খেলনা শিল্পে বাংলাদেশ রপ্তনীর নতুন দিগন্তে!

‘খেলনা’ শিশুর মানসিক বিকাশের মাধ্যম। মন ভাল রাখার পছন্দসই উপকরণ। সন্তানের প্রয়োজনকে তাই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। বর্ধিত এ চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ এক সময় ছিল পুরোপুরি আমদানি নির্ভর। দেশের প্লাস্টিক খেলনার প্রায় সবই আসত চীন থেকে। কিন্তু এখন খেলনার সেই চীন নির্ভরতা কমে এসেছে।

বর্তমানে চাহিদার ৬০ শতাংশই মিটছে দেশীয় খেলনা থেকে। দেশে তৈরি এ খেলনার একটি বড় অংশ আবার রফতানিও হচ্ছে। বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আয় আসছে এ খেলনা থেকে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে চাহিদা পূরণের এ হার শত ভাগে নেয়ার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তরা। তাদের মতে, দেশের খেলনা শিল্প ভবিষ্যতে শুধু চীন নয়, অনেক উন্নত দেশকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ।

জানা গেছে, বাংলাদেশের শহর-গ্রাম-মফস্বলে যেসব স্বল্পমূল্যের প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি হয়, কয়েক বছর আগেও তার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানি নির্ভর। কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছরে সেই অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন এসব খেলনার একটা বড় অংশ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশেই। দেশের অভ্যন্তরে খেলনা তৈরির এ হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। খেলনা তৈরির প্রসারতায় বাড়ছে এর কাঁচামাল আমদানির পরিমাণও।

খেলনার কাঁচামাল আমদানির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে খেলনাশিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ মার্কিন ডলারের। এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির এ পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ১৫০ ও ১০১ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। আবার ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত খেলনা শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের।

এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির এ পরিমাণ পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ৪৫০ ও ৪৪৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে খেলনা শিল্পে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয় ১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার এবং নিষ্পত্তি হয় ৯০ হাজার মার্কিন ডলারের। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। আমাদের দেশে প্রধানত ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ইত্যাদি দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করা হয়ে থাকে। প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কাঁচামাল তৈরি হয়ে থাকে পেট্রোলের বর্জ্য থেকে।

আমদানি কৃত কাঁচামাল ছাড়াও দেশীয় উপাদানেও কিছু খেলনা তৈরি হয় বাংলাদেশে। মূলত ক্ষুদ্র আকারে এই শিল্পটি গড়ে উঠেছে পুরনো ঢাকা এবং আশপাশের কিছু এলাকাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ততম খেলনা সামগ্রীর বাজার পুরনো ঢাকার চকবাজারে। ঐতিহাসিকভাবেই চকবাজার রকমারি পণ্যের প্রধান পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত, তবে এখন পুরো চকবাজারজুড়ে গড়ে উঠেছে খেলনার কয়েকশ পাইকারি দোকান। বিক্রেতারা বলছিলেন, কয়েক বছর আগেও প্লাস্টিকের খেলনার প্রায় পুরোটাই আসতো চীন থেকে।

কিন্তু এখন সেই বাজারে ভালো একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশে তৈরি খেলনা। অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগীতা করে বাংলাদেশ এখন দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করছে খেলনা। খেলনা রফতানিকারকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বছরে এখন প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ওপর প্লাস্টিকের খেলনা ও খেলনা জাতীয় পণ্য রফতানি হচ্ছে বিদেশে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুরুতে বাংলাদেশে খেলনার ব্যবসা ছিল বছরে ২ থেকে ৩ মাস। কিন্তু এখন সারাবছরই কম-বেশি খেলনা বিক্রি হয়। আর এই সুযোগ ব্যবহার করে অনেক ছোট উদ্যোক্তা এগিয়ে আসছেন এই শিল্পে। খেলনা প্রস্তুতকারী সমিতির হিসেবে এখন পুরনো ঢাকা এবং তার আশেপাশে প্রায় চারশ’ কারখানায় খেলনা উৎপাদন করা হয়। অবশ্য সমিতির হিসাব ছাড়া আরও প্রায় ৫ শতাধিক খেলনা তৈরির কারখানা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কারখানাগুলোর অধিকাংশই অবস্থিত ইসলামবাগ, লালবাগ এবং কামরাঙ্গির চরে।

এলাকাগুলোর কারখানাতে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার অনেক নারী গ্রহস্থালি কাজের পাশাপাশি খেলনা শিল্পে কাজ করে আয় করছেন। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক এ পেশায় বর্তমানে যুক্ত রয়েছেন। সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা না পেলেও তারা বছরের পর বছর কাজ করে একটি শিল্পকে গড়ে তুলছেন। কথা হয় ছোট পরিসরের একটি কারখানার মালিক নজরুল ইসলাম এর সঙ্গে। কাজের শুরুর পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করেন তিনি। পরে বাড়ি থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা এনে নিজেই ঢাকায় কারখানা দিয়েছেন।

