গল্পটা দারিদ্র জয়ের, গল্পটা ঘুরে দাঁড়ানোর!

এ গল্পের শুরুটা অন্য অনেক দারিদ্র্য জয়ের অসাধারণ গল্পের মতোই। আশির দশকে চরম দরিদ্র পরিবারের ছেলে একাব্বর হোসেন ঢাকায় যান ভাগ্য বদলাতে। সেখানে জুতার কারখানায় কাজ করেন চার বছর ধরে। কাজ শিখে এসে চারঘাটের কালুহাটিতে নিজেই একটি কারখানা স্থাপন করেন। তার সেই কারখানা থেকে এখন এলাকায় হয়েছে ৪৮টি কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। এর মধ্যে নারী শ্রমিক প্রায় ৩০০ জন। এখানে যারা মালিক তারাই শ্রমিক।

সাধারণত সস্তার স্যান্ডেল তৈরি হয় এখানে। এই ছোট উদ্যোক্তারা এখন এগিয়ে চলেছেন দামি স্যান্ডেল তৈরির দিকে। দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের তৈরি স্যান্ডেলের ডিজাইন অনুমোদন করেছে। তবে প্রযুক্তিগত সহায়তা না থাকায় তারা অর্ডার সরবরাহ করতে পারছেন না। তাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। তারা এই সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। শুধু স্যান্ডেল নয়, তারা পার্স, মানিব্যাগ ও চাবির রিং তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এগুলো তৈরি হবে স্যান্ডেল তৈরির পরে বেঁচে যাওয়া উপকরণ দিয়ে।

বাঘা উপজেলার অতিপরিচিত এলাকা আড়ানী থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থতি কালুহাটি গ্রাম। এখানে প্রায় প্রতিটি ঘরে রয়েছে ছোট ছোট জুতার কারখানা। এই শিল্পই এলাকার মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এখানকার অধিকাংশই বাড়িই এখন ইটের তৈরি পাকা। পাকা রাস্তায় নানা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের আনাগোনা। এলাকার বাইরে থেকে মাইক্রোবাসে আসছে ক্রেতারা। তারা নিয়ে যাচ্ছে বাহারি ডিজাইনের জুতা স্যান্ডেল।

কালুহাটি পদুকা শিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান জানালেন, তাদের স্বপ্ন এক সময় জুতা স্যান্ডেলসহ চামড়ার পণ্যের গায়ে লেখা থাকবে কালুহাটির নাম (মেড ইন কালুহাটি)। যা ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে। এটি আন্তর্জাতিক পাদুকা পল্লী হিসেবে সুনাম পাবে।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা জানালেন, বাটা, এপেক্স এবং বিবিয়ানা তাদের জুতার ডিজাইন অনুমোদন করেছে। তবে এখন সমস্যা হলো এখানে দেশি যন্ত্রপাতি দিয়ে হাতে জুতা তৈরি করা হয়। তাতে নিখুঁত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মাঝারি মানের যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। এর জন্য নূন্যতম কারখানা প্রতি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন। এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এর জন্য সরকারের কাছে স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা কামনা করেছে। কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে তাদের সুদের হার বেশি।

এসএসই ফাউন্ডেশনের কনসালটেন্ট মোহাম্মদ আবুল বাসার জানালেন, গত পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত এই এলাকায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। তিনি এই এলাকায় আরো বহুমুখি পণ্য উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছেন। স্যান্ডেলের পাশাপাশি নারীদের পার্স, মানিব্যাগ, চাবির রিং তৈরিতেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

এ এলাকায় প্রচুর বর্জ্য তৈরি হয়। যা সাধারণত জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ এলাকায় গুড় তৈরি করা হয়। এখানে ব্যবহার করা হয় এই বর্জ্য জ্বালানি। এতে প্রচুর কার্বন মনোক্সাইড উৎপন্ন হয়। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই বর্জ্য থেকে যাতে অন্যকোনো পণ্য উৎপাদন করা যায় বিশেষত রিসাইকেল চেইনে ফেলা যায় সে দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

জুতা কারখানার কর্মচারি মুক্তা জানালেন, তারা এখানে মজুরি পান কাজের ভিত্তিতে। প্রতি ডজন স্যান্ডেল তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা কাজ ভেদে ২০০-৩৫০ টাকা মজুরি পান। তাদের পণ্য পাইকারি ক্রেতারা কিনে নিয়ে যায়। এখানে প্রধানত স্যান্ডেল তৈরি হয়। প্রকার ভেদে সেসব স্যান্ডেল ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এখান থেকে কিনে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা রাজশাহীসহ পুরো উত্তরাঞ্চলে সরবরাহ করেন। স্যান্ডেলের উপাদান আনা হয় প্রধানত ঢাকা থেকে। গ্রামে কিছু উপাদানের দোকান বসেছে সেখান থেকেও কারখানা মালিকেরা উপকরণ কিনে থাকেন। স্যান্ডেলের পাশাপাশি অন্য উপকরণ যেমন জুতার পাকেটও তৈরি হয় এ গ্রামে।

অপর শ্রমিক আমজাদ কাজ করছেন তিন বছর ধরে। তিনি বললেন, এখন এখানে কোনো বেকার নাই। যারা কারখানা মালিক তারা এক সময় সবাই ছিলেন শ্রমিক। তিনিও প্রস্তুতি নিচ্ছেন একটা কারখানা স্থাপনের।

তথ্যসূত্র: বাংলা মেইল ২৪ ডটকম।

Check for details
SHARE