মার্কেটিং চতুর কৌশল!

117150756

একটা নামীদামী ব্রান্ডের কোম্পানীর মার্কেটিং এ কাজ করি তখনের কথা। ভদ্রলোক বাজারের বড় পাইকার। ভদ্রলোকের সাথে আমার পূর্বে আমার কোম্পানীর কোন এক সেলস অফিসার এর সাথে কোন এক কারনে বাক বিতন্ডা হয়। এবং আমার কোম্পানীর সকল ধরনের প্রোডাক্ট বিক্রি বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে আমার কোম্পনীর ছোট বড় কোন ধরনের প্রতিনিধিকেই সে সহ্য করতে পারে না। আমি প্রথম দিন প্রথম সাক্ষাতেই ভদ্রলোকের তোপের মুখে পড়ি। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। চেষ্টাও করলাম না বোঝার।

আমার অফিস যেতে প্রতিদিনই বাজারের মধ্য দিয়ে যেতে হত। এটা আমার জন্য সুযোগ তৈরী করল। আমি ভদ্রলোক সম্পর্কে আশপাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করলাম। এবং তখনের জন্য একটাই লক্ষ নির্দিষ্ট করলাম যে ভাবেই হোক আমি তার নিকট সেলস করব। অফিস থেকে পুরাতন মেমো ঘেটে তার ক্রয় সম্পর্কিত তথ্য খুজে বের করার চেষ্টা করলাম। অবাক হলাম আমি পুরো সপ্তাহে যে পরিমান সেলস হয় তার সম পরিমান ক্রয় সে প্রতি মাসে আমার কোম্পানী থেকে করত। যা গত ১১ মাস যাবৎ বন্ধ।

শুরু হল আমার এক্কা দোক্কা খেলা। প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তার দোকানের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়ে একটা সালাম দেওয়াই ছিল আমার একমাসের কাজ। দ্বিতীয় মাসে সালামের সাথে যুক্ত হল ভাইয়া কেমন আছেন। বিড়বিড় করে সালামের উত্তর দিতেন ভদ্রলোক। কিন্তু ভাল আছেন কিনা সেকথা একবারও বলতেন না। ভাল আছি বুঝাতে মাথা নাড়াতেও দেখি নাই তাকে। আমিও নাছোড় বান্দা। শেষ না দেখে ছাড়ছি না। তিন মাস তের দিন পরের কথা। আমার সেলস জগতের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হল।

ভাইয়া কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই ভদ্রলোক আমার উপর হটাৎ করেই ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। যাচ্ছে তাই বলে গালাগাল শুরু করলেন। সেই সাথে আমাকে যেন তার প্রতিষ্ঠানের সামনে না দেখে বলে হুশিয়ারী দিলেন। আমি তার সমস্তটা হজম করে একটা মুচকি হাসি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে শুরু করলাম। আশপাশের সমস্ত লোকেরা আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কত আর বিশ কি ত্রিশ পা সামনে গিয়েছি মাথা নিচু করে। ভদ্রলোক কি মনে করে যেন আমার পেছনে দিকে এগিয়ে এসে আমাকে ডাকলেন। আমার হাত ধরে নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানে চেয়ারে বসতে দিলেন।

আবার বলা শুরু হল। আপনি কি মানুষ নাকি অন্যকিছু? আমি এত গালাগাল করলাম আপনি হাসি দিয়ে চলে যাচ্ছেন। আপনার মধ্যে কি রাগ বলে কিছু নাই। রাগ না থাক লজ্জা তো থাকে একটা মানুষের। আপনার তো তাও নেই। আপনি কি মিয়া। আমি তখনও ঠোটের কোনে মুচকি হাসি ধরেই রেখেছি। আমি তাকে একটা কথা বললাম ভাইয়া আপনি আমাকে গালমন্দ করেন আর যাই করেন আপনার প্রতিষ্ঠানের সামনে আসতে প্লিজ আমাকে নিষেধ করবেন না। আমি আপনার কাছে কোম্পানীর হয়ে প্রতিদিন আসি না। আমি শুধু আপনাকে দেখার জন্য প্রতিদিন একবার আসি। আমার চোখের কোন বেয়ে অঝোর ধারায় পানি ছাড়তে লাগলাম। সে আমার কান্না দেখে কিছুটা বিস্মিত হল। তার রাগের আর লেশমাত্রও আর চোখে পড়ল না।

সে আমার কাছে এবার জানতে চাইল আমি কেন কাদছি? আর আমাকে দেখার জন্যই বা কেন আসেন? কাদো কাদো স্বরে শুরু হল উপস্থিত গল্পটা। আপনার মত আমার একটা ফুপাতো বড় ভাই ছিল। আপনার মতই অনেকটা দেখতে। আপনার মত আমাকে একটুও সহ্য করতে পারত না। আমি ভাল আছি জানতে চাইলেও ওর কাছে বিরক্ত লাগত। আমাকে দেখলেই ও জ্বলে যেত। ইচ্ছেমত করে আমার সাথে কোন কারন ছাড়াই ঝগড়া করত। একটা স্মরনীয় দুর্ঘটনার কথা বলে ওপারে পাঠিয়ে দিলাম ক্ষনিক সৃষ্ট ফুপাতো ভাইকে। আর হুহু করে কেদে উঠলাম। ভদ্রলোক আমাকে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করল। আমি শুধু একটা কথাই বললাম আপনি আমাকে আপনার প্রতিষ্ঠানে আসতে নিষেধ করবেন না প্লিজ। আমি আপনাকে শুধু দেখতে চাই।

নয় দিনপর। ভদ্রলোকের প্রতিষ্ঠানে আমার কোম্পানীর ছয় লক্ষ সত্তর হাজার টাকার পন্য ডেলিভারী হল। আমার প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের পন্য আস্তে আস্তে কমতে শুরু হল তার প্রতিষ্ঠান থেকে। সেই মাসের সমাপনী মিটিংএ শুধুমাত্র আমি হেসেছিলাম। আর বাকীরা তা উপভোগ করেছিল। আমার টার্গেট আমি পূরণ করেছিলাম। যেখানে আমার অফিসের বড় বড় অফিসার গিয়েও বিষয়টা সমাধান করতে পারেনি আমি সেটা সফল করেছিলাম। পুরস্কৃত হয়েছিলাম। বিশ্বাস ছিল লেগে থাকলে অবশ্যই আমি পারব। কৌশল ছিল চতুর আর লক্ষ ছিল নির্দিষ্ট। যেখানে শেষ দেখাটাই ছিল সাফল্য।

Check for details
SHARE