জিতে যাওয়ার ভিন্ন গল্প!

নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিক্রেটটি ফাঁস করে দিচ্ছি। দয়া করে আমার কোনো লেখা কোনোদিন না পড়লেও এটি পড়ুন, কারণ আমি নিশ্চিতভাবে জানি- এই লেখাটি আপনার জীবনে পড়া অন্য যেকোনো লেখার চেয়ে শতগুনে বেশি আকর্ষণীয়। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি- আপনি অবশ্যই কিছু শিখবেন এটা থেকে! সাথে বলে রাখছি- এই গল্পটি বলার পর অনেকের সাথে ব্যক্তিগত কিছু সম্পর্ক ছাড়া গোপনীয়তা বলতে কিচ্ছু থাকবেনা আমার জীবনে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি- এটা পড়ার পর আপনি অবশ্যই নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন। কাজেই এখনই শুরু করুন পড়তে, কেমন?

তার আগে বলি রাখি- শাহরুখ খান গতবছর আমেরিকার বিখ্যাত ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন। বক্তৃতায় তিনি বলেছেন- তুমি হারতে না জানলে, প্রচুর পরিমাণ ভয় না পেলে, অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম না করলে জীবনে বড় কোনো সাফল্য পাবেনা। তিনি আরও বলেছেন- তিনি একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছিলেন, তাঁর বাবা মা তাঁকে এতো বড় সুপারস্টার হিসেবে দেখে মারা যাননি। তবুও জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে তিনি থেমে থাকেননি এবং প্রতিবার অসংখ্য পরাজয়ের পর সাফল্যটি ছিল রীতিমতো এক্সিডেন্টের মতন!

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় হারের গল্পটা ইন্টারমিডিয়েট লাইফে। এক অভাগাকে ভালোবেসেছিলাম। আমি জানতাম না সে কেবল আমার সাফল্যওয়ালা স্ট্যাটাসটা ভালবাসে, আমাকে নয়! আমি জানতাম না- আমার অসংখ্য এ্যাওয়ার্ড, সার্টিফিকেট, প্রাইজ মানিই হচ্ছে তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়, আমি নই!

এটা বুঝবার কারণ হচ্ছে- ২০১৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট। অগাস্ট মাসের ১৩ তারিখ। সেরকম বিভীষিকাময় দিন আমার জীবনে কখনোই আসেনি। সম্ভবত আসবেও না। দেখা গেলো- দুবছর আগে বিজ্ঞান বিভাগে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া ছাত্রীটি একটি বিষয়ে ফেল করেছে! বিষয়টি তার অতি প্রিয়- পদার্থবিজ্ঞান!

তার সঙ্গের সমস্ত ছেলেমেয়ে যখন পরের মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেবার জন্য পড়ছে- তখন সে বোর্ডে খাতা চ্যালেঞ্জ করে বসে আছে! তার কোনোরকম ভর্তি পরীক্ষা দেবার তাড়া নেই। চ্যালেঞ্জের রেজাল্টে সে একমাস পর যখন সফল হলো তখন দেখা গেলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য ঘোষণা দিয়েছেন- রেজাল্ট বদলে যাওয়া ছেলেমেয়েদের জন্য তারা দুঃখিত! তবে তাদের জন্য আলাদা ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা হবেনা! সেইসাথে তিনি আরও ঘোষণা দিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেবার কোনো সুযোগ থাকছেনা!

এবার জীবনের দ্বিতীয় ভুল সিদ্ধান্তটি নিলাম। সেটি হচ্ছে- সমস্ত পরীক্ষাটি আবার নতুন করে দেবো! একবছর জানপ্রান দিয়ে পড়লাম, সেইসাথে প্রেমিক নামের চরিত্রটিকে চিনে নিলাম। চরিত্রটি রেজাল্টের পরদিনই বিপর্যস্ত আমাকে রেখে পালিয়ে গেলো শুধু এই একটিমাত্র অসাফল্যটির জন্য!

আমি হেরে গেলাম, কিন্তু ভেঙে পড়লাম না। প্রতিনিয়ত দিনরাত পড়তে লাগলাম, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে কাঁদলাম, সেই কান্নার দাগ জলে ধুয়ে এসে পড়লাম। নিজের বড় ভাইটির, বড় বোনটির আমার কারণে শুরু হওয়া স্ট্যাটাস সংকট নিজ চোখে দেখলাম। লেখালিখি থেকে বিরতি নিলাম। ২০১৫ সালে আমার কোনো বই বের হলোনা। নানাজনে নানা কথায় নানানভাবে বুঝিয়ে দিলো- তুমি শেষ, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা। বাবা মুখ পাংশু করে মা’কে জানালেন- রিটায়ারমেন্টের টাকা দিয়ে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাকে পড়ানোর অতো টাকা তার হবেনা! তারমানে তিনি ধরেই নিয়েছেন- আমি কোথাও চান্স পাচ্ছিনা আগামীবারেও!

এদিকে ২০১৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কঠোর পরিশ্রমের পর যে দারুণ সাফল্যটি আসা দরকার সেটি এলোনা। কারণ- আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা মতে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের খাতাগুলি মূল্যায়িত হয় সত্যিকার অর্থে মেধার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ শিক্ষার্থীদের সাথে। যারা গতবছর ফেল করে গিয়েছে। একারণে গোল্ডেন এ প্লাস পেলাম না। কিন্তু সমস্ত ভয় নিয়ে নিজের সাথে নিজে আলোচনা করে ঠিক করলাম- কি করবো? কি হতে চাই আমি?

বিশ্বাস করুন, নতুন করে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার রেজাল্টের পর অনেকের অভিনন্দন কান বুজে শুনেছি। কারণ- মনের মধ্যে ততদিনে ভয় ঢুকে গেছে যে, এরপর এই আনন্দের কারণে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে কপালে দুঃখ আছে! সারাদিনে চার ঘন্টা ছাড়া ঘুমাইনি। ঘুমালেও ঘুমের মধ্যে অবজেক্টিভ প্রশ্ন, সেগুলির উত্তর ঘুরপাক খেতো। দুই দুইটি ঈদ চলে গেলো, ঈদের দিন রাতের বেলাও পড়লাম। মেহেদী দেওয়ার একমাত্র আনন্দটি ছাড়া আর কিছুই করলাম না।

তবে ভর্তি পরীক্ষার আগে পুরানো আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো। তখন আমি জানতাম- পৃথিবীর কারোর সাধ্য নেই আমাকে ঠেকিয়ে রাখার! মানুষের অসাধ্য কিচ্ছু নেই- এই ব্যাপারটিও নতুন করে বুঝলাম। যেহেতু ইন্টারমিডিয়েটের পুরো পরীক্ষাটি দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন রেজাল্ট পেয়েছি, কাজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পরীক্ষা দেবার সুযোগ এলো। এবার আমি রেগেমেগে কেবলমাত্র তিনটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফর্ম তুললাম- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যেখানেই পরীক্ষা দিয়েছি সেখানেই চান্স পেয়েছি। সবচেয়ে মধুর সমস্যাটি হচ্ছে- এতোগুলো বিষয়ে চান্স পাবার পর ঠিক কোনখানে ভর্তি হবো? এক বছর আগে যে বন্ধুটি অবজ্ঞা করেছিল তার মুখেই শুনেছি- প্রীতি, তুই একটা জিনিস বস! আই স্যালুট ইউ!

যে প্রেমিকটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার মুখে শুনেছি- অভিনন্দন! তুমি চাইলে আমাদের আবারো সম্পর্ক হতে পারে! এবার আমি আমার হাসিমুখটি দেখিয়ে সৌজন্য ভদ্রতার সাথে বলেছি- আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে এসো, চা খাওয়া যাবে। জার্নালিজম, আর্কিওলজি, হিস্ট্রি, লিটারেচার, ড্রামাটিক্স, ভাষাবিজ্ঞান সবগুলি ছেড়ে ভর্তি হলাম সেই বিষয়টিতে যেখানে আমি যেতে চেয়েছিলাম শৈশবে। শৈশবের ডায়েরিতে লিখেছিলাম- আমি বড় হয়ে চিত্রশিল্পী হতে চাই।

হ্যাঁ, চারুকলা! এতো বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে ভর্তি হবার আগেই আমার আত্মজীবনী ‘উনিশ বসন্ত’এর প্রকাশককে ‘লেখক পরিচিতি’র অংশে নিজে লিখে দিয়েছিলাম- তিনি বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত! কথা হচ্ছে, এই পুরো একবছর আমাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছিল কে?

