জ্ঞানের বিভিন্ন স্তরে মানুষ কেমন আচরণ করে!

খালি কলসি বাজে বেশী, ভরা কলসি বাজে না! প্রবাদটির সাথে আমরা কমবেশী সকলেই পরিচিত। সত্যিই ব্যাপারটি কি এমন কিছু? জ্ঞানের তিনটি সাধারন স্তরে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে। প্রাথমিক স্তরে প্রবেশের পর মানুষ অহংকারী হয়ে ওঠে এবং ভাবতে শুরু করে সে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। মহাজ্ঞানীর মত আচরণ শুরু করে। সবাইকে জ্ঞান দেওয়া শুরু করে।

দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশের পর থেকে মানুষ বিনয়ী ভাব প্রকাশ করে। এবং তার জানার আগ্রহও বাড়তে শুরু করে। সে সময়টাতে এসে পূর্বের চেয়ে সব কিছুর প্রতি অধিক মনযোগী হয়ে ওঠে। তৃতীয় স্তরে প্রবেশের পর তার অতীত ভুলগুলো সে উপলব্ধি করতে পারে। এবার অনেক কিছু জানার পরও তার মনে হয় সে কিছুই জানে না। কিছুই শিখতে পারে নি। এখনও বহু বাকি শেখার। সে আসলে অথই সমুদ্রে মুক্তা খোজার বৃথা চেষ্টাই করছি।

এবার আসি বাস্তবতায়। বর্তমান সময়ের উঠতি বয়সের কিছু ছেলেমেয়েদের দেখা মিলে যারা ইন্টারনেটের কল্যানে সারাদিন ফেসবুকিং ও গেমিং করে দিন রাত পার করে দিচ্ছে। যদি জিজ্ঞাসা করেন হারিকেন এর জ্বালানী কি? নিশ্চিত আপনার মুখের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকবে। হারিকেন এর নাম শুনেছে কিনা সন্দেহ! এর আবার জ্বালানীও লাগে নাকি! চাকা আছে নাকি পাখা আছে? আকাশে উড়ে নাকি পানিতে চলে? রাস্তায় চললে তো দেখতাম ভাই! অবস্থাটা এমন হলেও অবাক হবেন না! কারন তারাই আপনাকে একটু পর দেশ বিদেশের সাম্প্রতিক বুলেটিন জানাতে শুরু করবে।

ট্রাম্প চ্চাচুর বেইলী রোডের রেষ্টুরেন্টটা খুব জনপ্রিয় এখন! ফুড টেষ্ট তো দশে দশ! জানেন ভাই ফেসবুকে ওমুক সেলিব্রেটির দিন এখন! ওমুক এবারের মিস ওয়াল্ড কনফর্ম। ওমুক মোটিভেশনাল স্পিকার ভাল বকে। আমার তো তার কথাগুলো সেই লাগে। বলেই ভাই একটু! মেসেঞ্জোরে মনযোগ! ও এই ঘন্টায় তো সেলফীর সাথে ষ্টাটাস দিতে লেট হয়ে গেল। ক্যামেরাটা সামনে নিয়ে ভাই ভাই এদিকে। মোবাইল মুখ দু্ইটা বাকাইয়া চক্ষু আকাশে তুইল্লা এক টিপ!

স্টাটাস- আমি আর ভাই গুরি।
হ্যাসট্যাগ- ভবিষ্যতে মানুষ টেলবেট খাইয়া বাচোব।
কেতে আর ভাত চাস করতে হবে না।

তার টাইমলাইনে বাংলা বানানের দুরাবস্থা দেখে ভাই ফিট পড়ে যেতে পারে! এমন কি আক্কেল দাঁতে দাঁত লেগে খিচুনীও উঠতে পারে!

ভাল জিপিএ, সিজিপিএ অর্জন করা ছেলে-মেয়েদের একমাত্র লক্ষ। বাবা-মায়েরাও সেটাতে সন্তুষ্ট। ছেলে মেয়ে ভালো রেজাল্ট করছে। খারাপ কি?! পড়াশুনা করে মস্ত বড় গাধা হচ্ছে সেটার দিকে নজর দেয়ার কে আছে?! পড়াশুনা শেষে বাবা-মায়ের সোনার ছেলের চাকরী জোটে না। হাতাশায় বিপন্ন জীবন! দেশে চাকুরী নাই কিংবা মামার সাথে মামুর জোড় না থাকলে চাকুরী হয় না জাতীয় স্টাটাস!

কজন বাবা-মা আছেন ছেলে মেয়েকে ক্লাশের বইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন? তা না পারলেও অবশ্য ফ্রেবুয়ারীর বই মেলায় গিয়ে বই হাতে কয়েকটা সেলফী তো তুলতেই হবে! মেলায় কেনা বইগুলো ব্যাগে ঝুলিয়ে ঘরে এনে বইয়ের ধুলা ঝেড়ে দেখার সুযোগ না হলেও পুরানো পেপারের সাথে গন্তব্যে পৌঁছে কারও আহারের আয় তো বাড়াচ্ছে!

প্রাথমিক স্তরের জ্ঞান দিয়ে যারা চাকুরীর সুযোগ করছেন তারা কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করতে না পেরে আজ এক প্রতিষ্ঠান তো কাল আরেক প্রতিষ্ঠান। আর যারা পাইপ লাইনে চাকুরীর অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা নিজের দক্ষতা বলতে সার্টিফিকেট গুছিয়ে চলেছেন বছর বছর। প্রতিষ্ঠান আপনার সার্টিফিকেট দিয়ে প্রাথমিক মূল্যয়ন করলেও পরবর্তী মূল্যায়ন করে কাজের মাধ্যমে। আপনার দক্ষতা অনুযায়ী আপনার কাজের স্তরে পৌঁছে দেয় প্রতিষ্ঠান।

দ্বিতীয় স্তরে মানুষগুলোকে পাবেন খুব বিনয়ী স্বভাবে। কোথা থেকে কিভাবে কি শেখা যায়, কিভাবে নিজের দক্ষতা বাড়ানো যায় সে চেষ্টায় ব্যস্ত। এরা পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠান ছোট-বড় সকলের সাথে বিনয়ী ভাবে বিচরন করে। প্রতিটা ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষন করে। ঘটনার অন্তরালের ঘটনা ঘেটেও শেখার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

তৃতীয় স্তরের ব্যাক্তিগুলো যতই জানুক না কেন তারা নিজেকে খুব ছোট ভাবে উপস্থাপন করে। সত্যিকার অর্থে এই মানুষগুলো জ্ঞানের মহাসমুদ্র থেকে বিন্দু পরিমানও শিখতে পারছে বলে ধারণা করে না। কারন তারা খুব ভাল ভাবেই অনুধাবন করতে পারে শেখার কোন শেষ নেই। সর্বশেষ স্তরের এই মানুষগুলোর থেকেই সবচেয়ে বেশী শিক্ষা আপনি পেতে পারেন। যদিও এই মানুষগুলো সাধারনের থেকে একটু কমই কথা বলে। তবে যতটুকু বলে তা কাজে লাগার মত কথা বলে। এই শ্রেনীর মানুষের একটা উপদেশ আপনার সারা জীবনের সম্পদ হতে পারে। যা আপনার সমস্ত জীবনকে বদলে দিতে পারে।

লেখক: মাসুদুর রহমান (মাসুদ)
সিইও উদ্যোক্তার খোঁজে ডটকম।

Check for details
SHARE