ছোট অলসতা ভবিষ্যতের জন্য বড় অন্তরায়!

ছোট অলসতা ব্যবস্থাপক বা কোনো ব্যক্তির জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এটি প্রায়ই তাদের চরম সংকটপূর্ণ অবস্থায় ফেলতে পারে, যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। অলসতা শুধু অক্ষমতা থেকে উদ্ভূত হয় না, এটি অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাঠককে ছোট ছোট অলসতার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।

একবার সচেতন হলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ অলসতাজনিত কু-অভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এবং সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করতে পারে। এটি তাদের শক্তি, সম্পদ—এর অপ্রত্যাশিত অপচয় থেকে রক্ষা করতে এবং মানসিক শান্তি দিতে সাহায্য করবে। এই প্রবন্ধে আলস্যের শ্রেণিবিভাগ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং যৌক্তিক সমাধানের পথ দেখানো হয়েছে।

একজন কার্যনির্বাহীর কাজের সাফল্য হচ্ছে তার পরিচালনা করার ক্ষমতা, মনোযোগ সহকারে শোনার জন্য তৈরি থাকা এবং কোনো তথ্য সঠিকভাবে গ্রহণ করা, সেই তথ্য যথাযথভাবে প্রেরণ করা এবং দৈহিক ও মানসিকভাবে সপ্রতিভ থাকা। এর মধ্যে কিছু গুণ আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে, কিছু গুণ জন্মগত; কিন্তু এর বেশির ভাগ কিংবা অনেকই অর্জিত হয় ব্যক্তিগত সচেতনতার ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সু-অভ্যাস গঠনের ওপর। সঠিক অভ্যাস দ্রুত গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হচ্ছে, বিরামহীন প্রচেষ্টার মাধ্যমে উপযুক্ত মন গড়ে তোলা এবং স্বীয় কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য কঠোর শপথগ্রহণ ও তা প্রতিপালন।

সু-অভ্যাস গড়ে তোলা কঠিন। একবার এরূপ সু-অভ্যাস গড়ে উঠলে একজন ব্যক্তির মধ্যে তা এমন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয় যে তার কাজ করার ধরন বদলে যায় এবং তা তার কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তার মেলামেশা বা তার সামাজিক আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। সু-অভ্যাস অর্জনের জন্য সাধারণত কোনো বাড়তি খরচ লাগে না, এটি ধীরে ধীরে তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাতিষ্ঠানিক বা অন্যান্য বহিঃকার্যক্রম বিষয়ক অর্জন ভবিষ্যতে একজন ব্যক্তি সু-অভ্যাস চর্চা করবে কি করবে না তার সঠিক ইঙ্গিত বহন করে না। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ কর্মক্ষেত্রে, সামাজিকক্ষেত্রে বা পারিবারিকক্ষেত্রে অপদার্থ বা অসফল প্রতীয়মান হয়। তারা পরিপূর্ণভাবে তাদের প্রতিভা বা সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে না; দেহ-মনে ধীরে ধীরে বাসা বাঁধা কু-অভ্যাসগুলো তাদের সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। ধ্বংসকারক অভ্যাসগুলো তাদের মধ্যে দ্রুত সঞ্চারিত হয় এবং এসব অভ্যাসের কাছে তারা প্রকারান্তরে জিম্মি হয়ে পড়ে।

খারাপ অভ্যাসের সংখ্যা অনেক। অলসতা তার মধ্যে অন্যতম। এই লেখায় আলোকপাত করা হয়েছে অলসতা ও এর শ্রেণিবিভাগের ওপর। ছয় ধরনের অলসতাকে এখানে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অলসতাগুলো সুকৌশলে আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তির কর্মক্ষমতাকে শেষ করে দেয়। ব্যক্তির সার্বিক কর্মক্ষমতা এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। নিচে ধারাবাহিকভাবে এগুলো বর্ণনা করা হলো—

চোখের অলসতা
মূলত আমরা দেখার কাজে, পড়ার কাজে এবং দৃষ্টিগোচর কিছু উপভোগের ক্ষেত্রে আমাদের চোখকে ব্যবহার করি। বেশির ভাগ ব্যক্তি অসতর্কভাবে তাদের চোখকে ব্যবহার করে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বস্তুও তাদের চোখে পড়ে না, চারদিকের মনোরম সৌন্দর্যও তারা ভালোভাবে উপভোগ করতে পারে না। তারা যেকোনো লেখা ভাসা ভাসাভাবে পড়ে এবং অভ্যাসগতভাবে তার অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তু নিবিড়ভাবে পড়া থেকে বিরত থাকে। পাঠবিমুখ ব্যক্তি দলিলাদি না পড়ে এতে স্বাক্ষর করে থাকে। এই দলিলাদির বিষয়বস্তু না পড়ে তা ফাইলে ঢুকিয়ে রাখে। পরবর্তী সময়ে যখন কোনো বড় রকমের ভুল আবিষ্কৃত হয় তখন স্বাক্ষরকারী ব্যক্তির পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো অজুহাত থাকে না। সে তার নিজেকে দোষী মনে করে অভিশাপ দেয় বিষয়বস্তু না পড়ে স্বাক্ষর করার জন্য।

সেই মুহূর্তে তার ভুল শোধরানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। যেসব কাগজপত্রে অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তু না দেখে সাধারণত স্বাক্ষর করা হয় তার মধ্যে রয়েছে—মনোনয়নপত্র, আবেদনপত্রের ফরম, আমমোক্তারনামা, ওকালতনামা, চুক্তির জন্য তৈরীকৃত কাগজপত্র, ফরমের নিচে বা অপর পৃষ্ঠায় শর্তাবলি, নির্দিষ্ট সময় অন্তর পাঠানো রিপোর্ট-রিটার্ন ইত্যাদি। সাধারণত কোনো ব্যাংক, কম্পানি বা সরকারি অফিস থেকে পাঠানো পত্র না দেখেই ফাইলে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এসব কাগজপত্র গ্রহণকারী এভাবে পরিতৃপ্ত থাকে যে কাগজপত্রগুলো সঠিক আছে বলে ধরে নেয় এবং না পড়ার অভ্যাসের কারণে সে তা ফাইলে ঢোকানোর আগে পড়ে দেখে না। সে ধরে নেয় যে সব কিছু ঠিকমতো আছে।

কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার অনেক পরে সে আকস্মিকভাবে দেখতে পায় যে পাঠানো পত্রটির বিষয়বস্তু সে যা চিন্তা করেছিল তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এরই মধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে এবং সে সময় ঘটে যাওয়া ক্ষতি পূরণযোগ্য থাকে না। চোখের কর্মক্ষমতাকে মস্তিষ্ক বা মনই নিয়ন্ত্রণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। এই প্রবন্ধে আলস্যকে একটি নিকটতম অঙ্গ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে গণ্য করা হয়েছে। মস্তিষ্ক বা স্নায়ুকেন্দ্রকেও ভিন্নভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু করা হয়েছে।

কানের অলসতা
একজন ব্যক্তির অবশ্যই শোনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী হওয়া উচিত এবং যে বক্তব্য উপস্থাপিত হচ্ছে, তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করা উচিত। কেউ যদি শোনার ক্ষেত্রে অমনোযোগী হয়, তবে সে শোনা তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ না-ও বুঝতে পারে। সে তখন শোনা তথ্যটি কোনো কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে না বা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কাজে লাগাতে পারবে না। কিছু ব্যক্তি খুব অস্থির প্রকৃতির বা খুব আত্মকেন্দ্রিক হয়। তারা অন্যকে কিছু বলতে দিতে চায় না, অন্যে কী বলছে তা নিয়েও মাথা ঘামায় না। অন্যের কথার ওপর মনোযোগ না দিয়েই তারা মনে করে যে অন্যরা কোনো নতুন বক্তব্য উপস্থাপন করেছে বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলছে না।

তাদের এ ধরনের শোনার অলসতার ফলাফল হচ্ছে কোনো কিছু যথাযথভাবে উপলব্ধি করার ব্যর্থতা এবং সেই বিষয়ে কোনো সুচিহ্নিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারা। আমি লক্ষ করে দেখেছি যে অনেক ব্যক্তি, যারা টিভি দেখে বা রেডিওতে অনুষ্ঠান শোনে, তারা জানে না অনুষ্ঠানটিতে কী ছিল বা খবরের বিষয়বস্তু কী ছিল। তারা তাদের কানকে যথাযথভাবে কাজে লাগায় না। একজন মানুষের অবশ্যই তার কান সজাগ রাখা উচিত পাঠানো সংবাদটি গ্রহণ করার জন্য বক্তা প্রকৃতপক্ষে কী বলতে চাচ্ছে তা বোঝার জন্য। অনেক ব্যক্তির জন্য শোনার আলস্যতা বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। এটি বিশেষভাবে সত্য, তাদের জন্য যারা ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত। শুধু শ্রবণযন্ত্রের দুর্বলতা জন্ম দেয় না। কোনো কিছু অসতর্ক বা হালকাভাবে গ্রহণ করার অভ্যাসই এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা।

হাতের অলসতা
হাতের ব্যবহার অনেক। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে হাতকে মূলত লেখার কাজে, কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য টাইপিংয়ের কাজে, টেলিফোন ব্যবহারের কাজে, যোগাযোগের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কাজে এবং কাজের স্থান কর্মোপযোগী করে সাজিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কিছু ব্যক্তি খুবই তৎপর নির্দেশনা লেখার ক্ষেত্রে, জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে, দ্রুত কোনো আবেদনপত্র লেখার ক্ষেত্রে এবং এজাতীয় অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে; পক্ষান্তরে কিছু ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে খুবই অলস। তারা কোনো কাগজ স্বাক্ষর করাও ইচ্ছাকৃতভাবে মুলতবি রাখে। ছোট নোট লেখা বা ফরম পূরণের ক্ষেত্রেও এ রকম অত্যধিক বিলম্ব তাদের সেবার গ্রাহকদের ওপর চরম প্রভাব ফেলে। এ ধরনের ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে যেকোনো নির্দেশনা লেখার ক্ষেত্রে বা তৈরির ক্ষেত্রে অক্ষম বা অযোগ্য, তা নয়।

কিন্তু সে তার হাতের ব্যবহারের অলসতা দেখায়। ফলে কাজটি হয় না। ব্যক্তিবিশেষের হাত ব্যবহারের বিমুখতা লেখার ক্ষেত্রে, টাইপিংয়ের ক্ষেত্রে কিংবা টেলিফোনের বোতাম চাপার ক্ষেত্রে এমন অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি করে যে উপরোক্ত ব্যক্তি কাজটি করার ক্ষেত্রে মাস কিংবা বছর পিছিয়ে পড়ে। আপনি অবশ্যই তা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন, যদি কখনো এ ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে আপনাকে কোনো কার্য সম্পাদন করতে হয়। একজন ব্যক্তির এসব অভ্যাস দূরীকরণে অনেক সময় লাগতে পারে। তবে এ ধরনের অভ্যাস একজন ব্যক্তির উদ্যোগ ও কর্মক্ষমতাকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে ফেলে এবং তার চারপাশের ব্যক্তির দুর্ভোগ বৃদ্ধি করে। তাই এ ধরনের অভ্যাস যাতে কোনো ব্যক্তির মধ্যে জন্মলাভ না করে সেদিকে সদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

পায়ের আলস্য
পাকে মূলত চলাফেরার কাজে ব্যবহার করা হয়। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নানারূপ কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে অনেক চলাফেরার প্রয়োজন হয়। স্থবিরতা, নড়াচড়ার ক্ষেত্রে অনীহা কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মাইলাধিক হাঁটাকে আমরা কোনো কিছু মনে করি না। কিন্তু মাত্র কয়েক গজ হেঁটে কর্মসম্পাদন বা তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে আমরা কোনো কোনো সময় অবিশ্বাস্য রকমের আলস্য প্রকাশ করি। হয়তো বা কয়েক পদ এগোলেই কক্ষের বাস্তব পরিদর্শন সম্পন্ন করা যায়; কিন্তু আমরা তা করি না।

ধরে নিই যে কক্ষে সব ঠিকভাবে রাখা আছে, বাস্তবে হয়তো ঘটে সম্পূর্ণ তার উল্টো। কখনো কখনো দৈহিক চলাফেরা থেকে বিরত থাকার জন্য আমরা মধ্যবর্তী একজনকে নির্ধারণ করি, যে আমার পক্ষ হয়ে নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করবে। এতে বেশ কিছু বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। মূল নির্দেশনা বিকৃত আকার ধারণ করে অথবা অসম্পূর্ণ বাস্তবায়িত থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ তদন্তের ক্ষেত্রে যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা কয়েক পা অগ্রসর হতেন এবং যদি স্টোর ও কাগজপত্র নিজে দেখতেন, তবে তিনি হয়তো বা মারাত্মক অনিয়ম বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার করতে পারতেন। কিন্তু তা না করায় অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তটি কার্যকর বা ফলপ্রসূ হয় না এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

এ ক্ষেত্রে ছোটখাটো আলস্য ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই এই আপ্তবাক্য সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয় যে ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।’ সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে বিরাট ক্ষতি হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ছিল শাখার ভল্টে নিজ হাতে তালা দেওয়া। কিন্তু আলস্যবশত তিনি সে দায়িত্ব নিরাপত্তারক্ষীকে দেন। তিনি চেয়ারে বসে নিরাপত্তারক্ষী কাজটি করছে কি না লক্ষ করতেন।

কয়েক মাস কাজটি সঠিকভাবে চলেছে। ব্যবস্থাপক তখন আরো অলস বা আয়েশি হয়ে পড়লেন। তিনি তখন কাজটি সঠিকভাবে সম্পাদন হচ্ছে কি না, তা দেখলেন না। তিনি মনে করলেন যে নিরাপত্তারক্ষী কাজটি সঠিকভাবে করছে। একদিন নিরাপত্তারক্ষী ভান করল, সে ভল্টে তালা দিয়েছে। আসলে সে তা করেনি। সে রাতেই ভল্টের সমুদয় টাকা চুরি হলো নিরাপত্তারক্ষী বা তার সহযোগীদের দ্বারা। ম্যানেজারের অবস্থা সংকটাপন্ন হলো। পরবর্তী সময়ে হয়তো বা তিনি বড় রকমের শাস্তি পেয়েছেন। সামান্য অলসতার দরুন ম্যানেজারকে কত বড়ই না মূল্য দিতে হলো।

মস্তিষ্কের অলসতা
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মস্তিষ্ক শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মস্তিষ্কের দ্রুত কার্যকারিতা বা আলস্যতা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রবন্ধে মস্তিষ্ক সম্পর্কে আলোচনা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, এর সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতাকে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। অন্যান্য অঙ্গের মতো মস্তিষ্ককেও একটি স্বতন্ত্র অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সপ্রতিভ মস্তিষ্ক এবং এর সদ্ব্যবহার সুব্যবস্থাপনার একটি বড় উপাদান—নিজের জন্য বা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য বা দেশের জন্য।

গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে সব ব্যক্তি তার মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে না। কোনো প্রকার ভাবনাচিন্তা পরিহার করে যথেচ্ছ জীবনযাপন খুবই উপভোগ্য, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক ব্যক্তিই সব সময় সতর্কভাবে মাথা খাটিয়ে কাজ করাকে পছন্দ করে না। পরিপূর্ণ সাফল্য পেতে হলে একজন ব্যক্তিকে সঠিকভাবে তার মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে হবে। মস্তিষ্ক না খাটিয়ে কোনো কাজ করলে তার মান অনেক নিচু হয়। একজন ব্যক্তি যদি সঠিকভাবে তার মস্তিষ্ককে কাজে লাগানোর অভ্যাস গড়ে তোলে, তবে ধীরে ধীরে তা তার জীবনধারার একটি অংশ হয়ে যায় এবং এই অভ্যাস চর্চা করা তার জন্য খুবই সহজ কাজ হয়ে পড়ে।

পক্ষান্তরে যদি সে ধারাবাহিকভাবে চিন্তাভাবনাহীন আয়েশি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্ককে ব্যবহার না করে, তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রয়োজনের মুহূর্তে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আলস্যকে মস্তিষ্কে স্থান দিলে তা ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে শাণিত করা থেকে তাকে বিরত রাখে। বলা যায় যে এরূপ অবস্থায় মস্তিষ্কে মরচে পড়ে যায়। এর কর্মক্ষমতা লোপ পায়।

ওপরের লেখাটি দীর্ঘদিন ধরে আমার চারপাশের বহুসংখ্যক ব্যক্তির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে অর্জন করা আমার অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের প্রায় সবার মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের অলসতা রয়েছে এবং তারা অল্পবিস্তর এরূপ আলস্যজনিত সমস্যায় ভুগছে। তাদের অনেকেই খুবই যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি, জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। তারা জীবনের সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ এমন বলা যাবে না।

কিন্তু তারা ছোট ছোট আলস্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তারা হয়তো বা তাদের এই দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন নয়। ধীরে ধীরে তা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং তাদের জীবনে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছে। ফলে তারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের প্রতিভা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি। এরূপ ছোট ছোট অলসতা সম্পর্কে তাদের সচেতন করা গেলে এ ধরনের অলসতা প্রতিরোধে তারা সক্ষম হবে। ফলত তাদের জীবন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও যন্ত্রণামুক্ত হবে এবং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যৌক্তিকভাবেই এরূপ প্রত্যাশা করা যেতে পারে।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান, তথ্যসূত্র: কালেরকন্ঠ।

Check for details
SHARE