বিশ্বাস রাখুন নিজের উপর, সফলতা আসবে!

বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, সময় কিন্তু মানুষকে সব সময়ই সঠিক পথ দেখায়। সে পথকে চিনে নেয়ার দায়িত্ব শুধু আপনার। হয়তো ভাবছেন, কী সব আবোল-তাবোল কথা! সময় আবার মানুষকে পথ দেখায় কীভাবে! তাহলে বলি, চোখ-কান খুলে আপনার চারপাশে একটু তাকান। ভূরি ভূরি উদাহরণ মিলবে। এ যেমন ইকবাল বাহার। শিক্ষাজীবন শেষ করে সময়ের দেখানো পথেই পা বাড়িয়েছেন। বাণিজ্যে পড়া লেখা করেও উদ্যম ভাবনার কারণে চাকরিজীবী থেকে হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তা।

তার মতে, ‘চাকরির পেছনে না ছুটে বরং নিজেই একটা কিছু করা এখন সময়ের দাবি। সেই দাবি মেটাতেই তিনি গড়ে তুলেছেন ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান; যার নাম অপটিমাক্স কমিউনেশান লিমিটেড।

ইকবাল বাহার বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ করে যোগ দেন গ্রামীণ সাইভার নেট লিমিটেডে। সেখানে অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার এবং কোম্পানি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওখান থেকেই তার প্রযুক্তির প্রতি ভালোবাসা। তখন থেকেই নিজে কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে তার। ওই সময় বয়স আর কতো, ২৫ বছর হবে।

২০০৩ সালের কথা। হাঁটি হাঁটি পা করে প্রযুক্তির দিকে এগুচ্ছে দেশ। কিছু অফিসে ইন্টারনেট সংযোগ হয়েছে। তাও আবার বেশি না। কিন্তু ইচ্ছা নিজে কিছু করার। শুরু করলেন ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবসা। চাকরির পাশাপাশি জমানো ৫০ হাজার টাকা দিয়ে তা শুরু। কিন্তু এ ব্যবসা করতে দরকার ১ কোটি টাকা। এক দিকে ৯টা থেকে ৫টা অফিস। তারপর ৫টা থেকে ব্যবসা দেখাশোনা। এভাবে চলতে থাকলো তার জীবন।
তখন অ্যাসিস্টেন্ট জেনারেল ম্যানেজার হিসাবে কাজ করেন গ্রামীণ শক্তিতেও। কিন্তু ৫০ হাজার টাকা পূঁজি নিয়ে কতোদূর চলা যায়। নিজেই তৈরি করলেন ইন্টারনেট প্রযুক্তির ওপর প্রেজেন্টেশন। যাতে ফুটিয়ে তোলেন ব্যবসার সফলতা। পরে তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, বিনিয়োগকারীর কাছে ছুটে বেড়ালেন। সফলতাও পেলেন। তারা রাজি হলো বিনিয়োগে। কিন্তু সময় ৬ মাস। নতুন উদ্যমে চলছে তার ব্যবসা।

একদিকে সংসারের হাল, অন্যদিকে ব্যবসার উন্নয়নে রীতিমতো হিমশিম খেয়ে গেলেন। কিন্তু অদম্য চেষ্টা থাকায় কোনো কিছুই দমাতে পারলো না তাকে। তখন তিনি সিঙ্গার বাংলাদেশে মার্কেটিং-এর দায়িত্বে ছিলেন। হঠাৎ ব্যবসায় কালো ছায়া। চারদিকে অন্ধকার। হঠাৎ বাবা গুরুতর অসুস্থ।

