নতুন আয়োজনে!

নতুন বছর। নতুন ক্লাস। নতুন জুতা। কালো রঙের শুয়ের ওপর বেল্ট দেওয়া। আমাদের প্রজন্মের কমবেশি সবাই বাটার এই জুতা পরেই স্কুলজীবন পার করে দিয়েছি। আরামদায়ক আর টেকসই। বাটার জুতা সম্পর্কে বলতে গেলে এই দুটো শব্দই মনে আসে। তবে এই চিত্রের সঙ্গে স্টাইলটাও বেশ মজবুতভাবে জুতার সঙ্গে আটকে দেওয়া হচ্ছে। ফ্যাশনের শহর হিসেবে বিখ্যাত ইতালির মিলানে বাটা ফ্যাশন উইকেন্ড ২০১৮-তে সেই ধারণাই পাওয়া গেল। ফ্যাশন শোর পাশাপাশি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে দর্শক ও ক্রেতাদের চমকের পর চমক দিয়েছে বাটা।

মি অ্যান্ড কমফোর্টেবল উইথ ইট শুধু একটি থিম হিসেবেই নয়। জীবনধারণের মানও যেন নির্ধারণ করে দিয়েছে। দুনিয়া নয়, বরং তুমি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করো, ঠিক সেভাবেই থাকো এবং সেভাবেই নিজেকে ও নিজের জীবনকে সাজিয়ে তোলো। বিশ্বব্যাপী প্রচারণায় গত বছর থেকেই বাটা বেছে নেয় বিষয়টিকে। মোটা, শুকনা, বেঁটে, লম্বা, পেটানো খেলোয়াড় শরীর—আপনার শারীরিক গড়ন যে ধরনেরই হোক না কেন, সেটাই সেরা। আশপাশের মানুষ কী চাচ্ছে, সেই বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার কোনো প্রয়োজনই নেই। বরং আপনি যেভাবে থাকতে আরামবোধ করেন, সেই স্টাইলটিই বেছে নিন। এ বছর এ বিষয়টির পাশাপাশি দ্য সাউন্ড অব স্টাইল শিরোনামে ফ্যাশন উইকেন্ডের আয়োজন সাজানো হয়। মানুষের পদধ্বনি একটি সুরের সৃষ্টি করে। বাটা সেই পদধ্বনির সুরকে সংগীতে রূপান্তর করতে চায়। সেই সঙ্গে রাখতে চায় আরাম ও ক্রয়ক্ষমতা। বিভিন্ন মানুষের পায়ের হাঁটার ছন্দে তৈরি হয়ে যায় সুর। জুতাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল সুরের সঙ্গে নকশার মিশেলেই যেন বানানো হয়েছে নতুন জুতাগুলো।

বাটা ফ্যাশন উইকেন্ডে তুলে ধরা হয় বাটার নতুন জুতার সংগ্রহ। রেড লেবেল, বাটা হেরিটেজ হট শটস ও বি-ফ্লেকসের সংগ্রহ মুগ্ধ করে ক্রেতাদের। বাটার দোকান আছে, এমন সব দেশেই এ জুতাগুলো পাওয়া যাবে। তবে বি-ফ্লেকসের জুতাগুলো আগস্ট মাস থেকে বিশ্ববাজারে পাওয়া যাবে। ছেলে ও মেয়েদের জুতায় লোফার ও স্নিকারস বেশ প্রাধান্য পাবে। হিলের মধ্যে ব্লক হিল এগিয়ে থাকবে। তবে হাই হিল ও কিটেন হিলও ক্রেতাদের পায়ে আরাম দেবে। কালো রং, ন্যুড রং, মেরুন, লাল রঙের সুরে জুড়ে দেওয়া হবে সিল্কের ফিতা, পাথর, ফ্রিঞ্জের ব্যবহার, ফুলের নকশার ছাপা প্রিন্ট। স্কুলের জুতাগুলোতে দেওয়া হচ্ছে স্পোর্টি লুক। চামড়া, পিউ, মাইক্রোফাইবার, ক্যানভাস, নিটেড উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বাটার জুতাগুলো।

সামাজিক মাধ্যম ফ্যাশনের ট্রেন্ড তৈরির ক্ষেত্রে বেশ বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও বাংলাদেশের ক্রেতাদের একটি বড় অংশ ২৫ বছরের আশপাশে। ইন্টারনেট, দেশ-বিদেশে ঘোরার মাধ্যমে চলতি ধারা সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞানই রাখেন তাঁরা। নতুনভাবে বাটার জুতাগুলোকে সাজানোর পেছনে এই কারণটিও অনেকটা মুখ্য ছিল। বাটা ফ্যাশন উইকেন্ডে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইনফ্লুয়েসাররা (সামাজিক মাধ্যমে যাঁদের অনেক ফলোয়ার) ক্রেতাদের কাছে নতুন নকশাগুলো তুলে ধরেন সামাজিক মাধ্যমের মধ্য দিয়েই।

