ধানের তুষের ছাই থেকে সোডিয়াম সিলিকেট তৈরীর ব্যবসা!

ধান হতে চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় এক ধরনের বর্জ্য পদার্থ পাওয়া যায়, যা তুষ নামে সর্বজন পরিচিত। ধানের তুষ পোড়ানোর পর যে ছাই পাওয়া যায় তাতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ সিলিকা থাকে। এই তুষ থেকে কষ্টিক ডাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে সোডিয়াম সিলিকেট তৈরি করে বাজারজাত করা সম্ভব, যা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা।

বাৎসরিক উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১৫০০ মেট্রিক টন। প্রথম বছর উৎপাদন করা হবে ১১২৫ মেট্রিক টন, ২য় বছর উৎপাদন করা হবে ১২৭৫ মেট্রিক টন ও ৩য় বছর হতে ১৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পটি পশ্চিম মুক্তারপুর, মুন্সিগঞ্জ এ স্থাপন করা হবে। ব্যবসা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ১ জানুয়ারি, ২০১৩।

ব্যবসাটির প্রতি আগ্রহী হওয়ার কয়েকটি যৌক্তিক কারণঃ সোডিয়াম সিলিকেট প্রস্তুতির সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতিটি হচ্ছে অধিক তাপমাত্রায় (৮০০-৯৫০০ সে) বালি হতে সোডিয়াম সিলিকেট প্রস্তুতি। এই তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণের জন্য জ্বালানী হিসেবে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু নতুন প্রক্রিয়ায় তুষের ছাই থেকে খুব কম তাপমাত্রায় (১০০-১৫০০ সে) বাণিজ্যিকভাবে সোডিয়াম সিলিকেট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক স্বয়ংক্রিয় ধান হতে চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে,যারা তাদের নিজস্ব বয়লার চালানোর জন্য জ্বালানী হিসেবে ধানের তুষ ব্যবহার করছে এবং এ থেকে প্রচুর পরিমাণ ছাই পাওয়া যাচ্ছে। এ কারনে একই স্থান হতে এখন অধিক পরিমাণে বাণিজ্যিকভাবে তুষের ছাই পাওয়া সম্ভব।

সোডিয়াম সিলিকেট সাবান, সিরামিক, কাগজ, পেপার বোর্ড, পানি পরিশোধনাগার, ভবন নির্মাণ, গার্মেন্টস, পেট্রোলিয়াম এবং মেটাল তৈরিতে অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গুণগত মানের দিক দিয়ে বালি হতে তৈরি সোডিয়াম সিলিকেট থেকে ধানের তুষ হতে তৈরি সোডিয়াম সিলিকেট বেশি ভাল এবং অধিক উপযোগী। বালির তুলনায় ধানের তুষ হতে কম খরচে সোডিয়াম সিলিকেট তৈরি করা যায়।

ব্যবসায় মোট বিনিয়োগ প্রয়োজন ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে স্থায়ী সম্পদ ১ কোটি ৮৮ লক্ষ টাকা, চলতি সম্পদ ১ কোটি ৪১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। মোট বিনিয়োগের (৩ কোটি সত্তুর লক্ষ টাকা) ৫৫ ভাগ (২ কোটি ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা) উদ্যোক্তার নিজস্ব টাকা ও ৪৫ ভাগ (১ কোটি ৬৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা) ব্যাংক হতে ঋণ নেয়া হবে।

সোডিয়াম সিলিকেট সোপ ও ডিটারজেন্ট ফ্যাক্টরি, সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিস, কাগজ মিল, পেপার বোর্ড, পানি পরিশোধনাগার প্ল্যান্ট, ভবন নির্মাণ সামগ্রী, টেক্সটাইল মিলস, লেদার ফ্যাক্টরি, পেট্রোলিয়াম এবং মেটাল ইন্ডাস্ট্রিস প্রভৃতি শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে বাৎসরিক ভাবে সোডিয়াম সিলিকেটের বর্তমান বাজার চাহিদা হল আনুমানিক ২,০০০ মেট্রিক টন। তবে যে হারে শিল্প কারখানা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আগামি ১০ বছরে সোডিয়াম সিলিকেটের বাজারচাহিদা আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে সোডিয়াম সিলিকেটের বাৎসরিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৫০০ মেট্রিক টন যার বর্তমান বাজারমূল্য হল ৩.৬০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের বাই-প্রোডাক্ট এক্টিভেটেড কার্বন এর বাৎসরিক উৎপাদন ক্ষমতা ৭৫ মেট্রিক টন যার বর্তমান বাজারমূল্য হল ১৪.২৫ লক্ষ টাকা।

