ক্রেতা আকর্ষণের কেতাদুরস্ত সব কায়দা!

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আসছে বাজারজাতকরণ পদ্ধতির। যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন প্রক্রিয়া। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ বিশেষত ঢাকা শহরে অনলাইন মার্কেটিং ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বই থেকে নিত্যপণ্য এখন ঘরে বসেই কেনা যাচ্ছে সহজেই। শুধু পণ্য কেনা নয়, বিক্রিও করা যাচ্ছে। এতে গতিশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সময়েরও সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। তবে অনলাইন বাজার এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। নিয়ম-কানুনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে। অনলাইন বাজারের সম্ভাবনার অধিকাংশই অব্যবহূত থেকে গেছে। সেটি কাজে লাগাতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। যারা সঠিক পথ দেখাতে পারবে, তারাই হবে আদর্শ।

বাজারজাতকরণের নানা পদ্ধতি আছে, তবে কোনটি দেশের জন্য উপযোগী তা খুঁজে বের করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়েবসাইট না ফেসবুক, কোন মাধ্যমটি বাজারজাতকরণের সাফল্য এনে দেবে, সেটি এখন দেখার বিষয়। সম্ভাবনার বিচারে অনলাইন মার্কেটিং এখনো পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে এটি বাজার সম্পর্কে মানুষের ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। ব্যবসার যত শাখা আছে, তার মধ্যে বাজারজাতকরণ যে সর্বাধিক গতিশীল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল, এ ব্যাপারে বিতর্ক করার সুযোগ খুবই কম।

বাজারজাতকরণের এ ধরনের গতিশীল প্রকৃতির কারণে এর প্রতিটি তত্ত্বের কার্যকারিতা প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, প্রতিস্থাপিত হচ্ছে নতুন তত্ত্ব দ্বারা। এ কারণে বাজারজাতকরণসংক্রান্ত যে কোনো তত্ত্বের প্রবক্তা নিশ্চিত থাকতে পারেন না যে, কত দিন তত্ত্বটির কার্যকারিতা থাকবে।
মাত্র কয়েক বছর আগেও অগ্রগামী বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘বাজারজাতকরণ মতবাদ’ (Marketing Concept)-এর ওপর ভিত্তি করে বাজারজাতকরণ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে ব্যবসার সর্বাধিক সফলতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হতো।

বাজারজাতকরণ মতবাদ হলো একটি ক্রেতামুখী দর্শন, যেখানে ক্রেতার স্বার্থকে অগ্রগণ্য করে বাজারজাতকরণের সব কৌশল ও কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতামূলক সময়ে উন্নত দেশগুলোয় বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্রেতামুখী দর্শনের ভিত্তিতে বাজারজাতকরণ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে হিমশিম খাচ্ছে। উন্নত দেশের অগ্রবর্তী বাজারজাতকারীরা ক্রেতামুখী দর্শন থেকে আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ‘সামগ্রিক বাজারজাতকরণ মতবাদ’ (Holistic Marketing Concept)-এর ওপর ভিত্তি করেই বাজারজাতকরণ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে এবং কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করছে।

সামগ্রিক বাজারজাতকরণ দর্শনে মনে করা হয়, ব্যবসায়িক সফলতা অর্জনের জন্য বাজারজাতকরণের ক্রেতামুখী সব কৌশল, কর্মকাণ্ড একসঙ্গে বিবেচনায় এনে তাদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় ঘটিয়ে এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সব বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের বাইরের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর (ক্রেতা, মধ্যস্থতাকারী, ব্যাংক, বীমা, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি) মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও উত্সাহদানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও অনার্থিক লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। এ দর্শনের মূল কথা হলো, ‘সবকিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে’ (Everything matters.)।

