মুদি দোকানদার থেকে অটো রাইস মিল ব্যবসা!

পুলিশ কর্মকর্তা বাবার উৎসাহে ব্যবসায়ে আসেন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার পৌর এলাকার বাসিন্দা তরুণ উদ্যোক্তা মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৯৬ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনায় এম.এ পাশ করে স্বজনদের কাছে ধার-দেনা করে উপজেলা সদরে রড-সিমেন্টের ব্যবসা শুরু করেন। পরে এই ব্যবসা বদল করে মুদি দোকান ব্যবসা শুরু করেন।

ওই সময় উত্তরবঙ্গ থেকে চাল আনতে গেলে পড়তেন বিপাকে। টাকা দিয়েও নির্ধারিত সময়ে চালের সরবরাহ পেতেন না। ঝালকাঠি মোকাম থেকে আনতেন মুদি মাল। আর চাল আনার জন্য বগুড়া বা নওগাঁর চালের মিল মালিকদের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হতো। শুধু তাই নয়; উত্তরবঙ্গ থেকে যে ট্রাক তাদের চাল দিয়ে যেত, ওই ট্রাক বরিশাল অঞ্চল থেকে ধান বোঝাই করে নিয়ে যেত। এসবের অনুসন্ধানে ২০১০ সালে জিল্লুর রহমান উত্তরবঙ্গে যান এবং চাল মিলগুলো ঘুরে দেখে আসেন। টিপ দস্তখত দেওয়া বা অক্ষর জ্ঞান জানা লোকেরা যদি অটো রাইচ মিল পরিচালনা করতে পারেন তাহলে তিনি কেন পারবেন না, এই মনোবল নিয়ে পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন

এর সমাধান খুঁজতে গিয়ে অবশেষে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ২০১২ সালে নিজেই গড়ে তুললেন অটোমেটিক রাইচ মিল। বরিশাল নগরীর দপদপিয়া থেকে নলছিটি উপজেলার কুমারখালি গ্রামটিকে বিচ্ছিন্ন করেছে কেবল সুগন্ধা নদী। এর তীর ঘেঁষে ৪ একর ৮৪ শতক জমির ওপর গড়ে তোলেন স্বপ্নের সুগন্ধা অটো রাইচ মিলটি।

জিল্লুর বলেন, তার অটো রাইস মিল গড়ার পরিকল্পনার কথা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জানালে অনেকে নিরুৎসাহিত করেন। বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ ও দপদপিয়ায় গড়ে ওঠা ২টি অটো রাইচ মিলের মালিকরা উদ্বোধনই করতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে একদিন পূবালী ব্যাংকের পরিচালক সৈয়দ মেয়াজ্জেম হোসেনের সাথে আলাপ করলে তিনি উৎসাহ যোগান। পূবালী ব্যাংক নলছিটি শাখা থেকে ২০১০ সালে অটো রাইচ মিলের জন্য ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ পান। উত্তরবঙ্গের রাইচ মিল দেখে আসা অভিজ্ঞতা থেকে নিজেই অবকাঠামোর নকশা করেন। এরপর চায়না থেকে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) মাধ্যমে অটো রাইচ মিলের মেশিন কিনে আনেন। চায়নিজ ইঞ্জিনিয়াররা এসে মেশিন স্থাপন করে যান।

সুগন্ধা অটো রাইচ এন্ড এগ্রো ফুড প্রসেসিং মিলটি, এখন বিভাগের সবচেয়ে বৃহৎ চাল মিলে পরিণত হয়েছে। চালের সাথে ডাল মিলের পর নেওয়া আরো দুটি পরিকল্পনার একটি বাস্তবায়নাধীন।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুগন্ধা অটো রাইচ মিলের উদ্বোধন করেন জিল্লুর। ওই সময় প্রতিদিন ২ শিফটে ৪৮ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করতে পারতেন। বাজারে চালের চাহিদা থাকায় দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন করেন। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় ইউনিট উদ্বোধনের পর থেকে ডবল শিফটে প্রতিদিন ১শ ৮০ মে. টন চাল প্রতিদিন উৎপাদন করতে পারেন। এজন্য বোরো মৌসুমে ঝালকাঠি, উজিরপুর, আগৈলঝাড়া থেকে গোপালগঞ্জের পুরো জেলা থেকে ধান সংগ্রহ করেন।

আর আমন মৌসূমে ধানের বেশিরভাগই যোগান পান পটুয়াখালী জেলা থেকে। ভারত থেকে চাল আমদানি হতো বলে এর আগে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে খুব একটা লাভ করতে পারেননি বলে জানান জিল্লুর রহমান। তবে এ বছর সরকার মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনতে শুরু করায় তিনি আশাবাদী। এতে করে কৃষক যেমন ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন, তেমনি তারা মিল মালিকরাও লাভের মুখ দেখতে পারছেন। তার বক্তব্য বরিশাল অঞ্চলে সর্বাধিক আমন ধান উৎপাদিত হয়। তাই আমনের মৌসুমে উত্তরবঙ্গ নয়; এই অঞ্চল থেকে সরকার চাল ক্রয় করলে কৃষক ও মিল মালিক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি উত্তরঙ্গ থেকে চাল কিনে বরিশালে আনার পরিবহন খরচ বাঁচবে।

চাল কলের পর ডালের মিল চালু করেছেন জিল্লুর। এখন পোল্ট্রি ও ফিস ফিড উৎপাদন কারখানার জমি ক্রয় ও ডিজাইনের কাজ করছেন তিনি। এরপরই তার ইচ্ছা আছে ধানের কুড়া থেকে অয়েল উৎপাদনের মিল চালু করার। ৩০ কোটি টাকার এসব প্রকল্প কেবল নিজের ভালো থাকার জন্য নয়, সমাজের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার ভাবনা থেকে। যেখানে ইতিমধ্যেই চাল ও ডাল কলে ১০০ জন বেতন ভুক্ত কর্মচারী এবং প্রতিদিনের মজুরীপ্রাপ্ত আরও শত জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। জিল্লুর রহমানের সামনের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হলে তার মুকুটে যেমন আরেকটি সাফল্যের পালক যুক্ত হবে, তেমনি এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে।

তথ্যসূত্র: দ্যা রিপোর্ট।

Check for details
SHARE