তিন বছর পর এখন তার ব্যবসার পরিধি বেড়ে পুঁজি চার-পাঁচ লাখ টাকা হয়েছে। বর্তমানে তার কারখানার মতো প্রায় ৮০০ কারখানা আছে এখানে। কোনো কারখানা আরো বড়। সেখানে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করেন। জানা যায়, এই শিল্পের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী প্রথমে কোনো কারখানার কর্মচারী ছিলেন। অনেক বছর কাজ করার পর ধীরে ধীরে তারা স্বল্প পুঁজি খাটিয়ে এ ব্যবসায় ঢুকে পড়েন। আবার নারী শ্রমিকরাও এখান থেকে আয় করে তাদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।

ইসলামবাগের মসজিদ গলিতে আয়শা থাকেন। গৃহস্থালি কাজ শেষে ছোটকাটরা থেকে আসা দেশি খেলনায় স্টিকার লাগান তিনি। আর প্রতি গ্রুস খেলনায় পান ২০ টাকা করে। এতে করে আয়শার দৈনিক আয় ৮০ থেকে ১২০ টাকা। আয়শা তার আশপাশের আরো চার থেকে পাঁচ নারী কর্মী দিয়ে এ কাজগুলো করিয়ে নেন। এতে করে তিনি প্রতি ডজনে তিন টাকা করে আয় করেন। ১২ ডজন খেলনায় এক গ্রুস। স্টিকার লাগানোর পর আরেক দল নারী শ্রমিক খেলনা গাড়ির চাকা লাগান। আবার ‘ইওইও’ খেলনায় বাল্বও লাগান আয়শা। আর প্রতি গ্রুসে পান ১৫ টাকা করে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড ইম্পোটার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জাহিদুল হক নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে বলেন, ‘সুঁই ও সুতা থেকে শুরু করে লাইটিং, প্রিন্টিং, ইলেকট্রনিক কিছু ছোট ছোট যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। আর সবকিছুর জন্য আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রযুক্তিগত সহযোগীতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলে আমরা এ খেলনা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি বাড়াতে পারি।

কিন্তু এখন আমরা আমাদের নড়বড়ে অবস্থাই কাটিয়ে উঠতে পারছি না। তা ছাড়া আমরা জায়গার সংকটেও আছি। ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা লাগে কোনো ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মাল ফিটিং ও প্যাকিং করতে। খেলনার জন্য জায়গা বেশি লাগে। আর খেলনা গুদামে রাখতে তো আরো অনেক বেশি জায়গার প্রয়োজন। খেলনা তৈরির কারখানা ও গুদাম স্থাপনের জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ দিলে এ শিল্প আরও বেশি লাভজনক হয়ে উঠবে বলে জানান তিনি।

জাহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের এ ব্যবসার জন্য অনেক টাকার পুঁজি দরকার হয়। অথচ ব্যাংক থেকে আমরা তেমন কোনো সহযোগিতা পাই না। কারণ ব্যাংক লোন নিতে স্থায়ী জায়গার প্রয়োজন হয়। অথচ এখানে প্রায় ৮০ ভাগ ব্যবসায়ী ভাড়া বাসায় ব্যবসা করছেন। লোন পেলেও তা অনেক চড়া সুদে নিতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার স্বপন কুমার রায় বলেন, ‘খেলনা শিল্প মালিকদের স্থায়ী বাসস্থান না থাকলেও তারা এসএমই খাতে ব্যাংক লোন নিতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে ওই ব্যবসায়ী যে বাসায় ভাড়া থাকেন, সেই বাসার বাড়িওয়ালার কাছ থেকে তিন বছরের একটি চুক্তিনামা নেবেন। তবেই আমারা ব্যাংক লোন দিতে পারব।’

তবে সরকার এ ধরণের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যার অংশ হিসেবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে খেলনা শিল্প প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে খেলনা প্রস্তুত শিল্পে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে খেলনা প্রস্তুতে ব্যবহৃত প্রায় সব উপকরণ আমদানিনির্ভর। এসব উপকরণ আমদানিতে ক্ষেত্র বিশেষ ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ১৫ শতাংশ মূসক প্রযোজ্য রয়েছে।

ফলে আমদানিকৃত খেলনার সঙ্গে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই দেশীয় খেলনা শিল্পের প্রসার এবং প্রতিরক্ষণের জন্য খেলনা তৈরিতে ব্যবহার্য অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ আমদানিতে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শর্ত সাপেক্ষে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক এবং সমুদয় মূল্য সংযোজন কর (মূসক) থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিলে চট্টগ্রাম বন্দরে পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা যেতে পারে। আমরা নিজেরা যদি কাঁচামাল উৎপাদন করতে পারি, তবে একদিকে আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে, পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমবে। পরনির্ভরতা কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের অর্থনীতির এ সম্ভাবনাময় খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারি পর্যায়েও নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে।

প্লাস্টিকের খেলনা পণ্যে বৈচিত্র্য এনে দেশি-বিদেশি ভোক্তাদের মন কীভাবে জয় করা যায় তা নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণাও প্রয়োজন। এ শিল্পের উন্নয়নে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হলে দেশ যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে তেমনি কর্মসংস্থানেও রাখতে পারবে কার্যকর অবদান।- তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

Check for details
SHARE