নোমান গ্রুপের সফলতার পেছনের স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প

বয়স তখন মাত্র উনিশ। মফস্বল থেকে ঢাকা এসেছিলেন ভাগ্যান্বষণে। চাকরি নিয়েছিলেন একটি টেক্সটাইল মিলে। বছর না ঘুরতেই পাল্টালেন তিনটি কর্মস্থল। হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন আর চাকরি নয়। ছুটে গেলেন ইসলামপুরের কাপড়ের বাজারে। পকেটে মাত্র ক’টা টাকা নিয়ে ঘোরাঘুরি করলেন কয়েক দিন। শুরু হলো নতুন পথচলা। ফ্যাক্টরি থেকে কাপড় কিনে বিক্রি করতে লাগলেন ইসলামপুরের খোলাবাজারে। দিনের একবেলা টঙ্গী-তেজগাঁওয়ের বিসিক এলাকা। আরেক বেলা ইসলামপুর কিংবা নারায়ণগঞ্জের কাপড়ের বাজার। সোজা কথায় ফ্লাইং বিজনেস। দিন দিন বাড়তে লাগল পসার। তখন বিসিকের ওয়্যাপ নিটিং মিলগুলোয় তৈরি হতো ক্যারোলিন শার্টের কাপড়। বাজার বুঝে তিনি মিলগুলোতে সুতো সাপ্লাই দিয়ে নিজেই শুরু করলেন কাপড় তৈরি। বিভিন্ন মিলে সোল এজেন্ট হিসেবে কাপড় বাজারজাতের পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি শুরু করলেন ডাইস কেমিক্যাল, নাইলন ও পলিস্টার সুতো। এভাবেই কেটে যায় এক দশক। সালটা ১৯৮১। ব্যবসা থেকে পা রাখেন শিল্পের জগতে। অগ্রণী ব্যাংক থেকে টেন্ডারে কিনেন টঙ্গী বিসিকের একটি ওয়্যাপ নিটিং মেশিন। আরটেক্স নামে ছোট্ট মিল দিয়ে শুরু করে আজ সেই টঙ্গিতেই স্থাপন করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ স্বনির্ভর হোম টেক্সটাইল জাবের অ্যান্ড জুবাইর ফেব্রিকস লিমিটেড। বাংলাদেশে টেক্সটাইল খাতের অন্যতম প্রতিকৃতি তিনি। শূন্য হাতে শুরু করে আজ তার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। ২০১২ সালে তার প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানি করেছে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত নোমান গ্রুপ দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ৬০টি দেশে তারা বিশ্বের টপ ব্র্যান্ডের টেক্সটাইল পণ্য সরবরাহ করে। বিদেশী ক্রেতা ও পণ্যের ব্যবহারকারীদের প্রতি সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা প্রকাশই তাদের নিয়ে এসেছে আজকের অবস্থানে।

সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সফল মানুষের প্রতিকৃতি হিসেবে। দেশের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সমাজসেবার অভিপ্রায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একে একে গড়ে তুলেছেন ফেব্রিকস, স্পিনিং, উইভিং, কলোরেশন অ্যান্ড ফিনিশিং, স্টিচিং অ্যান্ড গার্মেন্টস, টেরি টাওয়াল, ডেনিম টেক্সটাইল ও টেক্সটাইল এক্সেসরিজ মিলসহ নানা শিল্পকারখানা। ইসলামপুরের কাপড়ের বাজার থেকে তার সাফল্যগাথা বিস্তৃতি পেয়েছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে, ৬ মহাদেশে। বিশ্বের দরবারে তার শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য দূতিয়ালি করছে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের। তিনি নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম। দেশের টেক্সটাইল খাতে তার অভিজ্ঞতা ও অবদান সর্বজনবিধিত। ব্যবসা ও শিল্প যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই ধরা দিয়েছে সাফল্য। চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগরের সন্তান তিনি। তিনি জানিয়েছেন তার জীবনের সফলতার গল্প।

