ভাগ্যের চাকা ঘুরলো হস্তশিল্পে!

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার অবহেলিত একটি গ্রাম গুড়নই। গ্রামটি মৎস্য এলাকা নামে পরিচিত। এই গ্রামেরই দিনমজুর পরিবারের সন্তান আর্জিনা আক্তার। অর্থের অভাবে পড়ালেখা বেশিদূর না এগুলেও নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি হস্তশিল্পের কারখানা। এই কারখানায় প্রায় ৩০ জনের মতো বেকার গৃহবধূ ও শিক্ষিত মেয়েরা কাজ করে। নিজেও মাসে আয় করে থাকেন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।

সাত ভাই-বোন ও মা-বাবা মিলে বিশাল পরিবার আর্জিনার। ফলে পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। এই বিশাল পরিবারের ভরন-পোষণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো আর্জিনার বাবা দিনমজুর আজিজ সরদার ও মা মোছা. তনুজা বেগমকে। আর্জিনার নানার বাড়ি কলকাতার হাওড়া জেলায়। মাঝে মধ্যে মায়ের সঙ্গে নানা বাড়ি যেতো আর্জিনা। আর্জিনার নানার বাড়ির অনেক সদস্যরাই এই হস্তশিল্পের কাজ করতো।

পরিবারের সবার কথা ভেবে আর্জিনাও নানার বাড়িতে গিয়ে ৫ বছর হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ নেয়। পরে বোনদেরও এই হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহিত করে। পরে গুড়নই গ্রামে নিজেদের বাড়িতে গড়ে তুলে হস্তশিল্পের কারখানা। বর্তমানে আর্জিনার কারখানায় তৈরি হওয়া পোষাকগুলো চালান হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

আর্জিনা বলেন, পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে মায়ের ইচ্ছেই আমি হস্তশিল্পের কাজ শিখেছি। বর্তমান সময়ে এই শিল্পগুলো বেশির ভাগই শহরে গড়ে উঠছে। কিন্তু আমার ইচ্ছে গ্রামের বেকার মেয়েদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। নিজের পরিবারের অভাব-অনটনের কথা ও নিজেই একটা কিছু করবো এই প্রত্যয় থেকেই এই কাজ শুরু করা।

তিনি আরও বলেন, আজ আমার এই কারখানার মাধ্যমে অনেক বেকার গৃহিণী ও শিক্ষার্থীদের অভাব-অনটন দূর হয়েছে। আজ সব খরচ বাদ দিয়ে আমার মাসিক আয় প্রায় ৩০-৩৫ হাজার টাকা। তবে আর্থিক সহায়তা ও উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমার কারখানায় উৎপাদিত পণ্যগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতো।

কারখানায় কর্মরত লাভলী আক্তার বলেন, আমরা লেখাপড়ার পাশাপাশি এখানে এসে হস্তশিল্পের কাজ করি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মাসে তিন হাজার, কেউ পাঁচ হাজার আবার কেউ ১০ হাজার টাকা আয় করে। এতে করে আমাদের আর বই, খাতা কিনতে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিতে হয় না। বরং আমরা এখান থেকে আয় করে পরিবারকেও সহায়তা করতে পারি।

গৃহবধূ মোছা. লায়লা বেগম বলেন, একসময় আমাদের পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। স্বামীর একার আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। কিন্তু বর্তমানে আমরা আর্জিনার কারখানায় কাজ করে মাসে ভালো টাকা আয় করতে পারছি। সন্তানদের পড়ালেখার খরচ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্বামীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে হয় না।

এ ব্যাপারে আর্জিনার মা মোছা. তনুজা বেগম বলেন, পরিবারের অভাব-অনটনের কথা ভেবে মেয়েদের এই প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহিত করেছি। আমিও মেয়েদের পাশাপাশি এই হস্তশিল্পের কাজ করি। এতে করে আমার সংসারের অভাব-অনটন দূর হয়েছে।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের আহসানগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. মনিরুজ্জামান খান বলেন, আর্জিনা আমাদের সমাজের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমি নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে আর্জিনার হস্তশিল্প কারখানা পরিদর্শন করেছি। আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, আমি নিজে গিয়ে আর্জিনার এই হস্তশিল্প কারখানা ও কাজগুলো দেখেছি। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।

তথ্যসূত্র: আরটিভি অনলাইন।

Check for details
SHARE