বাজারজাতকরণের এ দর্শনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সামাজিক দায়িত্ব পালন, নৈতিকভাবে ও বৈধভাবে বাজারজাতকরণ কর্মকাণ্ড সম্পাদন, বাজারজাতকরণ স্কোরকার্ড (Marketing Scorecard) (এটি ক্রেতা সন্তুষ্টি, দীর্ঘমেয়াদি বাজার প্রবৃদ্ধি, ব্র্যান্ড ইকুইটি (Brand Equity), ক্রেতা ইকুইটি (Customer Equity) ইত্যাদি অবলোকন করে)ব্যবহার, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পরিবেশগত প্রভাব, কমিউনিটির স্বার্থ ইত্যাদি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়। বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রথাগত ব্যবসার গণ্ডির বাইরে গিয়ে সামগ্রিক বাজারজাতকরণ মতবাদ প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি সফলতার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। তাই যদি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ দর্শনের ভিত্তিতে তাদের বাজারজাতকরণ কৌশল ও কর্মকাণ্ড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ, ক্রেতাপক্ষ ও সাধারণ জনতার স্বার্থ রক্ষা করে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিশ্চিত করতে পারবে।

তবে কত দিন পর্যন্ত এ দর্শনের কার্যকারিতা থাকবে, তা বলা দুঃসাধ্য। ১০-১৫ বছরের মধ্যে বাজারজাতকরণ পদ্ধতির কৌশলগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত অনেক পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো: বাজারজাতকরণ কৌশলের সর্বশেষ সংযোজনগুলোর একটি হলো ‘স্নায়বীয় বাজারজাতকরণ’ (Neuromarketing), যার মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মস্তিষ্কের তরঙ্গ (Brainwave) কার্যাবলি, চোখের গতিবিধি (Eye Tracking) ও ত্বকের প্রতিক্রিয়া (Skin Response) নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়, ক্রেতার মস্তিষ্ক বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ড সম্পর্কিত অন্যান্য বার্তার প্রতি কীভাবে ও কী ধরনের সাড়া দেয়। বাজারজাতকরণের এ কৌশল বিজ্ঞানসম্মতভাবে মানুষের স্নায়বীয় ও ইন্দ্রিয় অঙ্গের (Sensory Organ) কার্যাবলি, পরিবর্তন ও সাড়াকে ব্যবহার করে বাজারজাতকরণ উদ্দীপকের প্রতি ক্রেতার মস্তিষ্ক কী ধরনের সাড়া দেয়, তা নির্ধারণ করে।

স্নায়বীয় বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বাজারজাতকরণ উদ্দীপকের প্রতি সাধারণত ক্রেতার তিন ধরনের সাড়া অবলোকন করা হয়। এগুলো হলো: ইন্দ্রিয়মোটর (Sensorimotor) সাড়া, বোধগত (Cognitive) সাড়া ও হূদয়স্পর্শী (Affective) সাড়া। স্নায়বীয় বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় Functional Magnetic Resonance Imaging (FMRI) Scans, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তসঞ্চালন পরিমাপের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করা হয়। সত্যিকার অর্থে স্নায়বীয় বাজারজাতকরণ কৌশল আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা কয়েক বছর আগেও মানুষের চিন্তার বাইরে ছিল। বাজারজাতকরণের এ কৌশল বাজারজাতকরণকে বিজ্ঞাপনের বেশ কিছুটা কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় মাত্রাও বটে।

আধুনিক বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি নতুন কৌশল হলো আবেগ বাজারজাতকরণ (Emotion Marketing)। ক্রেতার আবেগ কাজে লাগিয়ে পণ্য বা সেবা বাজারজাত করা হয় এ কৌশলের মাধ্যমে। এখানে পণ্য বা সেবাকে এমনভাবে তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়, যাতে ক্রেতার আবেগজনিত অবস্থা, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা উজ্জীবিত করে পণ্য বা সেবা বিক্রি করা সম্ভব হয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজারজাতকারীরা এখনকার দিনে বিশ্বাস করেন, একজন ক্রেতা কেবল যৌক্তিক (Rational) মানুষই নন, একজন আবেগজনিত (Emotional) মানুষও বটে। তাই এ নতুন কৌশল প্রয়োগে তারা পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যৌক্তিক উপাদান ও আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে আবেগময় উপাদান ও আবেদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কৌশল বাজারজাতকরণে এনেছে নতুনত্ব, উন্মোচন করেছে সম্ভাবনার নতুন দিক, যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা।

প্রথাগতভাবে মনে করা হয়, কেবল বাজারজাতকরণ বিভাগ বা ওই বিভাগের কর্মীরাই বাজারজাতকরণের সব কর্ম সম্পাদন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যদি অন্য বিভাগ বা অন্য বিভাগের কর্মীরা তাদের কাজ সুচারুরূপে সম্পাদন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে ক্রেতাদের জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্মিত উপযোগ সৃষ্টি প্রক্রিয়া (Value-creating Process) ব্যাহত হবে। ফলে ক্রেতারা হবে অসন্তুষ্ট ও প্রতিষ্ঠান হবে ব্যর্থ। তাই এখন মনে করা হয়, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ ও প্রত্যেক কর্মী বাজারজাতকরণ কাজে নিয়োজিত। আর তাই বাজারজাতকরণকর্মী শুধু বাজারজাতকরণ কাজ করেন, তা নয়, তিনি একজন নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকাও পালন করেন। অর্থাত্ তিনি নিজে বাজারজাতকরণের কাজ করবেন এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিভাগ বা ওইসব বিভাগের কর্মীদের ক্রেতাদের স্বার্থে যথাযথ কাজ সম্পাদনে উত্সাহিত করবেন, যাতে ক্রেতার সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

চিরাচরিতভাবে মনে করা হয়, একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সফলতা মূলত নির্ভর করে চলতি ক্রেতাদের সঙ্গে কার্যকরী সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর। কারণ চলতি ক্রেতারাই যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় রাজস্বে সর্বাধিক অবদান রাখেন। পাশাপাশি বিক্রি বাড়ানোর নিমিত্তে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের ক্রেতাদের আকর্ষণ করারও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আধুনিক বাজারজাতকরণে মনে করা হয়, ব্যবসায়িক সফলতার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার অক্রেতাসমগ্রকে (Universe of Non Customers) ক্রেতাসমগ্রে (Universe of Customers) রূপান্তর করা। কারণ অসীম সুপ্ত চাহিদাকে (Latent Demand) প্রকৃত চাহিদায় রূপান্তর করার জন্য কোম্পানিগুলোর অক্রেতাসমগ্রের বিষয়ে পূর্ণ ধারণা থাকা দরকার এবং ওই ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ক্রেতাসমগ্রকে রূপান্তর করে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সফলতা অর্জন সম্ভব। তাই বাজারজাতকারীকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে অক্রেতাসমগ্রের ওপর। W. Chan Kim ও R. Mauborgne তাদের ‘Blue Ocean Strategy’ নামের গবেষণামূলক গ্রন্থে এ বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হয়, ক্রেতাদের সন্তুষ্টির নিমিত্তে একাধিক চলকের ওপর ক্রেতাসমষ্টিকে বিভক্তির মাধ্যমে একটি পরিশুদ্ধ ক্রেতাগোষ্ঠী গঠন করা দরকার; যাতে ওইসব সুনির্দিষ্ট ক্রেতার চাহিদামাফিক পণ্য তৈরি বা সেবা প্রদান সম্ভব হয়। এভাবে ক্রেতাদের বিভক্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় সূক্ষ্ম বিভক্তীকরণ (Finer Segmentation) কৌশল। কিন্তু আধুনিক বাজারজাতকারীরা মনে করেন, সূক্ষ্ম বাজার বিভক্তীকরণের মাধ্যমে যে সবসময় ভালো ফল পাওয়া যাবে, তা নয়। কখনো কখনো বাজার অবিভক্তীকরণ (Market Desegmentation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবসায়িক সফলতা আসতে পারে।

তারা মনে করেন, সূক্ষ্ম বাজার বিভক্তীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজারকে আকারে ছোট করা হয়। তাই এ ধরনের বাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদে বড় মাপের ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। বরং ক্রেতাসাধারণের মৌলিক (Generic) বা সমজাতীয় (Common) চাহিদার ওপর ভিত্তি করে অবিভক্তীকরণ কৌশলের মাধ্যমে বাজারের আয়তন বড় করে ব্যবসায়িক সফলতা আনা সম্ভব। তাই এখন মনে করা হয়, কোম্পানিগুলোকে অবিভক্তীকরণ কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার; বিভক্তীকরণ কৌশলের ওপর নয়। হার্ভার্ড অধ্যাপক Theodore Levitt ১৯৮৩ সালে ‘Harvard Business Review’তে প্রকাশিত ‘The Globalization of Markets’ নামের নিবন্ধেও মত প্রকাশ করেন যে, ক্রেতাসাধারণের সমজাতীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দেশী বাজারকে বিশ্ববাজারে রূপান্তর করে ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

ঐতিহাসিকভাবে মনে করা হয়, পণ্যের এককপ্রতি খরচ কমানোর নিমিত্তে কোম্পানিগুলোকে গণউৎপাদন ও গণবণ্টনে (Mass Production and Mass Distribution) নিয়োজিত থাকা উচিত। এতে খরচ কমানো সম্ভব হলেও সব ক্রেতাকে একই পণ্য দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব নয়। তাই বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতাদের বিভিন্ন পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য ও সেবা উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ করে। যাকে বলা হয় Customization। এ কৌশলের কারণে ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো পণ্য পেতে পারেন। তবে তাদের তা কিনতে হয় উচ্চমূল্যে। কারণ প্রত্যেক ক্রেতার জন্য আলাদা করে পণ্য উৎপাদন করলে তার উৎপাদন খরচ বেশি হয়।

আধুনিক বাজারজাতকারীরা গণ-উৎপাদন ও Customization-এর সুবিধা একসঙ্গে পাওয়ার জন্য প্রয়োগ করছেন নতুন কৌশল, যার নাম Mass-Customization। এ প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রযুক্তি। এ ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে কোম্পানিগুলো ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী গণভাবে পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে, যাতে এককপ্রতি খরচ কম হয়। আবার বিক্রির সময় তারা প্রত্যেক ক্রেতার চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্রেতার কাছে বিক্রি করেন, যাতে ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়। একসময় বলা হতো, বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা বাজারজাতকরণে লিপ্ত। কিন্তু আজকের দিনে বলা হচ্ছে, বাজারজাতকারীরা ‘অভিজ্ঞতামূলক বাজারজাতকরণ’ (Experiential Marketing)-এ নিয়োজিত।

কোম্পানিগুলো শুধু উন্নত পণ্য সৃষ্টি বা সেবা প্রদানের মধ্যে কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখে না। বরং তারা এক ধাপ এগিয়ে পণ্য বা সেবার বিশেষ গুণাবলির মাধ্যমে ক্রেতার মধুর অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করার কাজে লিপ্ত থাকে। ক্রেতার মধুর অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলো জানার চেষ্টা করে, কতভাবে একজন ক্রেতা কোম্পানির সংস্পর্শে আসতে পারে, যাতে এসব সংস্পর্শক কেন্দ্রগুলোর (Touch Points) মাধ্যমে ক্রেতাদের মধুর অভিজ্ঞতা দেয়া সম্ভব হয়। দক্ষ ও অগ্রগামী কোম্পানিগুলো আরো এক ধাপ এগিয়ে নতুন নতুন সংস্পর্শক কেন্দ্র সৃষ্টি এবং এগুলোর মাধ্যমে ক্রেতাদের মধুর অভিজ্ঞতা দেয়ার কাজে নিয়োজিত। পণ্য বা সেবার সঙ্গে ক্রেতার মধুর অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাজারজাতকারীরা নতুন নতুন বাজারজাতকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যাতে ক্রেতাদের ব্র্যান্ডের সঙ্গে বেশি সংশ্লিষ্ট করা সম্ভব হয়।

একসময় মনে করা হতো, ব্র্যান্ড সৃষ্টি করার নিমিত্তে কোম্পানিগুলোকে শুধু ভালো ব্র্যান্ড উপাদান নির্বাচন, পণ্য বা সেবার দৃশ্যমান গুণাবলি (Tangible Benefits) বাড়ানো এবং বিজ্ঞাপনকাজে মনোযোগী হওয়া দরকার। এসব কর্মকাণ্ড কেবল একটি পণ্য বা সেবার ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারে। আধুনিক বাজারজাতকারীরা মনে করেন, ব্র্যান্ড সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে বড় উপাদানগুলো অদৃশ্যমান (Intangible), মনস্তাত্ত্বিক (Phycological) ও প্রতীকী (Symbolic)। তারা বিশ্বাস করেন, ব্র্যান্ড শুধু নাম, লোগো (Logo), ট্রেডমার্ক (Trademark) ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ব্র্যান্ড হচ্ছে প্রত্যক্ষকরণ (Perception), অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সমষ্টি, যা একটি পণ্য বা সেবাকে অন্য পণ্য বা সেবা থেকে আলাদা করে। এ কারণে তারা ব্র্যান্ড সৃষ্টির জন্য পণ্য বা সেবার দৃশ্যমান গুণাবলির চেয়ে অদৃশ্যমান গুণাবলির ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করছে। তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে পণ্য বা সেবাকে বিভিন্ন উপাদান বা উৎসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে।

ক্রেতার জ্ঞান কাঠামোর (Knowledge Structure) নতুন মাত্রা সংযোজনের মাধ্যমে ব্র্যান্ড সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে। তারা শুধু বিজ্ঞাপন ব্যবহার না করে সমন্বিত বাজারজাতকরণ যোগাযোগের (Integrated Marketing Communication) হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করছে। তারা পণ্য বা সেবার ব্র্যান্ড সৃষ্টির জন্য প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডকেও কাজে লাগাচ্ছে। পরিণত বাজারজাতকারীরা বিশ্বাস করেন, কোম্পানির সব কর্মকাণ্ড পণ্য বা সেবার ব্র্যান্ডকে ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তারা ব্র্যান্ড সৃষ্টির জন্য গ্রহণ করছে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। আধুনিক বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উপলব্ধি করছে বিজ্ঞাপন, বিক্রয় প্রসার (Sales promotion) ইত্যাদি বিক্রি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এ কারণে তারা বিক্রি বৃদ্ধির জন্য আবিষ্কার করছে নতুন নতুন কৌশল। এর মধ্যে একটি হলো Buzz Marketing। এর মাধ্যমে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান সন্তুষ্ট ক্রেতাদের দিয়ে তাদের কমিউনিটির মধ্যে মৌখিক কথার (Word of Mouth) মাধ্যমে পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠানের ভালো দিক বা তাদের এ-সংক্রান্ত সুমধুর অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে। এর মাধ্যমে বাজারজাতকারী পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালো ধারণা সৃষ্টি করে বিক্রি বাড়াতে বা প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান অবশ্য ক্রেতাদের এ কাজে উত্সাহিত করার জন্য কিছু আর্থিক বা অনার্থিক সুবিধা দিতে পারে। অগ্রগামী বাজারজাতকারীরা আরেক ধাপ এগিয়ে ব্যবহার করছে Buzz Marketing-এর নতুন সংযোজন Viral Marketing। যেখানে ক্রেতা Buzz Marketing-এর কাজগুলো ইন্টারনেট ব্যবহার করে ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ফেসবুক (Facebook), টুইটার (Twitter), লিংকডইন (Linkedin) ইত্যাদির মাধ্যমে করে থাকে।

মোটকথা, বাজারজাতকরণ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তিত জটিল পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবিরতভাবে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করে চলছে। এসব কৌশল উদ্ভাবন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের অন্য শাখাগুলোর বিভিন্ন পদ্ধতি ও কলাকৌশল। তাই আধুনিক বাজারজাতকরণে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা, পরিবর্তন হচ্ছে বাজারজাতকরণের গতিপ্রকৃতি, আসছে অভিনবত্ব ও নতুনত্ব।

এ কারণে এটা বলা মুশকিল, আজকের বাজারজাতকরণ আগামী দিনে কোন জায়গায় অবস্থান করবে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, আধুনিক বাজারজাতকরণের প্রচলিত তত্ত্ব, পদ্ধতি ও কৌশলের সম্ভাব্য পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংশোধন বা বর্জন অবশ্যম্ভাবী। শুধু সময় বলে দেবে, এটি কখন ঘটবে। তাই প্রতিষ্ঠানের সফলতা নিশ্চিত করার জন্য বাজারজাতকরণে এ ধরনের ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্যে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাপ খাইয়ে নেয়া জরুরি।

লেখক: অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
তথ্যসূত্র: বানিকবার্তা ডটকম।

Check for details
SHARE