আমদানিকৃত পণ্য থেকে প্রস্তাবিত পণ্যের গুণগতমান অনেক ভাল। কম সময়ে কম খরচে ভাল মানের সোডিয়াম সিলিকেট বাজারজাত করা হবে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন, কাঙ্খিত গ্রাহকদের নিকট কোম্পানির প্রোসপেক্টাস এন্ড প্রোডাক্ট ব্রুসিউর ও পণ্যের নমুনা পাঠানো এবং পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিত করা, বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এ শিক্ষা সফর ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর এ বিজ্ঞাপনী উদ্যোগ গ্রহণ করা, কাঙ্খিত গ্রাহকদের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ প্রভৃতির মাধ্যমে পণ্য বাজারজাত করা হবে।

প্রথমে নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানের তুষের ছাই মেপে ডাইজেস্টরে নিয়ে কষ্টিক সোডা দিয়ে ডাইজেসন (অনবরত নাড়ান) করা হয়। ডাইজেশন প্রক্রিয়াটি ১০০-১৫০ ডিগ্রী সেল তাপমাত্রায় ১-২ ঘণ্টা চালানো হয়। এরপর তরল সোডিয়াম সিলিকেট ২-৩ মাইক্রন ছাকনি দ্বারা ছাকা হয়। এতে বিশুদ্ধ তরল সোডিয়াম সিলিকেট পাওয়া যায়। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সোডিয়াম সিলিকেটে পানির পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পানি বাষ্পীভূত করা হয়। এরপর এই বিশুদ্ধ সোডিয়াম সিলিকেট ২৫০ লিটার স্টিল এর ড্রামে ভরে বাজারজাত করা হয়। ছাকনি হতে প্রাপ্ত বর্জ্য পদার্থ এক্টিভেটেড কার্বন ড্রাইয়ার এর মাধ্যমে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।

সোডিয়াম সিলিকেট উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিগত ভাবে যেসব যন্ত্রাদি প্রয়োজন সেগুলো হল ডাইজেস্টর (ডাইজেশন এর জন্য), ফিল্টার প্রেস (ছাকনী প্রক্রিয়ার জন্য) এভাপোরেটর (বাস্পিভাবনের জন্য), বয়লার (উচ্চ তাপমাত্রার জন্য), কুলিং টাওয়ার (শীতলীকরণের জন্য), ডিজেল জেনারেটর (প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য) ও ইটিপি প্ল্যান্ট (তরল বর্জ্য পদার্থ পরিশোধনের জন্য) ।

এই ব্যবসা থেকে বছরে ১৫০০ মেট্রিক টন সোডিয়াম সিলিকেট ও ৭৫ মেট্রিক টন এক্টিভেটেড কার্বন উৎপাদন করা যাবে। এই প্রকল্পের প্রধান দুটি কাঁচামাল হচ্ছে ধানের তুষের ছাই (২.৬ টন প্রতি দিন) ও কস্টিক সোডা (৬৮০ কেজি প্রতি দিন)। ধানের তুষের ছাই পাওয়া যাবে শেরপুর ও কালিয়াকৈর চালের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হতে এবং কস্টিক সোডা পাওয়া যাবে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিস ও এএসএম কেমিক্যালস থেকে। এই শিল্পকারখানাগুলোর অবস্থান প্রকল্পের নিকটে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এবং উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২৩ জন জনবল প্রয়োজন। উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে আরও জনবলের প্রয়োজন হবে। প্রতি মেট্রিক টন সোডিয়াম সিলিকেট এর উৎপাদন ব্যয় ১৭,৩৩৭ টাকা। ব্রেক ইভেন পয়েন্ট ৩২২.৮৪ মেট্রিক টন ও এর মূল্য ৭৭.৪৮ লক্ষ টাকা।

দেশে বিপুল পরিমাণে সোডিয়াম সিলিকেট তৈরির কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর সোডিয়াম সিলিকেট আমদানি করার জন্য অনেক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে দেশের ৫৫-৬০ ভাগ সোডিয়াম সিলিকেটের চাহিদা পূরণ করা যাবে। এতে দেশের টাকা দেশেই থাকবে।

যেসব শিল্পকারখানাতে সোডিয়াম সিলিকেট কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তারাও দ্রুত ও কম খরচে কাঁচামাল পাবে এবং কম খরচে কাঁচামাল পাবার কারণে ঐসব কারখানার উৎপাদিত পণ্যের দামও কমবে। প্রতি বছর চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হতে অধিক পরিমানে ধানের তুষের ছাই বর্জ্য পদার্থ হিসেবে ফেলে দেয়া হয় ও অল্প কিছু পরিমাণ সিমেন্ট ও সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে যায়।

এত অধিক পরিমান ছাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এতে ক্ষতিকর কার্বন কেমিক্যাল রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এত বিশাল পরিমাণ ছাই পরিবেশে নির্গমনের সমস্যাও মিটে যাবে। সুতরাং এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি লাভজনক ব্যবসা হবে।

তথ্যসূত্র: এসএমই ফাউন্ডেশন।

Check for details
SHARE