ব্যবসার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল!

ব্যবসা শুরু করা যতটা সহজ, ব্যবসাক্ষেত্রে টিকে থাকা কিন্তু ততটা সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে রয়েছে অনেক প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই আপনাকে টিকে থাকতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কিছু কৌশল। ব্যবসার অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, তবে শুরুর আগেই তো আর অভিজ্ঞতা আসবে না; এ জন্য আগে শুরুটা তো হোক।

ব্যবসাক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। পরিকল্পনা ছাড়া ব্যবসায় নামলে আপনার টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে যাবে। সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব বিজনেস ওম্যান অ্যান্ড প্রফেশনালসের চেয়ারম্যান ড· মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী বললেন, ‘প্রথমে ঠিক করতে হবে কী ধরনের ব্যবসা আপনি করতে চান, সে অনুযায়ী মূলধন আপনার আছে কি না।

উৎপাদনমুখী ব্যবসা হলে ঠিক করতে হবে আপনার উৎপাদিত পণ্য কী হবে। এর জন্য যে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও লোকবল প্রয়োজন হবে, তা আছে কি না। বিপণনমুখী ব্যবসা করতে চাইলে যেসব জিনিস বাজারজাত করতে চান, তার চাহিদা বা উপযোগিতা, লাভের সম্ভাবনা কতটুকু-এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

এ জন্য যেসব বিক্রয় কৌশল রয়েছে, তা রপ্ত করতে হবে। উৎপাদনমুখী ব্যবসার জন্য শহর থেকে দূরের কোনো স্থান বেছে নেওয়া ভালো। কিন্তু বিপণনমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজারঘাট অর্থাৎ যেখানে লোকসমাগম বেশি হয়, সেখানে ব্যবসাকেন্দ্র স্থাপন করাই উচিত।

হোটেল, এজেন্সি, পরিবহন ইত্যাদি সেবামূলক ব্যবসা করতে চাইলেও এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে; আর এ জন্য পূর্বপরিকল্পনা থাকতে হবে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ব্যবসার সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বা না থাকা প্রভৃতি বিষয় নির্ভর করে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ওপর।’

ড· মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী বললেন, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুষ্ঠু নীতিমালা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ নীতিমালা লিখিত হওয়াই ভালো। এর আলোকেই আপনার প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে। নীতিমালা থাকলে প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলাবোধ বজায় থাকে।

প্রতিষ্ঠানের মূলনীতি বা লক্ষ্য কী হবে; কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা কেমন হবে; পণ্য বিক্রয় বা বিপণনের শর্ত, গ্রাহকদের কেমন সেবা দেওয়া হবে; ব্যবসার অংশীদার একাধিক হলে কে কতটুকু দায়িত্ব পালন করবে, লভ্যাংশ সমান হবে কি না-এসব বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে লেখা থাকবে এ নীতিমালায়।

ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা প্রণয়নের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার থেকে শুরু করে কর্মচারী-সবার মধ্যে একটি শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি বজায় থাকে; কেউ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। নিয়মনীতি না থাকলে ব্যবসায় মার খাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে।

দি রশিদস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সানজিদ রশিদ চৌধুরী বললেন, ‘ব্যবসার জন্য এমন একটি বিষয় বেছে নেওয়া উচিত, যার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তা না করে যদি আপনি এমন একটি ব্যবসা বেছে নেন বাজারে যার কোনো চাহিদাই নেই, তাহলে কিন্তু আপনার শ্রম, মূলধন, সময়-সবকিছুই বৃথা যাবে। তাই যে কাজটি করতে হবে তা হলো, আপনাকে গ্রাহকের চাহিদা বুঝতে হবে।
.
গ্রাহকদের চাহিদা, পছন্দ, আগ্রহ, সামর্থ্য-এসব বিষয় মাথায় রেখে আপনাকে এগোতে হবে। গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে না পারলে ব্যবসা সফলতার মুখ দেখবে না। গ্রাহকেরা কী ধরনের পণ্য বেশি চান, সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে জরিপ পরিচালনা বা কারও পরিচালিত জরিপ থেকে সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা না থাকলে কিন্তু ব্যবসায় মার খাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসাক্ষেত্রে পণ্য নির্বাচন ছাড়াও স্থান নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ব্যবসার জন্য এমন একটি স্থান বেছে নিতে হবে, যেখানে পর্যাপ্ত গ্রাহক পাওয়া যাবে বা মানুষের যথেষ্ট আনাগোনা রয়েছে। নির্দিষ্ট গ্রাহক শ্রেণীকে লক্ষ্য রেখেই কিন্তু আপনাকে এগোতে হবে।’

ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে, জমি বিক্রি করে বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন। ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল; কিন্তু হঠাৎ করেই বিপদ হলো। দুর্ঘটনা তো আর বলে-কয়ে আসে না! তাই বীমা করাটাও জরুরি। ধরুন, আগুন লেগে আপনার পুরো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাই হয়ে গেল।

এখন উপায়? এ রকম বিপদ তো যখন-তখন আসতে পারে, তখন তো পথে নামতে হবে। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতিজনিত বীমা করা থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিপূরণ দেবে, আর সেই টাকাতেই আবার দাঁড়িয়ে যেতে পারে আপনার ব্যবসা।

বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা যে সব সময় থাকবে তা কিন্তু নয়। আজ যে পণ্যের চাহিদা অনেক, কাল তা না-ও থাকতে পারে। আর এই মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে চাইলে প্রয়োজনে আপনাকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনার পরিবর্তন করতে হবে।

সানজিদ রশিদ চৌধুরী আরও বললেন, ‘প্রয়োজনে ব্যবসায় পরির্বতন আনা যেতে পারে, এটি দোষের কিছু নয়। তবে যে নতুন ক্ষেত্রটিতে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন, তা থেকে লাভ কতটুকু আসবে তা-ও ভাবতে হবে। বাজারে যে জিনিসটির চাহিদা বেশি রয়েছে, সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে ঘন ঘন ব্যবসা পরিবর্তন করলে কোনো ব্যবসাতেই ভালো করা যাবে না।’

অনেক ব্যবসায়ীই ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়েন সঞ্চয় না থাকার কারণে। অনেকেই লাভের প্রায় পুরো অংশই তাঁর পুরোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ফেলেন। তাই তাঁর বিনিয়োগ করা টাকা ছাড়া মূলধনের আর কোনো উৎস থাকে না। তাই কোনো কারণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি সেখান থেকে উত্তরণের কোনো পথ খুঁজে পান না।

শুধু ব্যবসায়িক মনমানসিকতা থাকলেই হবে না, আপনাকে সঞ্চয়ীও হতে হবে। কথায় বলে সঞ্চয়েই সমৃদ্ধি। এ জন্য আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিকটস্থ কোনো সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে নিন। আর তাতে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রাখুন।

যে ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা পাওয়া যাবে, সে ব্যাংকেই হিসাব খুলুন। একসময় দেখবেন আপনার জমানো ছোট ছোট অঙ্ক একটি বিশাল অঙ্কে দাঁড়িয়ে গেছে। এ টাকা যেকোনো বিপদের সময় সম্বল হিসেবে কাজ করবে।

ব্যবসাক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিটাও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ধরে নেওয়া যাক, পাশাপাশি দুটি প্রতিষ্ঠান একই ধরনের পণ্যসেবা দিয়ে থাকে। একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বেশি, অন্যটির কম। কার বিক্রি-ব্যবসা ভালো জমবে? নিশ্চয়ই সেই প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বেশি হবে, যেটির পরিচিতি বেশি।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও পরিচালনায় সহযোগিতা করে থাকে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। প্রতিষ্ঠানটির ‘মার্কেটস অ্যান্ড লাইভলি হুডস’-এর টিম লিডার আবদুর রব জানালেন, ভালো ব্যবসা করতে হলে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়াতে হবে। প্রচারেই প্রসার।

তাই এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রাহকদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও কুশলাদির আদান-প্রদানও একটি ভালো ভূমিকা রাখে। গ্রাহকদের এটিও বোঝাতে হবে যে আপনি ভালো মানের পণ্য বিক্রি করছেন এবং আপনি ইচ্ছা করলে তা বেছেও নিতে পারেন।

এ ছাড়া আর প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো প্রতিষ্ঠানের একটি ভালো নাম দিতে হবে। আধুনিক, মার্জিত, রুচিবোধসম্পন্ন যেকোনো নামই গ্রাহকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। নামের পাশাপাশি লোগো ও স্লোগান থাকাটাও জরুরি। এসবই আপনার প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করবে।

আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, প্রতিষ্ঠানের সুনাম অর্জন করতে হবে। এ জন্য বিশ্বস্ততা, পণ্যের গুণগত মান ও গ্রাহকসেবার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ন্যাচারাল অয়েল মিলসের পরিচালক মো· ওসমান গনি। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে জানালেন, আপনি ছোট-বড়-মাঝারি যে ব্যবসায়ীই হোন না কেন, ব্যবসায় ঝুঁকি থাকবেই। কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভেঙে না পড়ে ক্ষতির কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

ভবিষ্যতে যেন এ রকম না হয়, সেদিকে সচেতন হতে হবে। ব্যবসার ক্ষতি যেটা হয়ে গেছে, তা নিয়ে বেশি হতাশ না হয়ে কীভাবে নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করানো যায়, সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের পরামর্শ নিতে পারেন। এ জন্য অবশ্য ঢাকায় বেশ কয়েকটি কনসালটেন্সি ফার্মও রয়েছে।

ব্যবসায়িক যেকোনো পরামর্শের জন্য তাদের সহায়তাও নিতে পারেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে নয়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করার সময়ই এসব বিষয়ে অভিজ্ঞদের বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE