ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় আসে সফলতা!

সাধারণত ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ছুটি পেলেই ঘুরতে যায়। হতে পারে সেটা ঢাকার বাইরে অথবা সেটা না হলে অন্তত ঢাকার কাছাকাছি বিভিন্ন এমিউসমেন্ট পার্ক অথবা পিকনিক স্পট। কিন্তু গরু পাগলদের জন্য বিষয়টা অন্যরকম। গরু পাগলদের জন্য ঘোরাঘুরি মানে সুযোগ পেলেই গরু দেখতে চলে যাওয়া।এভাবেই সেদিন হঠাৎ করে চলে গেলাম ঢাকার পাশের একটি ফার্ম দেখতে।গরু দেখার মাঝে কি মজা সেটা আসলে গরু পাগল না হলে বোঝা সম্ভব নয়।

সংক্ষিপ্ত খামার পরিচিতি : খামারটিতে এখন মোট গরুর সংখ্যা = ২৩ টি, দুধ দেয়া গাভীর সংখ্যা = ০৮ টি, বাছুরের সংখ্যা = ০৮ টি, প্রেগন্যান্ট বকনাসহ ড্ৰাই পিরিয়ডের গভীর সংখ্যা = ০৬ টি, ষাড় সংখ্যা = ০১ টি। আসলে আমি ফার্ম দেখতে যাই মূলত শেখার জন্য। খামারটি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে, খামার নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কি, খামারের রেশন , অন্য খামারের চেয়ে ব্যতিক্রমতা ইত্যাদি নানান খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করি।আমি এখানে তার কিছু অংশ শেয়ার করার চেষ্টা করছি।হয়তো আপনাদের উপকারে আসতে পারে।

গরুর শেড :
দুই সারি টেল টু টেল সিস্টেমে করা শেড টি যথেষ্ট উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে যাতে করে আলো বাতাসের কোন ঘাটতি না থাকে। দুই সারির মাঝখানে মানুষ চলাচলের জন্য জায়গা এবং গরুর মলমূত্র ও গোসলের পানি প্রবাহের জন্য ড্রেন রাখা হয়েছে যেটার সংযোগ চলে গিয়েছে বায়োগ্যাস প্লান্টে। গরুর খাবার পাত্র হিসেবে ডাইনিং টেবিল বানিয়ে এখানে খরচ বাড়ানো হয় নি। জাস্ট পায়ের সামনে দেড় ফিট উঁচু দেয়াল করে মেঝের লেবেলেই খাবার দেয়া হয়। প্লাস্টিকের ড্রামে পানি ও দানাদার খাবার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ছেড়ে দেয়ার জন্য শেডের সামনে উন্মুক্ত জায়গা রাখা হয়েছে।

পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস :
“নো ঘাস নো গরু” এই থিমকে সামনে রেখে খামারটিতে পর্যাপ্ত ঘাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন কি প্রথম যারা ফসলের জমিতে ঘাস লাগানো দেখে হাসাহাসি করেছে তারাও এখন ঘাস লাগানো শুরু করেছে। ঘাসের পাশাপাশি লাগানো হয়েছে ভুট্টা, করা হয়েছে সাইলেজ।যারা ডেইরি ফার্ম করতে চান তাদের অবশ্যই গরু কেনার আগেই ঘাস লাগানো উচিত। কাঁচা ঘাসের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস দানাদারের উপর চাপ কমিয়ে খামারের খরচ কমাতে সাহায্য করবে।

সেদিন এক বড় ভাই বলছিলেন শুধু মাত্র ঘাস চাষ করে তিনি তার খামারে দৈনিক দানাদারের ব্যবহার ৭৫ কেজি থেকে নামিয়ে ৫০ কেজিতে নিয়ে এসেছেন। এছাড়া কাঁচা ঘাসের অভাবে গাভী বা বকনা ঠিক সময়ে হিটে না আসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের হরমোনাল সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। যে সমস্যা গুলো পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস থাকলে খামারিরা খুব সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারে। আর কথায় আছে না “গাভীর মুখে দিলে ঘাস দুধ পাবেন বারো মাস”

দানাদার খাবার নিজে বানানো :
আমাদের ডেইরী গুরু বলেন “গরুকে সবসময় বাজারের সবচেয়ে উন্নতমানের এবং চাহিদা অনুযায়ী খাবার দিতে হবে। দুধের দাম কম তাই এখন গরুকে কম খাবার দেই, একটু নিম্নমানের খাবার দেই এই চিন্তা করলে সাময়িকভাবে আপনার খরচ হয়তো কিছুটা কমবে কিন্তু এতে করে আপনি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।”

আমার দেখা এই খমারটিতেও খাদ্যমাল কিনে সাথে ভিটামিন, মিনারেলস যোগ করে গাভী ও বাছুরের জন্যও আলাদা আলাদা রেশন প্রস্তুত করা হয়। ইদানিং দেখা যায় বিভিন্ন ফিড কোম্পানির চটকদার বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস করে খামারিরা নিজেদের খামারে এইসব ফিড ব্যবহার করেন। এতে করে সাময়িক দুধ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে জটিলতাসহ নানান ধরনের সমস্যার কথা আমরা শুনতে পাই। তাই আমার মনে হয় যাদের খামার নিয়ে বড় পরিকল্পনা রয়েছে তাদের খাবারের মান নিয়ন্ত্রণে নিজেরাই খাবার তৈরি করে নেয়ার দিকে মনযোগ দেয়া উচিৎ।

নিয়মিত ভ্যাক্সিনেশন :
আধুনিক খামার ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্যঃ অংশ হল নিয়মিত ভ্যাক্সিনেশন।নিয়মিত ভ্যাক্সিনেশনের কারণে আপনি আপনার গবাদিপশুকে বিভিন্ন জটিল রোগ থেকে অনেকাংশেই বাঁচাতে পারেন।এ ব্যাপারে খামারি এতোটাই সচেতন যে নিজে বিদেশ থেকে উন্নতমানের ভ্যাক্সিন নিয়ে এসেছেন। আমরা অনেক সময় খামারের গরুকে ভ্যাক্সিন দেয়ার পরও রোগে আক্রান্ত হয়। এটার অন্যতম একটা কারণ হল প্রপার কুলিং চেইন মেনটেইন না করা। দেখা গেল রোগ থেকে বাঁচার জন্য টাকা খরচ করে ভ্যাক্সিন দিলাম ঠিকই কিন্তু এটার প্রপার কুলিং চেইন মেনটেইন করা হয়েছে কিনা তা কখনই জানা হয় না।নিজে আনা এই বিদেশি ভ্যাক্সিন দিলেই যে খামারে কোন রোগ হবে না তা নয় তবে এটা খামারির মেন্টাল স্যাটিসফেকশনের বিষয়।

জাতোন্নয়ন :
জাতোন্নয়নের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভাল ভাল জেনোমিক রেকর্ড সম্পন্ন বুলের সিমেন ও রেকর্ড কিপিং।প্রয়োজনের সময় সঠিক বুলের সিমেন প্রাপ্তি নিশ্চিত করণে খামারি নিজেই নাইট্রোজেন জার কিনে নিয়েছেন সেখানেই ভাল বুলের সিমেন সংরক্ষণ করেন। তারা এলাকার এ আই দের সাথে ভাল সম্পর্ক রেখে চলেছেন যাতে প্রয়োজনের সময় ডাকলে পাওয়া যায়।এছাড়া নিজেও এ আই কার্যক্রম শিখে নিয়েছেন। রেকর্ড কিপিংয়ে আরো যত্নশীল হওয়া দরকার বলে আমার মনে হয়েছে যদিও তারা খামারের সব বাছুরের মা ,নানীর রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করছেন।

নিজের কাজ নিজে করা :
এই খামারটির সবচেয়ে পজিটিভ বিষয় মনে হয়েছে এটি একেবারে শ্রমিক নির্ভর খামার নয়। অনার্স পড়ুয়া একজন ছাত্র নিজের পড়াশুনার পাশাপাশি খামারের সমস্ত কাজ নিজ হাতে করছে। মাঠ থেকে ঘাস কেটে আনা থেকে শুরু করে, দুধ দোহানো ,সাইলেজ করা, দানাদার খাবার তৈরী করা , গরুকে খাওয়ানো সব। সাথে সার্বিক সহায়তায় আছেন আংকেল।

এখানে কিছু কথা বলা জরুরি। অনেক প্রবাসী ভাই বিদেশ থেকেই খামারে বিনিয়োগ করতে চান, আবার অনেকে ঢাকায় চাকরি করে গ্রামে খামার করতে চান।আমার পার্সোনাল মতামত হল নিজে থেকে করতে পারলে সবচেয়ে ভাল। তা না হলে নিজের বাবা, ভাই অথবা ছেলে যদি দেখাশোনা করতে পারে তাহলে বিনিয়োগ করুন নচেৎ নয়।আর যে খামার দেখাশোনা করবে তার এর প্রতি আগ্রহ থাকতে হবে , গরুর প্রতি অবশ্যই ভালবাসা থাকতে হবে।তা না হলে খামার করার চিন্তা আপাতত বাদ দিন। আর শ্রমিক দিয়ে খামার চালাতে গেলে আম ছালা দুটোই যাবে।

সবকিছুর হিসাব রাখা :
খামার সংক্রান্ত সকল আয়ব্যয় এর হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। যেটা অনেকেই করে না। আমার কাছে মনে হয় এটা খুবই গুরত্বপূর্ন একটা বিষয়। আয়ব্যয় এর সঠিক হিসাব না থাকলে কোনভাবেই আসলে সঠিক পরিকল্পনা সম্ভব নয়। কিভাবে খামারের ব্যায় কমানো যায়, কিভাবে আয় বাড়াতে হবে তা ঠিক করার জন্য গরুর নুন থেকে শুরু করে খামারে খরচকৃত প্রত্যেকটি টাকার হিসাব রাখা খুবই জরুরি।

বায়োগ্যাস প্লান্ট :
গরু থেকে প্রাপ্ত গোবর থেকে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস। যা নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আরো দুটি পরিবারে মাসিক রেন্টে রান্নার গ্যাস সরবরাহ করা হয়। আর বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে প্রাপ্ত বর্জ্য জৈব সার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ঘাসের জমি ও অন্যান্য ফসলী জমিতে।

গরু দেখতে দেখতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। বিস্তীর্ন সবুজ মাঠ, বৃষ্টির মাঝে ঘাস ও ভুট্টার জমি দেখা, মাথার উপর কালো মেঘ ও মেঘের গগনবিদারী আত্মচিৎকার সব মিলিয়ে সুন্দর একটা দিন কাটালাম। পরিশেষে উপহার হিসেবে গাভীর খাঁটি দুধ ও সুন্দর কিছু স্মৃতি নিয়ে বাসার রাস্তা মাপলাম। আশা করি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলা এই খামারটি সামনের দিনে একটি আদর্শ খামার হিসেবে গড়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE