হারিয়ে যাওয়া মসলিনের নতুন উদ্ভাবক

বছর কয়েক আগেও কি ভাবা যেত, প্রায় ২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাংলার মসলিন আবার ফিরে আসতে পারে? মসলিন নিয়ে নানা কিংবদন্তি স্মরণ করে আফসোস করা ছাড়া আর কীই-বা করার ছিল? কিন্তু ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন ঢাকায় মসলিন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের উৎসব হলো, তখন জানা গেল, মসলিন আবার ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন এ দেশের কিছু মানুষ। আর সেই দৃক-বেঙ্গল মসলিন দলের নেতৃত্বে আছেন সাইফুল ইসলাম।

কারুশিল্প বা বুনন নিয়ে কোনো গবেষণা বা পূর্ব-অভিজ্ঞতাই সাইফুল ইসলামের ছিল না। ছাত্র ছিলেন বিজ্ঞানের। তবে পারিবারিকভাবে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা ছিল। ছোটবেলায় তিনিও আরও অনেকের মতো শুনেছেন মসলিন নিয়ে আফসোসভরা কিংবদন্তি—মসলিন শাড়ি দেশলাইয়ের বাক্সে এঁটে যায়, আংটির ভেতর দিয়ে চলে যায়, ব্রিটিশরা মসলিন কারিগরদের আঙুল কেটে দিয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের দৃক গ্যালারিতে সিইও হিসেবে যোগদানের পর ২০১৩ সালের নভেম্বরে সাইফুল ইসলাম লন্ডনে গেছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্টেপনি ট্রাস্টের প্রতিনিধিরা তাঁকে বললেন, তাঁরা মাস ছয়েক আগে লন্ডনে মসলিন নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেছেন। নাম ‘বেঙ্গল টু ব্রিটেন’। তাঁরা চান, দৃক বাংলাদেশে এই প্রদর্শনীটি নিয়ে যাক।
সাইফুল দেখলেন, খুব বেশি তথ্য নেই সেই প্রদর্শনীতে। ঘুরেফিরে মসলিনের কিংবদন্তি আর এর সৌন্দর্যের কথা। প্রদর্শনীতে যে কাপড় প্রদর্শিত হয়েছিল, সেগুলোও মসলিন নয়। এ সময়ের তাঁতিদের তৈরি থানকাপড়ের ওপর তোলা মসলিনের নকশা। সাইফুল বুঝলেন, মসলিন নিয়ে আরও বহু কিছু করার আছে।

দেশে ফিরে দৃকের দলের সঙ্গে সাইফুল মসলিন নিয়ে কাজের আগ্রহ দেখালেন। বোঝা যাচ্ছিল, খুবই ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প হতে যাচ্ছে এটি। দলের সবুজসংকেত পেয়ে ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে দলবল নিয়ে সাইফুল নেমে পড়লেন গবেষণায়। মসলিন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করলেন। গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শরিফউদ্দীন আহমদের কাছে, ২০১০ সালে লন্ডনে যাঁর বক্তব্য শুনে উদ্বুদ্ধ হয় স্টেপনি ট্রাস্ট।

শরিফউদ্দীন অনেক বইয়ের খোঁজ দিলেন। একে একে সাইফুল গেলেন এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ ক্র্যাফটস কাউন্সিলে। মসলিনের ওপর এত যে তথ্য আছে, সাইফুলের জানা ছিল না। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—জাতীয় জাদুঘর, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সবাই সহযোগিতা করল।

মসলিনের তুলা ছিল বিশেষ ধরনের। হতো বিশেষ কিছু অঞ্চলে। সেই তুলা হারিয়ে গেছে বলেই সবার বিশ্বাস। কিন্তু সাইফুলের মনে হলো, কাছাকাছি কিছু একটা তো এখনো থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে গিয়ে সে জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হলো। কিন্তু আড়াই শ বছরে নদীর গতিপথ অনেক বদলে গেছে। তাই বাংলাদেশের স্যাটেলাইট ম্যাপিংয়ের কেন্দ্র আগারগাঁওয়ের স্পারসোতে গিয়ে সাইফুল সংগ্রহ করলেন নানা সময়ের মানচিত্র।

এবার তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন মসলিনের তুলার সন্ধানে। ২০১৪ সালে নৌকা নিয়ে কাপাসিয়ার পথে পথে থেমে গ্রামবাসীর কাছে জানতে চাইলেন, মসলিন তুলার গাছটি তারা দেখেছে কি না, মসলিন নিয়ে কিছু শুনেছে কি না। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া গেল তুলার নমুনা। পরের মাসে গেলেন ঢাকা থেকে বরিশাল। পথে ভিন্ন ধরনের তুলার গাছ পেলেই সংগ্রহ করলেন।

২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে শেষ হলো গবেষণার কাজ। এবার দেশের বাইরে থেকে তথ্য জোগাড়ের পালা। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কিউ গার্ডেন, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পুরোনো বইগুলো পড়তে শুরু করলেন সাইফুল। মসলিনের বড় সংগ্রহ ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট জাদুঘরের রিসার্চ ফেলো সোনিয়া অ্যাশমোরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। মসলিন নিয়ে সোনিয়ার বইটি পড়লেন।

সাইফুলকে আরও বহু দেশে যেতে হলো; বিশেষত, মসলিন যেসব দেশে গিয়েছিল। কত দূর ছড়িয়েছিল মসলিনের সুনাম, মানুষ কতভাবে এটাকে ব্যবহার করেছে, এ নিয়ে ব্যবসা করেছে, এর কত রকম নকল বেরিয়েছিল—সেসব জানা গেল।

সাইফুল দেখলেন, বিদেশিরা অনেক যত্ন করে লিখে রেখেছেন তাঁদের পাওয়া তথ্য ও গবেষণা। কিন্তু তাঁরা লিখেছেন নিজেদের মতো করে। সে গল্পে বাংলাদেশ নেই। তিনি বুঝলেন, গল্পটা পাল্টাতে হলে বাংলাদেশের মসলিনের তথ্য সেখানে তুলে ধরতে হবে। আবার এ-ও দেখাতে হবে যে মসলিন বিলুপ্ত হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের কারিগরেরাই সেটা বানাতেন এবং সে দক্ষতা এখনো তাঁদের আছে। চ্যালেঞ্জটা দুই দিক থেকেই।

একসময় এ দেশের তাঁতিরা ৭০০-৮০০ কাউন্টের সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে মসলিন কাপড় বুনতেন। এখন মাত্র ৬০-৭০ কাউন্টের জামদানি বোনেন বাংলাদেশের তাঁতিরা। যত বেশি কাউন্ট, সুতা তত বেশি সূক্ষ্ম, তত মিহি। সেই সূক্ষ্ম সুতাও এখন আর তৈরি হয় না বাংলাদেশে। যেসব সুতা কাটুনিরা তা করতেন, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন ভারতে। তাঁদের উত্তরসূরিরা এখনো ২০০ থেকে ৫০০ কাউন্টের সুতা তৈরি করতে পারেন। তাঁদের সংগ্রহ করা তুলা দিয়ে ২০০ ও ৩০০ কাউন্টের সুতা তৈরি করালেন ভারতের কাটুনিদের দিয়ে।

সে সুতা নিয়ে আসা হলো বাংলাদেশে। এখানকার তাঁতিরা মসলিনের কথা শুনে খুব উৎসাহ দেখালেও সুতা দেখে দমে গেলেন। এত সূক্ষ্ম সুতার কাজ কখনোই করেননি তাঁরা। শেষ পর্যন্ত টিকলেন কেবল একজন—আল আমিন। আল আমিনের সমস্ত খরচের ভার নিলেন সাইফুল। তিনি তাঁতে সূক্ষ্ম সুতা বোনার ব্যাপারে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে থাকলেন—মসলিন বোনার সময় তাপমাত্রা কেমন হবে, আর্দ্রতা কত থাকতে হবে, সুতার ওপর বৈদ্যুতিক প্রভাব কীভাবে কাজ করে। আল আমিনের ঘরের ছাদ পাল্টে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করলেন সাইফুল, আর্দ্রতা মাপার যন্ত্রও বসানো হলো। সুতা বোনার সময় যেসব সমস্যা হলো, আল আমিন নিজেও একটু একটু সমাধান করতে লাগলেন।