মজার মজার ছবি দিয়ে তাঁদের কয়েক হাজার অনুসরণকারীদের জানিয়ে দিচ্ছিলেন যে জুতার সংগ্রহে বাটা নিয়ে আসছে নতুন নতুন চমক। কেনিয়ার ইনফ্লুয়েনসার হিসেবে এসেছিলেন সিলভিয়া। সে দেশের পত্রিকায় লেখেন তিনি। মি অ্যান্ড কমফোর্টেবল থিমের বিষয়টি বেশ মজা করেই তুলে ধরলেন তিনি। জানালেন, স্টাইলের জন্য যে পোশাক বা জুতা বেছে নেন, তা যে সব সময় আরামদায়ক হয়, তা নয়। তবে সেই পোশাক অথবা জুতার কারণে যদি তাঁকে সুন্দর লাগে, তবে তিনি সেটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।

বাটার জন্য বাংলাদেশ বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ এশিয়া বাটার প্রেসিডেন্ট রাজীব গোপালাকৃষান জানালেন এমনটাই। বিশ্বে ৫০টি বাটা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশের বাটার অবস্থান তৃতীয়। এর বিনিয়োগের পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। তবে অনেকের মতো আমারও প্রশ্ন ছিল, পাশ্চাত্যের সব নকশা বাংলাদেশে কেন পাওয়া যায় না। উত্তরটাও পেয়ে গেলাম। বিদেশ থেকে তৈরি হওয়া জুতা বাংলাদেশে আনতে গেলে শতকরা ১০০ ভাগ কর দিতে হয়। সে কারণে আমদানি করা জুতার দাম বেড়ে যায়।

ক্রেতার সামর্থ্যের ভেতর রাখার জন্য বাটা তৈরিকৃত জুতা আমদানি না করে জুতার বিভিন্ন বাইরের অংশ বাংলাদেশে নিয়ে আসে। সাভার ও ধামরাইয়ে বাটার ফ্যাক্টরিতে সেই অংশগুলোকেই জোড়া লাগিয়ে জুতাগুলো তৈরি করা হয়। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ২৮ মিলিয়ন জোড়া জুতা বিক্রি করে বাটা। বাংলাদেশে বর্তমানে বাটার নিজস্ব দোকান আছে ২৩৪টি ও ১০০টি ফ্র্যাঞ্চাইজ। ঢাকার ৮৬টি দোকানের মধ্যে বসুন্ধরা সিটিতে অবস্থিত শাখা থেকে সবচেয়ে বেশি আয় হয়। বাৎসরিক ৫ মিলিয়ন ডলার আয় করা হয় এই শাখা থেকে। যেখানে গোটা এশিয়ায় বাৎসরিক আয়ের পরিমাণ ৩ মিলিয়ন ডলার।

অ্যালেক্সিস নাজারড গ্লোবাল বাটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরে আরামদায়ক ও স্বল্পদামি জুতার পাশাপাশি ফ্যাশনেবল, চলতি ধারা ও স্টাইলিস্ট জুতা তৈরির প্রতি জোর দেন। এই জুতাগুলোকে বিশ্ববাসীর সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেন বাটার প্রধান বিপণন কর্মকর্তা থমাস আরচার বাটা। ১২৩ বছর পর কেন এই উদ্যোগ, জিজ্ঞেস করাতে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘কারণ, আমি তখন ছিলাম না।’ বাটা ফ্যাশন উইকেন্ড শেষ হয় ভিন্ন ধারার ফ্যাশন শো দিয়ে। নতুন নকশা তৈরির জন্য দরকার নতুন চিন্তা। এ ভাবনা থেকেই শুরু করা হয় ইয়াং ডিজাইনার চ্যালেঞ্জ। এ বছরের বিজয়ী অ্যানড্রেয়া সেলেস্ত ব্যাজিয়ো ও টেরেজা ক্যানিজোভা।

এরিকা শিরোনামে তৈরি জুতার নকশা সম্পর্কে অ্যানড্রেয়া বলেন, ‘এরিকা একজন অ্যাফ্রো-আমেরিকান নারী, যে ক্যানসারকে হারিয়ে এখনো লড়ে যাচ্ছেন সময়ের সঙ্গে। যেকোনো নারী সুন্দর, সেটা তিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন। আমার নকশার মাধ্যমে আমি সেই জিনিসটিই বোঝাতে চেয়েছি।’ ফ্যাশন উইকেন্ডের দ্বিতীয় দিন ফ্যাশন ও ডিজাইনের কেন্দ্রস্থলেই পরিণত হয়েছিল মিলানের পালাজ্জো ম্যাজনেট। সারা দিন ধরে নানা রকম আয়োজনে জমজমাট ছিল স্থানটি। সাদা স্নিকারসের ওপর ইচ্ছেমতো রংতুলি করছিলেন ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা। অনেকের মতো সোফিয়াও রং করছিলেন সাদা জুতার ওপর। ছবির মাধ্যমে যে নিজেকে প্রকাশ করা যায়, জানালেন সোফিয়া। বাটার জুতা পছন্দ করেন নকশা ও টেকসই হওয়ার কারণে। নিজের এই রং করা জুতা পরে ১৫ ইউরোর মাধ্যমে কেনার সুযোগও ছিল।

তথ্যসূত্র: প্রথমআলো ডটকম।

Check for details
SHARE