চলো হই উদ্যোক্তা!

উদ্যোক্তা হওয়ার সুপ্ত মনবাসনা সবার ভেতরেই কম বেশী জাগে। কারন কেউ চায় না অন্য কারও অধীনস্থ্য হিসেবে কাজ করতে। অন্যকারও হুকুম তামিল করতে। কিছু উদ্যোক্তা হওয়ার মত সাহস দেখাতে পারে খুব কম মানুষ। ঝুঁকি নিয়ে সফলতা পায় এমন মানুষও খুব বেশী নয়। নানা প্রতিবন্ধকতায় আটকে যায় উদ্যোগগুলো। চলুন জেনে নিই সফল উদ্যোক্তা হতে যা প্রয়োজন সে সম্পর্কে:

ইতিবাচক মনোভাব: ব্যবসা শুরুর আগে মনে রাখতে হবে, ব্যবসা করতে গেলে ঝুঁকি থাকবে। আর এ ঝুঁকি থাকার মন-মানসিকতা থাকতে হবে। ইতিবাচক মনোভাব অবশ্যই থাকতে হবে।

কঠোর পরিশ্রমী: উদ্যোক্তা হতে হলে কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। তিল তিল করে গড়ে তোলা বিজনেস এক সময় বিশাল শিল্প সামাজ্য করে সাজাতে সততা আর পরিশ্রমের বিকল্প নেই। এরপর আপনাকে হতে হবে ডায়নামিক এবং চৌকস। কেননা উদ্যোক্তা হতে আপনাকে পিওন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রধানের সঙ্গে পর্যন্ত কথা বলতে হবে। অধিক পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে। কোনো কারণে কাজে সফল না হতে পারলে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। অধিক মনোবল নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

কৌতূহলী হওয়া: কৌতূহল সফল উদ্যোক্তাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এটি বাজার যাচাই, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ব্যবসায়িক নতুন কলা কৌশল উন্নয়নেও সহায়তা প্রদান করে থাকেন।

আত্মবিশ্বাস: প্রত্যেক মানুষের কিছু গুণ থাকে। সফল উদ্যোক্তার প্রধান গুণ হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। যার আত্মবিশ্বাস যত বেশি তার সাফল্য তত বেশি। যদিও এটি অর্জন করা কঠিন। সফল উদ্যোক্তা তার আশপাশের আত্মবিশ্বাসী লোকদের মধ্যে অন্যতম। আপনাকে হতে হবে স্থির ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, যা আত্মবিশ্বাসকে আরও বৃদ্ধি করে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে।

উদ্দেশ্য: সব কাজেই একটা উদ্দেশ্য থাকে, উদ্দেশ্যবিহীন কাজ ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। বিশ্বাস করতে হবে আপনি ব্যতিক্রমী কিছু করতে সক্ষম।

মনে মনে দৃশ্যকল্প অংকন: মনে মনে আপনার ব্যবসার দৃশ্যকল্প আঁকুন। কীভাবে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে দেখুন। সেখানে নানা রকম দৃশ্যপট উপস্থাপিত হবে। সবকিছু সুচারুভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন। একজন সফল উদ্যোক্তা তার বাস্তব জীবনে দৃশ্যপটের যথাযথ প্রয়োগে সফলতা অর্জনে সক্ষম হন।

ধৈর্যশীলতা: কঠোর ধৈর্যশীলতার মাধ্যমে ব্যবসার পথকে অধিকতর মসৃণ করতে হবে। ব্যবসায় সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতা নামক শব্দটি থাকে। ব্যর্থতা নামক শব্দটিতে ধৈর্যশীলতার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসার সুদীর্য পথ অতিক্রম করে সফল উদ্যোক্তা হতে অবশ্যই ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ: বর্তমান সময়ে ব্যবসার প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তনশীল। ব্যবসার শুরু থেকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। যারা আপনার প্রতিপক্ষ তাদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করতে হবে। সফল উদ্যোক্তাকে বহু সমুদ্র যাত্রার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দক্ষ ও ঝানু নাবিকের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যিনি ভবিষ্যতকে দেখতে পান। সব ব্যবসায়িক সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে সর্বোত্তম উপায়ের সমাধানের পথ খুঁজে বের করেন।

ঝুঁকি গ্রহণ: ব্যবসা শুরু করতে গেলে প্রথমেই মনে রাখবেন আপনাকে ব্যবসায় ঝুঁকি গ্রহণের মন-মানসিকতা থাকতে হবে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে-No risk no gain. যার কোনো বিকল্প নেই।

বিজয়ী মনোভাব: এখন সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা। ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকবেই। একজন সফল উদ্যোক্তার প্রতিযোগিতায় বিজয়ী মনোভাব থাকতে হবে। সফল উদ্যোক্তা সব সময় ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারেন। বিশ্বের সফল ক্রীড়াবিদের মতো উদ্যোক্তাদের সেরা হতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সময় তাদের প্রতিযোগীদের অতিক্রম করার উপায় বের করতে হয়।

অলসতা পরিহার: সফল ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তারা কখনও কাজ সম্পূর্ণ করতে অলসতা করেন না। তাদের হাতে যখন কোনো কাজ থাকে, তখন তারা দিন-রাত তাদের সম্পূর্ণ শ্রম এবং মেধা দিয়ে কাজটি পরিপূর্ণ করে থাকেন। কাজের ক্ষেত্রে তাদের কাছে অন্য সবকিছু গুরুত্বহীন মনে হয়। এ পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় তাদের ব্যর্থদের থেকে আলাদা করে থাকে।

কখনোই ‘না’ বলা যাবে না: সফল উদ্যোক্তারা জানেন যে তাদের পক্ষে কী করা সম্ভব এবং কী করা সম্ভব নয়। তাই অন্যরা যখন কাজের ভয়ে না বলেন বা পারবেন না বলে কাজ পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেন সফল ব্যক্তিরা তাদের সবকিছু বিবেচনা করেই সুযোগকে হ্যাঁ বলেন। এর ফলে ক্লায়েন্টদের কাছে অন্য সবার থেকে সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন আলাদা। অনেক সময় ক্লায়েন্টরা অন্য কাউকে না খুঁজে সরাসরি সফল ব্যবসায়ীদের আর কাজ করার এবং আরও আয় করার সুযোগ দিয়ে থাকেন।

রাগ ও ভীতি দূর করা: সফল উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। আর যদি ভয়কে জয় করা না যায় তাহলে সুযোগ হাতছাড়া হয়। সফল মানুষ সেই ভয় বা রাগকে কাবু করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা অন্যরা পারেন না। যদি কখনও পরিবেশ আপনার প্রতিকূলে চলে যায় তাহলে রাগ বা ভয়ের কাছে মাথা নত না করে আপনার মেধা ও চিন্তাশক্তি দিয়ে পরিবেশকে নিজের মতো করতে শিখুন। তাহলেই আপনি যেতে পারবেন আপনার চূড়ান্ত সফলতার আরও অনেক কাছাকাছি।

স্বপ্ন দেখা: সফলতার প্রধান সূত্র হচ্ছে আপনাকে স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্নকে সত্যি করতে কাজ করে যেতে হবে। কিন্তু তাই বলে স্বপ্ন দেখে সফলতার কথা ভেবে কাজ বন্ধ করে দিলে চলবে না। যদি আপনার মনে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন থাকে তাহলে বসে না থেকে কাজে লেগে পড়ুন।

অল্পতে সন্তুষ্টি: সফল ব্যক্তিরা মোটামুটি কাজে বা গা ঢাকা কাজে সন্তুষ্ট হন না। যারা মোটামুটি কাজ করে দ্রুত আয় করার চেষ্টা করেন তাদেরও তারা পছন্দ করেন না। স্টিভ জবস যখন এপেল’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন তখন অধিকাংশই তাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। কেননা স্টিভ জবস কখনই মোটামুটি কাজ করা পছন্দ করতেন না এবং এ ধরনের কাজ যারা করেন তাদের পছন্দ করতেন না।

কৌশলী হওয়া: সফল মানুষ অতিরিক্ত ভাব নিয়ে চলেন না। সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা কৌশল অবলম্বন করেন। কেননা এতে করে তারা সঠিক সুযোগ হাতছাড়া করে ফেলতে পারেন। তারা নতুন কারও সঙ্গে দেখা হলে হাসিমুখে অভিবাদন জানান এবং প্রশংসা করেন।

বুদ্ধিমত্তা: এর মানে এই নয়, আপনাকে একজন স্কলার হতে হবে। এন্টারপ্রেনিয়ারদের বুদ্ধিমত্তা একটু ভিন্ন ধরনের। এক্ষেত্রে আপনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন সে ব্যাপারে আপনার থাকতে হবে পুরোপুরি স্বচ্ছ ধারণা। আর এ ধারণা রাখতে হবে ব্যবসা শুরুর আগেই। কমনসেন্সের সঙ্গে আস্তে আস্তে শুরু হওয়া আপনার অভিজ্ঞতাই আপনাকে করে তুলবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে বুদ্ধিমান।

মূলধন: সর্বোপরি উদ্যোগের শুরুতেই নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনীয় মূলধন। বিশেষ করে প্রথম বছরের সব খরচ এবং বিনিয়োগের পুরো টাকাই থাকা চাই আপনার হাতে। পরের বছরগুলোর জন্য হয়তো তারল্য নির্ধারণ করে আপনি ব্যবসার আয় থেকেই সব খরচ নির্বাহ করতে পারবেন। এছাড়া বাংলাদেশের অনেক সরকারি, বেসরকারি ব্যাংক, এনজিও তৈরি আছে আপনাকে সাহায্যের জন্য। এর মধ্যে অনেক বছর ধরে এসএমই বা ক্ষুদ্র ঋণের মাধমে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু বেসরকারি ব্যাংক বিভিন্ন রকম সাহায্য করে আসছে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর ডটকম।

Check for details
SHARE