টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্র ও উৎপাদিত পন্যের বিস্তারিত

টেক্সটাইল শিল্প কাঁরখানা বললে আমাদের চোখে ভেসে উঠে শত শত শ্রমিকে ঠাঁসাঠাসি কোন স্থান, ব্যস্ততা,পরিবেশ দুষন,ক্যামিকেলের গন্ধ ইত্যাদি।  বাইরে থেকে টেক্সটাইল কাঁরখানাকে বেশ অগোছালো একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানই মনে হয়।  আজ আমরা  ঢুকব টেক্সটাইল শিল্প কাঁরখানা অন্দরে।  জানব টেক্সটাইল শিল্পের পরিধী সম্পর্কে , এই অগোছালো সদা ব্যাস্ত থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠান কি কি কাজ করে থাকে সেই বিষয়ে।

টেক্সটাইল শিল্প কাঁরখানা সম্পর্কে জানার পূর্বে টেক্সটাইল সম্পর্কে ধারণা পরিস্কার করা দরকার ।  সাধারণ ভাবে টেক্সটাইল বলতে বোঝায় ওভেন বা নিটেড কাপড় কে ।  তবে ফাইবার,সুতা,ফেব্রিক ছাড়াও আরও অনেক বিষয় রয়েছে যা টেক্সটাইল শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত ।প্রাকৃতিক অথবা কৃত্তিম ফাইবার টেক্সটাইল শিল্পের প্রধান কাঁচামাল।

টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গাঃ টেক্সটাইল এমন একটি ইন্ডাস্ট্রি যেখানে গবেষণা,ডিজাইন তৈরি,উৎপাদন,বিতরন,ফেব্রিক এবং ক্লোদিং ইত্যাদি নানা রকমের শাখা বিরাজমান।

শপ্তদশ শতাব্দীতে টেক্সটাইল শিল্পের বিপ্লব সাধিত হয় , তাঁর পূর্বে মানুষ যে যার মত বসতবাড়িতে ব্যাক্তিগত ভাবে প্রয়োজনীয় টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করে নিত।  মাঝে মাঝে তারা এসমস্ত পন্যের ছোট পরিসরে বিনিময় করত।  এভাবেই আগের মানুষ তাদের বস্ত্রের চাহিদা মিটিয়ে আসছিল।

১৭৩৩ সালে ফ্লাইং সাঁটল আবিস্কার হওয়ার মধ্য দিয়ে কুটির শিল্পের টেক্সটাইল বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠানে রুপ নেয়ার সম্ভাবনা দেখতে পায় , ১৭৬৪ তে স্পিনিং জেনি , ১৭৮৪ সালে পাওয়ার লুম(তাঁত) আবিষ্কৃত হওয়ার পরে বাস্তবিক অর্থে টেক্সটাইল শিল্পকে বড় পরিসরে উৎপাদনমুখী করা সম্ভব হয় ।

এরপর জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন , ইলি হোয়াইটনির তূলা জিনিং করার ম্যাশিন ও ইলিয়াস হাও এর শেলাই ম্যাশিন টেক্সটাইল শিল্পকে আরও দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

বর্তমানে টেক্সটাইল মানব ইতিহাসের একটি অন্যতম প্রধান শিল্প ।  যা একাধারে কৃষিজাত কাঁচামাল , বৈচিত্র্যময় উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের বিতরণ ব্যাবস্থার সমন্বয়ে অনেক জটিলাকার  একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে।

টেক্সটাইল শিল্পের কার্য পরিধির সূচনা হয় ফাইবারজাঁত কৃষি পণ্য চাষের মধ্য দিয়ে যেমন পাট ও তুলার চাষ,ভেড়া পালন ও সিল্ক ফাইবার সৃষ্টিকারী মথ পোকা চাষ করা এবং এসব উৎস থেকে ফাইবাররূপি কাঁচামাল বের করা ।

এর পরে আসে সেই কাঁচামাল থেকে পর্যায়ক্রমে সুতা,ফেব্রিক ও পোশাকের রূপান্তর কাজ।  যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে স্পিনিং মিল,উইভিং মিল,নিটিং মিল,ডাইং ও গারমেন্টস মিল ।

এর বাইরে রয়েছে বোতাম,জিপার,সেলাই ম্যাশিন,শেলাই সুতা,নিটিং করার জন্য প্রয়োজনীয় ধাতব দণ্ড,লেচ,তাত,বস্ত্র ব্যাবসায়ীদের ব্যাবহার্জ্য সামগ্রী ইত্যাদি সবমিলিয়ে টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি সৃষ্টি হয় অনেক  খুঁটিনাটি শাঁখার সমন্বয়ে।

টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন বিভাগঃ

স্পিনিং-

প্রাকৃতিক অথবা কৃত্তিম উৎস থেকে প্রাপ্ত ফাইবারকে সুতায় পরিনত করার পদ্ধতিকে  স্পিনিং বলা হয়। স্পিনিং এর বেশ কিছু ধাপ রয়েছে যেমন ব্লো-রুম,কার্ডিং,ড্রইং,কম্বিং,সিমপ্লেক্স এবং রিং ফ্রেম।

“ব্লো-রুম” স্পিনিং এর প্রথম ধাপ যেখানে ওপেনিং,ক্লিনিং,ব্লেন্ডিং ও মিক্সিং করে ফাইবারের বেলকে আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যে বিশিষ্ট ল্যাপে পরিনত করা হয়।

এর পরের ধাপ “কার্ডিং”  যা স্পিনিং এর হৃদপিন্ড হিসেবে বিবেচ্য । কার্ডিং এর মাধ্যমে ব্লো- রুমে তৈরি হওয়া ল্যাপ থেকে স্লাইভার তৈরি করা হয় ।

কার্ডিং এর পরে আসে “ড্র ফ্রেম”,এখানে স্লাইভারকে ডাব্লিং করে ড্রাফট দেয়া হয় । এর পরে প্রয়োজন বোধে স্লাইভারের ভিতরের ফাইবার গুলো যাতে আরও শক্ত হয় তার জন্য কম্বিং করা হয়ে থাকে ।

এছাড়া কম্বিং ছোট ফাইবার কে দূর করে , ফাইবার গুলোর মধ্যে সমান্তরাল ভাল বাড়ায়।

কম্বিং এর পর স্লাইভার গুলোকে নিয়ে  আসা হয় সিম্প্লেক্স ম্যাশিনে যেখানে স্লাইভার গুলোর ঘনত্ব কমিয়ে সুতা তৈরির জন্য আবারও কিছু টুইস্ট প্রদান করা হয় , সিমপ্লেক্স ম্যাশিনে স্লাইভার যে ফর্মে রূপান্তরিত হয় তাকে রোভিং সুতা বলে।

সর্বশেষের ধাপটি “রিং ফ্রেম” । ববিনের মধ্যে থাকা রোভিং সুতাকে রিং ফ্রেমে বসিয়ে  উচ্চ গতিসম্পন্ন রোলারের মধ্যে দিয়ে গমন করিয়ে ফেব্রিক তৈরিতে ব্যাবহার উপযোগী সূতায় পরিনত করার মাধ্যমে স্পিনিং এর কাজ সমাপ্ত হয়।

ফেব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং –

বর্তমানে ফেব্রিক তৈরির অনেক নতুন নতুন পন্থা আবিষ্কৃত হলেও উইভিং ও নিটিং কেই সবচেয়ে পরিচিত ফেব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়া ধরা হয়। তন্মদ্ধে উইভিং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও বেশি ব্যাবহৃত কৌশল।
আদিম মানুষ সম্ভবত ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে তৈরি পাখির বাসা দেখেই প্রথম কাপড় তৈরি করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। স্পিনিং পদ্ধতির উন্নতির সাথে সাথে,  মানুষ তাঁতে ব্যাবহার করার জন্য আরও উন্নততর কাঁচামাল পেতে থাকল।
প্রথমে হাতে চালিত তাঁত যন্ত্র দিয়েই মানুষ কাপড় বুনত ।  এখন অনেক রকমের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় তাঁত যন্ত্রের আবির্ভাব হয়েছে যেগুলো খুব অল্প শক্তিতে চলে  এবং  বাহারি ডিজাইনের সৃষ্টি করতে পারে।তবে বর্তমান সময়ে কাপড় তৈরির সবচেয়ে বেশি ব্যাবহার হওয়া কৌশলের নাম নিটিং।
নিটিং এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য কৌশলগত বিভিন্নতা এবং প্রায় সবধরনের কৃত্তিম ও প্রাকৃতিক ফাইবারকে ব্যাবহার করার উপযোগ্যতা । হোশিয়ারি গেঞ্জি , সোয়েটার, অন্তর্বাস , কোট অনেক রকমের কাপড় নিটিং পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে।

ওয়েট প্রোসেসিং-

ওয়েট প্রোসেসিং হল সেই বিভাগ যেখানে তৈরি হওয়া কাপড়ের  ডি-সাইজিং,ফ্লাওয়ারিং,ব্লিচিং,মার্চেরাইজিং ও ডাইং এর মত সব কাজ সম্পন্ন করা হয়।
কাপড়ে মাড় জাতীয় পদার্থ থাকলে তাকে দূর করতে ডি-সাইজিং করা হয়।
কাপড়ের মধ্যে ফ্যাট,তেল,চর্বি ও ছাই জাতীয় অপদ্রব্য কে দূর করার নাম স্কাউয়ারিং ।
ফাইবারের গায়ে যে কিছু প্রাকৃতিক রঙ থাকে সেগুলোকে দূর করতে ব্লিচিং করা হয়ে থাকে।
ফেব্রিকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করনের লক্ষ্যে মার্চেরাইজিং করা হয় ।
কাইয়ার বয়লার,জে-বক্স,জেট,জিগার,প্যাড ম্যাঙ্গেল,উইঞ্চ ডাইং  ইত্যাদি ম্যাশিন ওয়েট প্রোসেসিং বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাবহৃত হয়।

গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং-

বড় আকারের টেক্সটাইলজাঁত সামগ্রী উৎপাদন করতে যেসব প্রস্তুতকারক পদ্ধতি ও কৌশলের ব্যাবহার করা হয় তারই সম্মিলিত রুপকে গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং বলা হয়। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়

১) ওভেন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি
২)নিট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি
৩) সোয়েটার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি

পোশাক তৈরি হয় প্রধানত সেলাই ম্যাশিনের সাহায্যে।  সাধারণত যেসব প্রকৃতির সেলাই ম্যাশিন ব্যাবহার হয় তাদের তালিকা নিচে দেয়া হল

১)লক-স্টিচ
২)চেইন-স্টিচ
৩)ওভার লক
৪)ফ্ল্যাট লক
৫)ব্লাইন্ড স্টিচ
৬)বার-টাক
৭)বটম- হোল
৮)বটম-এটাছিং
৯)লেবেল সেলাই ম্যাশিন

টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির প্রধান কাজ যদিও পোশাক তৈরি  কিন্তু এর বাইরেও বহু সংখ্যক মানুষ নিয়োজিত থাকেন নতুন ফ্যাশন ও ডিজাইন তৈরি করার কাজে। কিছু টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে যেগুলোর উৎপাদিত পন্যের তালিকায় রয়েছে শুধু কম্বল,বালিশের কভার, চাদর,তোয়ালে ইত্যাদি।  ফেব্রিক আমদানি ও রপ্তানির ব্যাবস্থাপনাও টেক্সটাইল শিল্প কলকারখানার একটি অংশ।

পরিশেষে এটা বলা বাঞ্ছনীয় যে টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি আমাদের উপরিল্লিখিত সামগ্রির যোগানের সাথে সাথে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহ করার একটি বিশাল ক্ষেত্র ।

লেখক: অমিত কুমার দাশ।
তথ্যসুত্র: ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE