ব্রাহমা জাতের ষাঁড়, দুই বছরে ৮০০ থেকে ১০০০ কেজি!

দেশে মাংসের ঘাটতি পূরণে নতুন সংযোজন হচ্ছে ব্রাহমা জাতের ষাঁড় বা গরু। দৈনিক মাংস বাড়বে ৯ শত গ্রাম থেকে ১ হাজার গ্রাম। ২৭ থেকে ৩০ কেজি মাংস উৎপাদন হবে প্রতি মাসে। ৮-১০ বছর বয়সের দেশীয় গরুর মাংস উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ২৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ কেজি পর্যন্ত হয়। তবে মাত্র ২৪ মাস বয়সেই এ জাতের গরু ৭৩০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার কেজি বা ১ টন মাংস উৎপাদন করবে। বর্তমানে বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে।

গরুর নাম: সনাতন ধর্মালম্বীদের পবিত্র এবং মন্দিরের গরু বলে পরিচিত ব্রাহমা বা ব্রাহ্মণ আমাদের আজকের আলোচিত গরু। সনাতন ধর্মালম্বীদের দেবতা কৃষ্ণ এই জাতের গরুকে তার বাহন হিসাবে ব্যবহার করতেন। এই কারণেই এই গরুকে ব্রাহ্মণ গরু বলা হয়। যদিও বর্তমানে যে ব্রাহমা গরু পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা মাংসের গরু হিসাবে বেশ জনপ্রিয় সেটা আসলে ইন্ডিজেনাস বা বিশুদ্ধ ব্রাহামা জাত না। বর্তমান ব্রাহামা জেবু (বস ইন্ডিকাস) জাতের ৪/৫ টা গরুর শংকর করে উন্নয়ন করা হয়েছে একটি জাত। গড় ওজন: ব্রাহমা জাতের ষাঁড়: ৭০০-১০০০ কেজি। গাভী: ৪৫০-৬০০ কেজি। বাছুর: ২৮-৩৫ কেজি।

উৎস দেশ: ব্রাহমা যদিও এখন পৃথিবীর প্রায় সব গরু পালনকারী দেশ গুলোতে পাওয়া যায় তারপর ও এই গরুর উৎস দেশ ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার একটা জনপ্রিয় ইন্ডিজেনাস জাত হলো এই ব্রাহমা বা ব্রাহ্মণ। বর্তমানে আমাদের দেশে যে ব্রাহমা পাওয়া যায় এটার নাম ব্রাহমা হলেও এটা মূলত ‘আমেরিকান ব্রাহমা ব্রীডারস এসোসিয়েশন’ কর্তৃক গীর, সাহিওয়াল, কংকরেজ সহ বস ইন্ডিকাস জাতের আরো কয়েকটি গরুর একটি সম্মিলিত রূপ। ‘আমেরিকান ব্রাহমা ব্রীডারস এসোসিয়েশন’ এর প্রথম সেক্রেটারি জনাব স্টার্টওয়েল বলেন : ‘এটা মাংসের জন্য সম্পূর্ণ নতুন জাতের একটি গরু।’ তাই বর্তমান ব্রাহমা জাতের গরুর উৎস দেশ ‘ইন্ডিয়া’ না বলে ‘আমেরিকা’ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

ইতিহাস: ব্রাহমা বা ব্রাহ্মণ অতি পুরানো জাতের গরু হলেও এর সঠিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা ৪০০০ বছর আগেই থেকে ইন্ডিয়াতে এই জাতের গরু পালন হয়ে আসছে। ইন্ডিয়ার পবিত্র গরু বলে পরিচিত ব্রাহমা ইন্ডিয়ান আদি জাত হলেও যে জাতটি এখন পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে,সেটা মূলত নতুন জাতের একটি ক্রস গরু। যেটা শুরু হয়েছে ১৮ শতকের পরে ব্রাজিলে গির, অঙ্গল, কংকরেজ এর সমন্বয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ‘ইন্দুব্রাজিল’ নামের যে গরু পালন করা হতো সেই গরুর সাথে নতুন জাতের ক্রস করিয়ে আমেরিকাতে ব্রাহমা নাম দিয়ে উন্নয়ন করা হয়।

২০০০ খ্রিস্টপূর্ব : ইনডিয়াতে ব্রাহমা জাতের গরু পালন। ১৮৪৯ সাল : টার্কি সুলতান এর কৃষি উপদেষ্টা ডঃ. ডেভিস এর মাদ্ধমে প্রথম আমেরিকায় এই গরুর আগমন। ১৮৫৪-১৯২৬ : বিভিন্ন জাতের ২২৬ টি ষাঁড় এবং ২২ টি গভীর মধ্যে ক্রস করে জাত উন্নয়ন করা হয়, বর্তমান যে ব্রাহমা আমরা চিনি অর্থাৎ যেটা মার্কিন ব্রাহমা। ১৯২৪ : মার্কিন ব্রাহমা ব্রীডারস এসোসিয়েশন গঠন। ১৯৪৬ : অস্ট্রেলিয়ান ব্রাহমা ব্রীডারস এসোসিয়েশন গঠন। ১৯৫৪ : সাউথ আফ্রিকা তে আমেরিকা থেকে ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি করা হয়। ১৯৫৯ : সাউদার্ন আফ্রিকান ব্রাহমা ব্রীডারস এসোসিয়েশন গঠন।