-প্রথম উৎসাহদাতা হচ্ছে: ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে চান্স পাওয়া অচেনা গ্রামের ছেলেটি। তিন দশমিক আট শূন্য জিপিএ নিয়ে সে বিরাট বিরাট গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়াদের ঘোল খাইয়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছিল! আমার মনে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনাটা ছিল- সে যদি তিন দশমিক আট শূন্য নিয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হতে পারে, আমি চোখ বন্ধ করে চান্স পাবো!

দ্বিতীয়জন হচ্ছেন- লেখক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি একবার ফেল করেছিলেন আমেরিকায় পিএচডি করতে এসে। দেখা গেলো তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিচ্ছু বোঝেন না। আগেও কখনো পড়েননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়াসন বিভাগের চেয়ারম্যান লিখে দিয়েছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে অল্প কয়েকজন মেধাবী ছাত্র তৈরি করেছে, নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদ তাদের একজন।

মেধাবী ছাত্রের এই অবস্থা জানলে কি হবে?
ওদিকে ওই কোর্সে সবচেয়ে বেশি মার্ক পেলো একজন অন্ধ ছাত্র। প্রথম টার্ম ফাইনাল শেষে হুমায়ূন আহমেদকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল- এবার দ্বিতীয় টার্ম ফাইনালে জিরো পেলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে! কাজেই হুমায়ূন আহমেদ জানপ্রান দিয়ে পড়লেন এবং দ্বিতীয়বার টার্ম ফাইনালে পেলেন ১০০ তে ১০০! সারা নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয় জেনে গেলো- বাংলাদেশ নামের একটা দেশ থেকে এক পাগল ছাত্র এসেছে, যে প্রথমবার শূন্য পেয়ে দ্বিতীয়বার পেয়েছে ১০০ তে ১০০!

তৃতীয় ব্যক্তিটি হচ্ছেন আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। যিনি খুব সংক্ষেপে বলেছিলেন- A man can be destroyed but never defeated! অর্থাৎ- একজন মানুষকে ধ্বংস করা যায়, পরাজিত করা যায় না!

জানিয়ে রাখছি- বাংলাদেশে প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে দশ থেকে বারো লাখ শিক্ষার্থী, আগের বছরের কোথাও চান্স না পাওয়া আট দশ লাখ মিলিয়ে সবমিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পরীক্ষা দেয় মাত্র বিশ লাখের মতন! সেখানে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সবমিলিয়ে মোট সিট আছে চব্বিশ হাজারের কিছু বেশি। এই চব্বিশ হাজারের মধ্যে দেশের তিন তিনটি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আটটি সিট আমার দখলে ছিল। এটি নিয়ে গর্ব করা কি খুব বিশাল কিছু বলে মনে হচ্ছে আপনার কাছে?

আপনার বিশাল কিছু না মনে হলেও আমার কাছে মনে হচ্ছে। কারণ- লেখালিখি, ছবি আঁকা, আবৃত্তি, বিতর্ক আর গানে দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য এ্যাওয়ার্ড আর সম্মাননা পেয়েছি। মাইক্রোসফট থেকে শুরু করে জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন- প্রতিটির ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হয়েছি। সময়ের সেরা সুপারস্টারদের হাত ছুঁয়ে দেখেছি। এদেশের যেকোনো মেয়ের জন্য অবিশ্বাস্য অংকের টাকার চেকটি নিজের করে পেয়েছি। কিন্তু আমার মতে আমার জীবনের এই পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্যটি ছিল এটি। একটি একাডেমিক ক্যারিয়ার, একটি সত্যিকারের সাফল্য। একটি হেরে যাওয়ার গল্পকে সাফল্যের গল্প বানাবার তীব্র চেষ্টা।

আমি শাহরুখ খানের সঙ্গে একমত। সাফল্য হচ্ছে এক্সিডেন্টের মতন। যার জীবনে বড় কোনো হার নেই তার জীবনে বড় কোনো সাফল্যের গল্প নেই! কারণ- আমরা সত্যিকার অর্থে জিতে যাই, আমাদের হেরে যাওয়ার গল্পে!

লেখক: তরুণ লেখক ও সাহিত্যিক, তথ্যসূত্র: জাগরনীয়া

Check for details
SHARE