাড়া হবে। এসব কিছুর পরিকল্পনা আমরা করে ফেলেছি।

রানারের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ, আপনারা উৎপাদনে খুব বেশি মূল্য সংযোজন করেন না। আপনাদের সুযোগ-সুবিধা দিতে গিয়ে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
হাফিজুর রহমান খান: দেশে মোটরসাইকেলের বাজারের ১২ শতাংশ এখন আমাদের দখলে। এটা দিয়ে বাজারে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়। খোলা অবস্থায় এনে সংযোজনকারী (সিকেডি) প্রতিষ্ঠানের বাজার দখল আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমি চাই, উৎপাদক হিসেবে আমরা যেসব সুবিধা পাচ্ছি, সেগুলো নিয়ে সিকেডি প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদনে আসুক।

এতে দেশের মানুষ কম দামে মোটরসাইকেল পাবে। আর যে সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, তা তো কোনো একটি কোম্পানিকে দেওয়া হয়নি। সবার জন্য এটি করা হয়েছে। সরকার নীতি প্রণয়ন করে ইতিমধ্যে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনকে উৎসাহিত করেছে। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে একাধিক কোম্পানি মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে রানারের কাতারে চলে এসেছে।

মোটরসাইকেল উৎপাদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যন্ত্রাংশ উৎপাদনে সক্ষম সহযোগী শিল্পের প্রসার। এটি এখন কোন পর্যায়ে আছে?
হাফিজুর রহমান খান: যেহেতু বাজার বাড়ছে, সেহেতু আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশে বেশ কয়েকটি ভেন্ডর কোম্পানি চলে আসবে। আমরা ইতিমধ্যে এমন চারটি ভেন্ডর তৈরি করেছি। ফরিদপুরে একটি শিট তৈরি কারখানা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে আমরা শিট কিনছি। দিনাজপুরে আছে একটি চেইন তৈরির কারখানা। এ ছাড়া ঢাকায় দুটি প্লাস্টিক কারখানা থেকে আমরা ইন্ডিকেটর লাইট, হেডলাইটের মতো যন্ত্রাংশ নিচ্ছি। টায়ারের জন্য গাজী ও হোসেন টায়ারের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

ব্যাটারি তৈরির জন্যও ইতিমধ্যে দেশে অনেক বড় কারখানা করা হয়েছে।
প্রথম আলো: রানারের মোটরসাইকেল নেপালে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে মোটরসাইকেল অন্য দেশে রপ্তানির সম্ভাবনা কতটুকু?
হাফিজুর রহমান খান: নেপালে এখন পর্যন্ত রানারের এক হাজার মোটরসাইকেল রপ্তানি হয়েছে। সারা বিশ্বে মোটরসাইকেলের বাজার দুই কোটির মতো। কিন্তু আফ্রিকার বাজারে আমরা যেতে পারছি না। কারণ, চীন তাদের মোটরসাইকেল রপ্তানিকারকদের ১৮ শতাংশ করে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। সরকার আমাদের ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটা দিলে আমরা দামে আরও প্রতিযোগিতা-সক্ষম হয়ে উঠতে পারব এবং বাজার বাড়াতেও সক্ষম হব।

মোটরসাইকেলের মানোন্নয়নে আপনারা কী ধরনের কাজ করেন?
হাফিজুর রহমান খান: রানার ২০১১ সাল থেকে গবেষণা ও উন্নয়নে খরচ করছে। গবেষণার জন্য আমাদের কারখানায় যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে, তা বাংলাদেশের আর কারও কাছে নেই। এ কারণেই আমরা ইঞ্জিন বানানোর সাহস করতে পারছি। বাংলাদেশসহ চীন, ভারত ও ইতালির বিশেষজ্ঞরা আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন।

এবারের বাজেটে মোটরসাইকেল খাত কী পেয়েছে?
হাফিজুর রহমান খান: এবারের বাজেটে মোটরসাইকেল খাতে বড় পরিবর্তন নেই। পরিবর্তনটা এসেছে আসলে গত বছর। তখন মোটরসাইকেল উৎপাদকের সংজ্ঞা ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। আবার উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এটা এ বছরের বাজেটে আরও দুই বছরের জন্য অব্যাহত রাখা হয়েছে।

গত বছর এ সুবিধা ঘোষণার পর একাধিক কোম্পানি মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করেছে। যেহেতু এ সুবিধা অব্যাহত আছে, তাই চলতি বছর আরও তিনটি কোম্পানি উৎপাদনে এসে যাবে বলে আমি মনে করি। বর্তমান নীতিমালাটি দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন উৎসাহিত করেছে। এই সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়টি খুবই ভালো পদক্ষেপ। এবারের বাজেটে মোটরসাইকেল-শিল্পের জন্য নীতিমালার যে ধারাবাহিকতা রাখা হয়েছে, সেটি সবচেয়ে ভালো দিক। কারণ, এটা না থাকলে বিনিয়োগ করতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল-শিল্পের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে?
হাফিজুর রহমান খান: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির সঙ্গে পণ্য পরিবহনের সংখ্যাও বাড়ছে। এ পরিবর্তন এখন কেউ চাইলেও আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তত বেশি বাড়বে, যত বেশি মোটরসাইকেলের মতো পরিবহন সহজলভ্য হবে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশরাফুল ইসলাম। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো ডটকম।

Check for details
SHARE