১৯৫০ সাল। মধ্যবিত্ত পরিবারে সওদাগর মোহাম্মদ ইসমাইল ও গৃহিণী আঞ্জুমান আরার ঘর আলোকিত করে তার জন্ম। দুই কন্যার পর পুত্রসন্তান হিসেবে তার শৈশব ছিল আদরের। ইসলামের জন্মের পর তাদের পরিবারে আসে আরও তিন কন্যা। পাঁচ কন্যা একপুত্রকে নিয়ে সুখের সংসার। মোহাম্মদ ইসমাইল সওদাগরি করতেন রেঙ্গুনে। সুতো আর আয়নার জমজমাট দোকান। তিন পুরুষ ধরে সওদাগর নূরুল ইসলামের দাদা আনোয়ার আলীরও ছিল রেঙ্গুনে পাখির পালক ব্যবসা। সুখের সংসারে হঠাৎ করেই নেমে আসে দুর্যোগ। হাইপ্রেসারের রোগী মোহাম্মদ ইসমাইল ব্রেন স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করেন রেঙ্গুনে। ছয় শিশুসন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন আঞ্জুমান আরা। পরিবারের একমাত্র পুত্রসন্তান নূরুল ইসলামের বয়স তখন মাত্র ৫ বছর। পারিবারিক কিছু জমির ফসল ছাড়া আয়ের কোন উৎস ছিল না। একপর্যায়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়ে তাদের পরিবার।
আঞ্জুমান আরা শত কষ্টের ভেতর দিয়ে মানুষ করতে লাগলেন সন্তানদের। স্কুলে ভর্তি করালেন নূরুল ইসলামকে। একমাত্র পুত্রসন্তান হিসেবে যতটা আদরে কেটেছিল তার প্রথম পাঁচ বছর তার চেয়ে বহু গুণ কষ্টে কেটেছে তার স্কুলজীবন। ১৯৬৮ সালে আধুনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করেন তিনি।

অভাব-অনটনের সংসার। ঘরে বিয়ের উপযুক্ত তিন-চারটি বোন। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েই তাই ভাগ্যান্বষণে চলে আসেন ঢাকায়। টেক্সটাইল মিলে একটি চাকরিও জুটে যায়। চাকরিতে যোগ দিলেও জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন তার হৃদয়ে তপড়ায়। সওদাগরির রক্ত শিরায় ঢেউ তুলে। কিছুদিন পর পাল্টান কর্মক্ষেত্র। আবারও টেক্সটাইল মিলে চাকরি। চাকরির পর অন্যরা জমিয়ে তুলেন আড্ডা। কেউ কেউ ঘুরতে বেরোন। অবসর সময়ে নূরুল ইসলাম ভাবতে থাকেন কিভাবে জীবনের মোড় ঘোরানো যায়। পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠার সিঁড়ি। পরিচিতদের কাছে জানতে চান ছোটখাটো ব্যবসার খোঁজখবর। দেশে তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ। অনিশ্চিত একসময়। সে অনিশ্চিত সময়েই একদিন চাকরি ছেড়ে দিয়ে পকেটে সামান্য ক’টা টাকা নিয়ে ইসলামপুরের কাপড়ের বাজারে আসেন তিনি। টঙ্গী ও তেজগাঁও বিসিকের বিভিন্ন মিল থেকে পাইকারি দরে কাপড় কিনে সেগুলো বিক্রি করতে শুরু করলেন ইসলামপুর ও নারায়ণগঞ্জের খোলাবাজারে। এরই মধ্যে ১৯৭০ সালে শুরু করেন দাম্পত্য জীবন। বিয়ের পর মনোযোগ আরও বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়। স্বামীর বড় হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণাদায়িনীর ভূমিকা নেন তার স্ত্রী। দিন দিন জমে ওঠে ব্যবসা। মিলমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি করেন আস্থা ও বিশ্বাস। একপর্যায়ে বাইরে থেকে সুতো কিনে কিছু মিলে কাপড় তৈরি শুরু করলেন। বেড়ে গেল তার কর্মক্ষেত্রে ও পরিশ্রম। এক মিলে কাপড় তৈরি এক মিলে ডায়িং, আরেক মিলে ফিনিশিং। তারপর সে কাপড় ইসলামপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিক্রি। রাতে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেন সকালে নতুন উদ্যোমে ব্যবসার কাজে বেরিয়ে পড়েন। এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। ভাটা পড়ে ব্যবসায়। কিন্তু হতোদ্যম হননি তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সব কিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া। ফের নতুন উদ্যোমে শুরু করলেন কাপড়ের ব্যবসা। বাংলাদেশে তখন ওয়্যাপ নিটিং মেশিনে ক্যারোলিন শার্টের কাপড় তৈরি হতো। কয়েকটি মিলে সুতো দিয়ে তিনি ক্যারোলিন শার্টের কাপড় তৈরি শুরু করলেন। আবারও কাপড় তৈরি, ডায়িং-ফিনিশিংয়ের জন্য আলাদা আলাদা মিলে দৌড়ঝাঁপ। এত দিন মিল থেকে পাইকারি কিনতেন। এবার নিজেই পাইকারি বিক্রি শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যে কয়েকটি মিলের সোল এজেন্টশিপও যোগাড় করলেন। ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠল পসার। এবার নামলেন আমদানি ব্যবসায়। বিদেশ থেকে ডাইস কেমিক্যাল, নাইলন ও পলিস্টার সুতো আমদানি করে তা পাইকারি বিক্রি। এভাবেই কেটে গেল আরও এক দশক।

১৯৮০ সাল। টঙ্গী বিসিকে একটি ওয়্যাপ নিটিং মেশিনের টেন্ডার দিল অগ্রণী ব্যাংক। কাপড়ের ব্যবসা করতে গিয়ে তত দিনে কাপড়ের মিলের ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন নূরুল ইসলাম। সাহস করে মেশিনটি কিনে নিলেন তিনি। সে ওয়্যাপ নিটিং মেশিনটি দিয়েই স্থাপন করলেন জাল, নেট ও জার্সি ফেব্রিকস উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান আরটেক্স। ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি। নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে দেশের একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু আরটেক্স মিলটি স্থাপনের পর যে আনন্দ পেয়েছিলাম তার কোন তুলনা হয় না। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন ছিল সেটি। সেরা সুখস্মৃতিও সেটিই।’

আরটেক্সেই থেমে যায়নি নূরুল ইসলামের স্বপ্নযাত্রা। একদিকে ব্যবসা, অন্যদিকে মিলে কাপড় উৎপাদন। সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আস্থা-বিশ্বাস গড়ে তুললেন শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ঠিক দুই বছর পর ১৯৮৩ সালে স্থাপন করলেন মরিয়ম নামে নতুন মিল। বিদেশ থেকে আমদানি করলেন একের পর এক ওয়্যাপ নিটিং মেশিন। কাপড় উৎপাদনে আনলেন বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা। বিস্তৃতি পেতে লাগল ব্যবসা, যোগ হতে লাগল সাফল্যের পালক। বর্তমানে নোমান গ্রুপের রয়েছে ৩০৮টি ওয়্যাপ নিটিং মেশিন। চার বছর পর ১৯৮৭ সালে স্থাপন করেন ডায়িং ফিনিশিং মিল নোমান ফেব্রিকস। ১৯৯২ নরসিংদীর পাঁচদোনায় তালহা এবং ’৯৬ সালে টঙ্গিতে স্থাপন করেন ইসমাইল স্পিনিং মিল। সালটা ১৯৯৮। বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতের ইতিহাসে এক স্মরণীয় বছর। টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় নোমান গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ স্বনির্ভর হোম টেক্সটাইল জাবের অ্যান্ড জুবাইর ফেব্রিকস লিমিটেড। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহের ভালুকা, গাজীপুরের টঙ্গী, শ্রীপুর, নরসিংদীর বাবুরহাট, পাঁচদোনায় নোমান টেরি টাওয়েল মিলস, জাবের অ্যান্ড জুবাইর ফেব্রিকস লিমিটেড, নাইস ডেনিম মিলস, সাদ সান অ্যাপারেলস, ইসমাইল স্পিনিং, নোমান স্পিনিং, তালহা স্পিনিং, ইয়াসমিন স্পিনিং, জাবের স্পিনিং, জুবাইর স্পিনিং, সুফিয়া কটন, সাদ সান টেক্সটাইল, নোমান টেক্সটাইল, নোমান কম্পোজিট টেক্সটাইল, ইসমাইল টেক্সটাইল, মরিয়ম টেক্সটাইল, জারবা টেক্সটাইল, নোমান হোম টেক্সটাইল, তালহা ফেব্রিকস, আরটেক্স ফেব্রিকস, সুফিয়া ফেব্রিকস, নোমান ফ্যাশন ফেব্রিকস, ইসমাইল-আঞ্জুমান আরা ফেব্রিকস, তালহা টেক্সপো, নোমান উইভিং, নোমান ফ্যাশন, জাবের অ্যান্ড জুবাইর এক্সেসরিজ মিল স্থাপন করে নোমান গ্রুপ। বর্তমানে সহ বিভিন্ন এলাকায় নোমান গ্রুপের রয়েছে ৩২টি মিল। ২০০৮ সালে ৭টি স্থানীয় মিলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে এ গ্রুপ। রপ্তানি করেন বিশ্বের ৬ মহাদেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ব্রাজিল, পশ্চিম আফ্রিকা, ভারতসহ বিশ্বের ৬০টি দেশে বিস্তৃত তার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। সেসব দেশে বিশ্বের টপ ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ করে নোমান গ্রুপ। নোমান গ্রুপের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে- নাইকি, ডিজনি, আমেরিকান ঈগল, বেস্ট সেলার, ওয়ালমার্ট, আলডি মার্ট, কে মার্ট, স্টেইন মার্ট, লেভিস, কিয়াবি, টার্গেট, লি অ্যান্ড ফুং, টম টেইলর, টিকে মাক্স, দানিস, ওটো গ্রুপ, ক্যানন, ট্রেন্ড সেটার, এইচ অ্যান্ড এম, রিকা লিউস, জিআইপি, জেসিপি, টেসকো, কস্টকো, পুল অ্যান্ড বিয়ার, বিএইচএস, বিআইজিডব্লিউ, সিয়া ডট হেরিং, সেলিও স্টার, এর-করটে, জেওয়াইএসকে, লিনডেক্স, এলআইডিএল, লা, রিডআউট, নিটোরি, এমঅ্যান্ডএস, স্পিরিট, নেক্সট, জি স্টার র, কোহলস, ইটো ইয়ুকাডো, হেরিটেজ অ্যান্ড টেক্সটাইল, কাপাল, ই ল্যান্ড কালেকটিভ, এভারক্রোমবি অ্যান্ড ফিচ, পিভিএইচ, কেস্ট জে, কেয়ার ডট ফোর, এলপিপি, ওটিন, এডকন, আসডা, আউচান, বেরসকা, মাটালান, সোলস, হেমা, আরমার থেরি, টয়োসিমা, সিঅ্যান্ডএ, ইউনি কিউএলও, রোস্টা, ম্যাঙ্গো, জারা’র মতো বিখ্যাত সব বায়ার। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত তারা সন্ধান করে বিশ্বে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টের নতুন বাজার। নিয়মিত অংশ নেন জার্মানি, রাশিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ দেশ-বিদেশে আন্তর্জাতিক সব বিখ্যাত মেলায়।

টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি মানেই আলো ও অন্ধকারের যৌথবসতি। যে খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পরিপুষ্ট করছে প্রতিনিয়ত সেই খাতেই বর্তমান শ্রমিক বঞ্চনা। অনিবার্য শ্রমিক অসন্তোষ। কিন্তু আশ্চর্য ব্যতিক্রম নোমান গ্রুপ। শ্রমিকবান্ধব হিসেবে পরিচিত নোমান গ্রুপে কর্মরত আছেন ৫০ হাজার শ্রমিক। বাংলাদেশে তৃতীয় বৃহত্তম চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান। নূরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের আন্তরিক শ্রমের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য। তাই সরকারি ও আন্তর্জাতিক শ্রমিক অর্গানাইজেশনের সব নিয়ম মেনে যথাসময়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে নোমান গ্রুপ। নোমান গ্রুপের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায়। এটিএম কার্ডের মাধ্যমেই তারা বেতন-বোনাস উত্তোলন করেন। রাজনৈতিক ঢামাঢোল নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি স্বপ্ন দেখেন একটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। স্বপ্ন দেখান স্বপ্নবান তরুণ উদ্যোক্তাদের।

দেশের কিংবদন্তি শিল্পপতি তিনি। কিন্তু এক মুহূর্ত অলস সময় কাটানোর ফুরসত নেই। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮-২০ ঘণ্টাই ব্যবসায়িক ব্যস্ততায়। প্রতিদিন রুটিন করে মতিঝিল ও গুলশানের কার্যালয়ে অফিস করেন তিনি। প্রতিদিনই রয়েছে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মিটিং, ব্যবসায়িক সেমিনার, বৈঠক ও নানা অনুষ্ঠান। তবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময়মতো আদায় করেন নামাজ। সময় হলে কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে দাঁড়িয়ে যান নামাজে। আইকনিক শিল্পপতি হলেও নূরুল ইসলামের বন্ধুত্বের জগৎ বড্ড ছোট। জীবনে একজনকেই দিয়েছেন পরম বন্ধুর স্থান। তার নাম সাহাবউদ্দিন। তিনি ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যান। নূরুল ইসলাম বলেন, রাতের ঘুম বাদ দিলে প্রতিটি মুহূর্ত কাটে ব্যস্ততায়। আমার একটি মাত্র নেশা তার নাম কাজ। বন্ধুর সংখ্যাও মাত্র এক।

পারিবারিকভাবে তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। চার ছেলে এক মেয়ের মধ্যে মেয়েটিই বড়। বর্তমানে সবাই নোমান গ্রুপের পরিচালক হিসেবে দেখাশোনা করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বড় ছেলে এসএম রফিকুল ইসলাম নোমান ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ পাস করার পর মার্কেটিং এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং উচ্চশিক্ষা নেন। পরে টেক্সটাইল খাতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। যোগ দেন পিতার ব্যবসায়। তার নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ গ্রুপ। তিনি গ্রুপের কৌশলগত পরিকল্পনা, করপোরেট রিলেশন ও বায়ারদের সমন্বয় করেন। একমাত্র মেয়ে নূর-ই ইয়াসমিন ফাতিমা বিজনেস স্কুল থেকে, মেজো ছেলে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জাবের এআইইউবি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। সেজো ছেলে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জাবের এমবিএ ও ছোট ছেলে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তালহা বিজনেস স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে দিনের পর দিন আরও উচ্চ অবস্থানে নিচ্ছেন নোমান গ্রুপকে। ২০০৬ সাল থেকে কমার্শিয়ালি ইম্পোর্টেন্ট পারসন (সিআইপি)’র মর্যাদা পেয়ে আসছেন নূরুল ইসলাম। তার স্ত্রী ও সন্তানরা প্রত্যেকেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ২০১১ সাল থেকে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান পাচ্ছেন সিআইপি মর্যাদা। টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি সাফল্যের কারণে ন্যাশনাল এক্সপোর্ট ট্রফি ২০০৬, এক্সপোর্ট ট্রফি ২০০৯-১০, ন্যাশনাল এক্সপোর্ট ট্রফি ২০১০-১১, টেক্সবাংলা ট্রফি ২০১২, এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১২, সোশ্যাল এনভাইরনমেন্টাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১২ ও এনভাইরনমেন্টাল অ্যাওয়ার্ড ২০১৩ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া তিনি অর্ধশতাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী পুরস্কার ও সনদ অর্জন করেন। নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার আজকের এ অবস্থানের জন্য সততা, কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবারের অনুপ্রেরণা ও সমর্থন ছিল সর্বাত্মক। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছিল আল্লাহর মেহেরবানি।’

সমাজসেবক হিসেবেও খ্যাতনামা এ শিল্পপতি। সমাজসেবার উদ্দেশে পিতা-মাতার নামে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসমাইল-আঞ্জুমান আরা ওয়ালফেয়ার ট্রাস্ট। শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এ তিনটি খাতে কাজ করে এ ট্রাস্ট। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে আধুনগর বাজারে আশির দশকে প্রতিষ্ঠা করেছেন আধুনগর ইসলামিয়া মাদরাসা। মাদরাসা বোর্ডে সর্বাধিক পাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় কয়েকবার স্থান পেয়েছে মাদরাসাটি। লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেছেন মা আয়েশা মাদরাসা। আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অন্যতম দাতা ও সদস্য নূরুল ইসলাম। এ ছাড়া লোহাগাড়া উপজেলার কয়েক ডজন স্কুল-মাদরাসায় ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি। কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় চিকিৎসা খাতেও অবদান রেখেছে এ ট্রাস্ট। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের অন্যতম দাতা নূরুল ইসলামের জমিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনগর ইউনিয়ন দাতব্য চিকিৎসালয়টি। এলাকার গরিব রোগীদের জন্য আধুনগর থেকে চট্টগ্রাম মহানগর পর্যন্ত চালু করেছেন ইসমাইল-আঞ্জুমান আরা ওয়েলফেয়ার ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। নূরুল ইসলাম বলেন, লোহাগাড়ার প্রসূতি মা ও শিশুদের জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং পর্যায়ক্রমে সেটাকে জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। ইতিমধ্যে হাসপাতালের জন্য কিছু জমিও কেনা হয়েছে। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি হচ্ছে লোহাগাড়ায় যতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী অবকাঠামো স্বল্পতা এবং জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে প্রত্যেকটিতেই একটি করে উন্নত ভবন নির্মাণ করব। কিন্তু নূরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় সামাজিক উদ্যোগটি তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে দানবীরে। গুচ্ছগ্রামের আদলে দেড় শতাধিক গৃহহীনকে তিনি নির্মাণ করে দিয়েছেন স্থায়ী বসতবাড়ি। নিজের কেনা জমির মালিকানাসহ গৃহহীনদের তিন কক্ষের পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন ১৬৭টি। স্থাপন করে দিয়েছেন টিউবওয়েলসহ নানা সুবিধা। কয়েক বছর আগেও যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। এখন তারা জমিসহ পেয়েছেন একটি ছোট্ট পাকা বাড়ি। নিজের গ্রামের লোকজনকে স্বাবলম্বী করতে দিয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার পুঁজি। লোহাগাড়া বাসস্টেশন ও আধুনগর বাজারে নির্মাণ করে দিয়েছেন দুটি বৃহৎ আকারের মসজিদ। গাজীপুরের শ্রীপুরের কেওয়া পশ্চিমখণ্ড ও বেড়াইদের চালায় নোমান গ্রুপের দুটি শিল্পকারখানার পানি দিয়ে চাষাবাদ হয় ৫ শতাধিক বিঘা জমি। বোরো মওসুমে নোমান ডায়িং মিল ও ইয়াসমিন স্পিনিং মিলের জেনারেটরের ব্যবহৃত পানি দিয়ে বিনা খরচে স্থানীয় কৃষকরা চাষাবাদ করেন। তার এমন নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের চিহ্ন রয়েছে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের নানা জায়গায়।

তথ্যসুত্র: মানবজমিন

Check for details
SHARE