এবার সাইফুল ভাবলেন একটি প্রদর্শনী করা যাক—আন্তর্জাতিক মানের উৎসব। সেখানে স্টেপনি ট্রাস্টের প্রদর্শনীটির সঙ্গে থাকবে দৃক-বেঙ্গল মসলিন দলের তৈরি ‘নতুন মসলিন’ও। প্রকাশিত হবে মসলিন নিয়ে বই। থাকবে মসলিনভিত্তিক ফ্যাশন শো, কর্মশালা ও সেমিনার।

এক বছরের মধ্যেই আল আমিন বুনলেন দুটি মসলিন শাড়ি। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সব হলো। সাইফুল ইসলাম লিখলেন তাঁর বই মসলিন: আওয়ার স্টোরি। উৎসবে এলেন ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট জাদুঘরের সিনিয়র কিউরেটর রোজমেরি ক্রিল ও রিসার্চ ফেলো সোনিয়া অ্যাশমোর। তাঁরা ভীষণ প্রশংসা করলেন এই কমর্যজ্ঞের। জাতীয় জাদুঘরে মাসব্যাপী মসলিন প্রদর্শনীতে প্রায় এক লাখের বেশি দর্শনার্থী এলেন। শ দুয়েকের বেশি ছিলেন বিদেশি কিউরেটর। উৎসবের অর্থায়নে দৃকের সঙ্গে ছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও ব্র্যাকের আড়ং।
মসলিন উৎসবের সময় সাইফুল এমন এক তুলার জাতের সন্ধান পেয়েছেন, যেটি আদি মসলিনের গাছ ফুটি কার্পাসের খুবই কাছাকাছি। সেই তুলার গাছ তিনি প্রাকৃতিকভাবে চাষ করলেন। শীতলক্ষ্যার তীরে একটি জমিতে প্রাচীনকালে যে পদ্ধতিতে ফুটি কার্পাসের চাষ হতো, ঠিক সে পদ্ধতিতেই নতুন জাতের তুলাটির চাষ করলেন তাঁরা।

এখান থেকে যে তুলা পাওয়া গেল, সেটির সঙ্গে কিউ গার্ডেনে সংরক্ষিত আদি মসলিনের তুলার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় দুই তুলার মিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এ ফল এখন বিশ্লেষণ করে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন। যুক্তরাজ্যে গবেষণার দ্বিতীয় পর্যায়ে আসাম থেকে সংগৃহীত কিছু তুলার ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিলেতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামকরা অধ্যাপকের নেতৃত্বে চলছে এই কাজ। এই গবেষণা আরও গভীরভাবে চলতে থাকবে—এমনটাই জানিয়েছেন সাইফুল ইসলাম।

আল আমিন মসলিন উৎসবে ২০০ ও ৩০০ কাউন্টের দুটি শাড়ি বুনেছিলেন। এরপর বুনেছেন ৩৫০ কাউন্টের শাড়ি। এখন বোনার চেষ্টা করছেন ৪০০ কাউন্টের মসলিন শাড়ি। সাইফুল চান, আরও অনেক আল আমিন এ দেশে গড়ে উঠুক। মসলিন চলে আসুক নিয়মিত উৎপাদনব্যবস্থার ভেতরে। কিন্তু এ জন্য সরকার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎসাহ দরকার।

মসলিন জীবিত কারুশিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলে ইউনেসকোর কাছে এর জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন (জিআই) স্বত্ব দাবি করতে পারবে বাংলাদেশ। আর সেটি পেয়ে গেলে মসলিনের অন্য নাম হবে বাংলাদেশ।

সাইফুল ইসলাম জানালেন, সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার মসলিন পুনরুজ্জীবনের জন্য ৫০ কোটি রুপি বাজেট বরাদ্দ করেছে। এই অর্থ দিয়ে তারা মসলিনের কারখানা, কর্মী তৈরির প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং ছোট ছোট বিক্রয়কেন্দ্র করবে। তারা মসলিনের ব্র্যান্ড মূল্য বুঝেছে। আফসোসের কথা, আন্তর্জাতিক মানের একটি মসলিন উৎসব হয়ে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ এদিক থেকে পিছিয়ে আছে।

প্রণব ভৌমিক: সাংবাদিক।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো

Check for details
SHARE