পালনকারী দেশ: ব্রাহমা গরুর আদি জাত ইন্ডিয়ান হলেও পৃথিবীর খুব কম গরু পালনকারী দেশ আছে যেখানে নতুন জাতের ব্রাহমা পৌঁছে নাই। যদিও এটা এক এক দেশে এক এক নামে পরিচিত। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ব্রাহমা গরু পালনকারী দেশ হচ্ছে: আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইন্ডিয়া, নিউজিলান্ড, সাউথ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া। অস্ট্রেলিয়ার প্রায় মাংস উৎপাদনের ৫০% গরু এ ব্রাহমা বা ব্রাহমা থেকে উন্নয়ন করা গরু।

ব্রাহমা জাতের ষাঁড় বা গরুর বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা: ব্রাহমা গরুর আদি জাতের রং সাদা হলেও বর্তমান ব্রাহমা অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রং এর হয়ে থাকে। তবে মার্কিন ব্রাহমা গরুতে সাদা এবং কালো রং এর আধিক্য দেখা যায়। অত্যন্ত রোগ প্রতিরোধী এবং শক্ত জাতের গরু থেকে উন্নয়ন করা বলে এই জাতের গরুর রোগ বালাই খুব কম দেখা যায়। মাংসের জন্য দুনিয়াজোড়া খ্যাত ব্রাহমা গরু খুব সহজে গরম ও আদ্রতা সহ্য করতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে বস টোরাস জাতের গরু যেখানে ৭৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় দুর্বল হয়ে পরে সেখানে এই জাতের গরু ১০৫ ডিগ্রী তাপমাত্রায় ও সবল থাকে।

এই জাতের গরুর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অতি গরমে এই গরু ঘেমে শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখে। তাছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে এই জাতের গরু শরীরে কম তাপ উৎপন্ন করে। প্রচন্ড সূর্যের তাপেও এই গরু খোলা জায়গা ঘাস খেতে পারে বলে আমেরিকার এবং অস্ট্রেলিয়ার সব জায়গা এই গরু ছেড়ে ঘাসের উপর নির্ভর করে পালন করা হয়। ক্ষতিকর পরজীবী এই গরুকে সহজে আক্রমণ করতে পারেনা। স্বল্প ঘাস এবং খাবারে ও ব্রাহমা গরু সহজে টিকে থাকতে পারে।

দুধ ও মাংস উৎপাদন: মাংস উৎপাদনে এই নতুন সৃষ্ট ব্রাহমা গরু পুরো পৃথিবীতে খ্যাতি ছড়ালেও দুধ উৎপাদনে ঠিক বিপরীত অবস্থা। ছোট দুধ উৎপাদন কালের এই গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা সন্তোষজনক না হলেও দুধের মান খুবই উন্নত। অধিক মিল্কফ্যাট এবং মিল্ক প্রোটিন বিদ্যমান থাকায় এই জাতের দুধ খুব সুস্বাদু। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ক্রস ব্রাহমা থেকে উন্নয়ন করা বিভিন্ন জাতের গরু : ১. ব্রাঙ্গুস (ব্রাহমা + আঙ্গুস) ২. ব্র্যাফোর্ড (ব্রাহমা + হেরাফোর্ড) ৩. বীফমাস্টার (ব্রাহমা + হেরিফোর্ড+ মিল্কিং শর্টহর্ন ) ৪. ছাড়বড়ে (ব্রাহমা + কারোলাইস) ৫. সিমব্রা (সিমেন্টাল + ব্রাহমা) ৬. শান্তা গেরট্রুডিস (ব্রাহমা + বীফ শর্টহর্ন)

অর্থনৈতিক গুরুত্ব: যেহেতু পৃথিবীর মাংসের বাজার মার্কিন ব্রাহমা এবং এটা থেকে উন্নয়ন করা গরু নিয়ন্ত্রণ করে তাই অর্থনৈতিকভাবে এই গরুর গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়া এই জাতের গরুর মাংস সুস্বাদু হওয়ায় মাংসের বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মাংসের জন্য এই গরু পালন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিতে পারে।

ব্রাহমা জাতের ষাঁড় বা গরু পালনে সমস্যা: যেহেতু ব্রাহমা মাংসের গরু এবং মাংস উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়। তাই দুধ উৎপাদনের জন্য এই গরু পালন মোটেও লাভজনক নয়। তাছাড়া এই গরু যেহেতু খোলা জায়গা ঘাস খাওয়ানোর মাধ্যমে পালন করা হয়। তাই আমাদের দেশে এই গরু পালন লাভজনক নাও হতে পারে। যেহেতু আমাদের দেশে ভূমি এবং গো খাদ্যের অভাব রয়েছে। তাছাড়া আমাদের দেশে যেহেতু দুধ বিক্রি করে গরু পালনের খরচ খামারি মিটিয়ে থাকে। তাই আমাদের দেশে এই গরু পালন কতটা লাভজনক তা খামারি নিজেই অনুধাবন করতে পারবে। তাছাড়া এই গরুর রক্ষনাবেক্ষন ও কঠিন, যেহেতু এটা অবাধ্য টাইপ এর গরু। বয়ঃসন্ধির পরে এই গরুর বৃদ্ধি কমে যায়। তাছাড়া ব্রাহমা গরু প্রজননক্ষম হতে অন্য গরু অপেক্ষা অধিক সময় লাগে।

জীবনকাল: যেহেতু ব্রাহমা জাতের ষাঁড় উপমহাদেশের শক্ত জাতের গরু তাই এই গরুর রয়েছে দীর্ঘ জীবনকাল। এই জাতের গরুর গড় জীবনকাল ২৫-২৯ বছর। তবে এই জাতের গরুর ৪৭ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার রেকর্ড রয়েছে। তথ্যসূত্র: ডিপার্টমেন্ট অফ এনিম্যাল সাইন্স, ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ব্রাহমা সোসাইটি, ব্রাহমা নিউজিল্যান্ড, উইকিপিডিয়া।

Check for details
SHARE