একদিকে অফিস, ব্যবসা আর হাসপাতাল- রীতিমতো বেশ ক’টা দিন রোবটের ভূমিকায় জীবনযাপন। এর পরে পিতৃবিয়োগ। ব্যবসার দুরবস্থা আর বাবার মৃত্যুতে মানসিক চাপ যেনো মেনেই নিতে পারছেন না তিনি। এর মাঝে ১২জন সহযোদ্ধার বেতন। অবশেষে চাকরিজীবনে ইস্তফা।
পরে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা ব্যবসা নিয়ে লেগে থাকলেন ইকবাল বাহার। আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। অদম্য চেষ্টায় ঘুরে গেলো ব্যবসা। লাভের মুখে অপটিমাক্স। ১২ জন সহযোদ্ধা থেকে যোগ হলো আরো ক’জন। মোট দাঁড়ালো ৪০-এ। আজ ১৩০ জনের পরিবার। ৫টি বেঞ্চ ও অফিস নিয়ে চলছে পুরোদমে। এখন ইকবাল বাহার চাকরি খুঁজছেন না। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। করছেন সেমিনার ও গণসংযোগ। আজ সবাই তাকে আইটি এক্সপার্ট বলে চলছে।

রাজধানীতে এমন উদাহরণ আছে অসংখ্য। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যের শিক্ষার্থী অরণ্য চৌধুরী কথাই ধরা যাক। পড়ালেখার পাঠ চুকানোর পর কয়েকদিন চাকরি করার পর চাকরির পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন অথৈ ফ্যাশন। এ রকম উদাহরণ ছড়ানো রয়েছে সারা বাংলাদেশেই। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, সময় এখন আপনাকে যে পথে হাঁটতে বলছে, সেই পথের নাম উদ্যোক্তা হবার পথ। অতএব, ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ’-জাতীয় গানের রেওয়াজ বাদ দিয়ে বরং কণ্ঠে তুলুন এমন গান, ‘চাকরিটা আমি দিতে পারি বেলা শুনছ…।’

পুঁজি ও প্রশিক্ষণ, জানি প্রথমেই আপনার মাথাব্যথা শুরু হয়ে যাবে এ ভেবে। উদ্যোক্তা যে হবো, পুঁজি পাবো কোথায়! পুঁজি মিলতে পারে নানা জায়গায়। সেক্ষেত্রে দেখবেন নিজ পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয় স্বজনরাই এগিয়ে এসেছেন আপনার সাহায্যে। তাছাড়া সরকারেরও রয়েছে এ বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ।

যেমন কর্মসংস্থান ব্যাংক। এখানে কেবল ব্যবসায়িক আইডিয়া, সাফল্যের সম্ভাবনা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জমা দিলেই মিলবে স্বল্প কিংবা মাঝারি পরিমাণের পুঁজি। ফ্রিল্যান্সিং, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়াও শুরু করতে পারেন আপনি। পড়ালেখার পাশাপাশি বাড়তি উপার্জনের পথ খুঁজে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সের কাজ হতে পারে আপনার জন্য খুবই ভালো মাধ্যম।

চাই সৃজনশীলতা, যেকোনো উদ্যোগকে সফল করতে সর্বাগ্রে চাই সৃজনশীলতা। তাই নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ইকবাল বাহারের পরামর্শ নিন, সাহস করুন, শুরু করুন, লেগে থাকুন, সাফল্য আসবেই। এরপর যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, জানা, বোঝা ও শেখা। একজন সফল উদ্যোক্তা হবার জন্য চারপাশ থেকে যেমন শিক্ষা নিতে হয়, তেমনি শিক্ষা নিতে হয় বই থেকেও।

এমনটাই মনে করেন এ তরুণ উদ্যোক্তা। সমস্যা থেকেই সুযোগ। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অরণ্যের পরামর্শ হচ্ছে: যারা এখনো দোটানায় ভুগছেন, পারবো কি না, হবে কি না, এতো সমস্যা চারপাশে, যদি না সফল হই তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে, তাদের জন্য বলছি, সমস্যা থেকেই সফল উদ্যোগের জন্ম হয়। সমস্যাকে যিনি সুযোগে পরিণত করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত উদ্যোক্তা।

তথ্যসূত্র: আরটিভি অনলাইন।

Check for details
SHARE