করতে চাইলে শিপিং লাইন বিজনেস!

শিপিং হচ্ছে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো শিল্পখাতের মধ্যে একটি। শিপিংকে শুধুমাত্র জাতীয় দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করলে চলবে না বরং একে দেখা উচিত আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজের উন্নয়নের অগ্রদুত হিসেবে। শিপিং ব্যবসা সম্পর্কে জানতে আমাদের বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কেও ভালো ধারনা থাকতে হবে। শিপিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি মৌলিক উপাদান – কারন এর মাধ্যমে আমরা কমখরচে পণ্য একস্থান থেকে অন্যস্থানে পাঠাতে পারি।

এই শিল্পখাত না থাকলে বিশ্বের সকল দেশ নিজেরা নিজেদের মধ্যে কোনঠাসা পরিস্থিতির মধ্যে থাকতো। কারন একজনের উৎপাদিত পণ্য অন্যরা ব্যাবহার করতে পারতো না। ’গ্লোবাল ভিলেজ’ বলে এখন যে বিশ্ব ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার উদ্ভব কখনোই সম্ভব হতো না।

শিপিং ব্যবসার চাহিদা: পণ্যের চাহিদার সাথে তালমিলিয়ে শিপিং এর চাহিদা বেড়ে চলে। অর্থনীতিবিদরা তাই শিপিং ব্যবসাকে ”চাহিদা তাড়িত” বলে সম্বোধন করেছেন। কোন স্থানে নির্দ্দিষ্ট পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হলেই সেখানে পণ্যটি পাঠানোর প্রয়োজন পড়বে।

ব্যবসায়ীরা তাদের মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে কোথায় কোন পণ্যের চাহিদা বাড়বে তা খুঁজে বের করেন, এবং পণ্যের উৎপাদন স্থল থেকে পণ্যের চাহিদার বাজারে তা বয়ে নিয়ে যান। এবং সবচেয়ে কম খরচে এই কাজটি করে দেয় শিপিং। পণ্য পরিবহনের জন্য শিপিং কোম্পানী ভাড়া বা ফ্রেইট পেয়ে থাকে। পন্যটি যিনি পাঠান তিনি হচ্ছেন ’শিপার’ বা ’কনসাইনর’ এবং পন্যটি যিনি গ্রহন করেন তিনি হচ্ছেন ’কনসাইনি’।

শিপিং ব্যবস্থা: আগেই যেমন বলেছি, পণ্যের উৎপাদন স্থল থেকে চাহিদার স্থলে পণ্যটিকে অক্ষত অবস্থায় পরিবহন করে নিয়ে যাওয়াই শিপিং কোম্পানির কাজ। এর জন্য কাজ করে এক বিশাল কর্মীবহিনী যারা সকল ধরনের পরিবহন বা অন্যান্য আনুসাঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিত করে। একটি পরিবহন ব্যবস্থা তিনটি উপাদানকে ঘিরে বেড়ে উঠে:

১. পোর্ট বা টার্মিনাল এর মতো নির্দিষ্টি অবকাঠামো। ২. শিপ বা বার্জ (ছোট জাহাজ, সাধারনত নদীতে চলে) এর মাধ্যমে পোর্ট/টার্মিনাল গুলোতে মালামাল আনা নেওয়া করা। ৩. এসব পরিবহন এবং পোর্ট/টার্মিনাল যাতে কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যাতে কাজ করে দক্ষ কর্মীবহিনী।

শিপিং হচ্ছে এমন এক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা যা আসলে সমুদ্রের মধ্যে জালের মতো বিছানো বিভিন্ন রুট, যা শেষ হয়েছে নির্দিষ্ট পোর্টে। তাই আবারো বলতে হয় শিপিং সার্ভিসের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম যেমন, পোর্ট অবকাঠামো, জাহাজের অপারেশনস পরিচালনা এবং অফিস ব্যবস্থাপনা।

শিপিং ব্যবসায় কারা জড়িত: পন্যের প্রেরক (শিপার) তার পণ্য এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পরিবহনের জন্য শিপিং কোম্পানীর কাছ থেকে সেবা প্রত্যাশা করে। আমদানীকারক, রপ্তানীকারক, প্রেরক, প্রাপক নির্বিশেষে কনসাইনি ও কনসাইনর যে কেউ শিপিং সেবা চাইতে পারে এবং শিপিং কোম্পানীর সংগে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে।

এই ব্যবসার সংগে অনেক ধরনের স্বার্থভোগী জড়িত থাকতে পারে যেমন:
জাহাজের মালিক: যিনি জাহাজটি ক্রয় করেছেন, এর ভাড়া দেবার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোন ধরনের জাহাজ, কতদামে ক্রয় করা দরকার তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

জাহাজ প্রস্তুতকারক: যিনি নতুন জাহাজ তৈরী করেন এবং জাহাজের মালিকের কাছে বিক্রয় করেন।
জাহাজ ভাঙ্গারী: যিনি জাহাজের মালিকের কাছ থেকে পুরনো জাহাজ ক্রয় করেন এবং জাহাজটিকে ভেঙ্গে এর লোহা ও যন্ত্রপাতি আবার বিক্রি করে।

টার্মিনাল অপারেটরস: যিনি জাহাজ বন্দরে ভেড়নো এবং মালামাল ওঠানামার ব্যাপারে সব ধরনের কাজ করে থাকে।
মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট অপারেট্রস: জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী তার গুদামে পৌছে দেয়াই হচ্ছে এদের কাজ।

শিপিং ব্যবসায় আরো কিছু পক্ষ জড়িত থাকে:
শিপিং এজেন্ট: এই প্রতিষ্ঠান জাহাজের মালিক বা ভাড়াটিয়ার পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে জাহাজ বন্দরে ভিড়লে প্রয়োজনীয় পারমিশন, অপারেশন্স পরিচালনা এবং জাহাজ ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত সকল কাজ সুচারু রুপে সম্পন্ন করবে।

চার্টারার: যে নির্দ্দিষ্ট সময়ের জন্য জাহাজ ভাড়া নেয় এবং পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে আয় করে সেই ভাড়া মেটায়।
শিপব্রোকার: একধরনের মধ্যস্বত্বভোগী যিনি জাহাজের মালিক ও চার্টারার অথবা, আমদানী ও রপ্তানীকরকের মধ্যে মধ্যস্থতা করে দেন।
কমন ক্যারিয়ার: ট্রান্সপোর্ট অপারেটর যিনি নির্দ্দিষ্ট ভাড়ার ভিত্তিতে সাধারনের কাছে জাহাজের অংশ ভাড়া দেয়।

নন ভেসেল অপারেটিং কমন ক্যারিয়ার (এন.ভি.ও.সি.সি): জাহজের অপারেটর যার নিজের জাহাজ নেই কিন্তু অন্যের জাহাজের শিপিং সার্ভিসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে অর্থ উপার্জন করেন।

এবার আমরা আলোচনা করবো জাহাজের সার্ভিস গুলোর ধরন সম্পর্কে। অবস্থা ভেদে দু’ ধরনের শিপিং সার্ভিস পাওয়া যায়, তা হচ্ছে ১. ট্র্যাম্প শিপিং সার্ভিস এবং লাইনার শিপিং সার্ভিস।

১.ট্র্যাম্প শিপিং সার্ভিস : এধরনের শিপিং সার্ভিস সুবিধাজনকভাবে এবং কম খরচে এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য পরিবহন করে। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে গ্রাহকের সুবিধা অনুযায়ী মালামাল নিয়ে যায়। যে কোন ধরনের জাহাজ এ ধরনের সেবা দিতে পারে। এ ধরনের সেবায় নির্দ্দিষ্ট সিডিউল মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নেই।

সাধারনত বিপুল পরিমানে (বাল্ক) এবং শুকনো পণ্য পরিবহনে এই সার্ভিস ব্যবহ্রত হয়। এক বা একাধিক পোর্ট থেকে এরা পন্য সংগ্রহ করে এবং একাধিক পোর্টে সে পন্য পৌছে দিতে পারে। তারা জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এবং পন্য সংগ্রহ করে। ট্র্যাম্প শিপিং এ একসংগে একজন শিপারের পণ্য পরিবহন করা হয়।

ভাড়ার বিনিময়ে শিপিং কোম্পানীর কাছ থেকে এই সেবা পাওয়া যায়। তবে পণ্য পরিবহনের শর্ত একেক কনসাইনমেন্টে একেক রকমের হতে পারে। পুরোটাই নির্ভর করে গ্রাহক এবং শিপিং কোম্পানীর উপর। ট্র্যাম্প শিপ যে সব বাল্ক পন্য পরিবহন করে তা সাধারনত: শিল্পকারখানার কাচাঁমাল, খাদ্য শস্য ইত্যাদি ।

বাল্ক পণ্যকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। শুকনো পণ্য এবং তরল পণ্য। তরল পণ্য পরিবহনের জণ্য যে জাহাজ ব্যবহৃত হয় তাকে ট্যাংকার বলে। সাধারনত তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে তৈরী এসব ট্যাংকার ব্যবহৃত হয়। তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বহনের জন্য এলপিজি ট্যাংকার এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বহনের জন্য এলএনজি ট্যাংকার ব্যবহৃত হয়।

পণ্য পরিবহনের ধরন অনুসারে ট্যাংকারগুলোর ডিজাইনেও তারতম্য ঘটে। শিপিং সার্ভিসে জাহাজ যতো বড়ো হবে পণ্য পরিবহনের ইউনিট মূল্য ততো কম হবে। তাই খাদ্য শস্য, তেল বা শিল্পের কাচাঁমাল পরিবহনে ট্র্যাম্প সার্ভিস কমদামে পন্য পরিবহনের সুযোগ করে দেয়।

২. লাইনার শিপিং সার্ভিস: নির্দিষ্ট রুট এবং নির্দিষ্ট সময় মেনে নিয়মিত শিপিং সার্ভিস দেয়াই হচ্ছে লাইনার সার্ভিসের বৈশিষ্ঠ। এই সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পূর্বপ্রকাশিত শিডিউল অনুযায়ী বন্দর ছেড়ে যায় এবং গন্তব্যে গিয়ে পৌছে। পণ্য পরিবহনের জন্য নির্দ্দিষ্ট আইন কানুন মেনে চলতে হয়। একেকটি ভয়েসে অসংখ্য শিপারের পণ্য থাকে এবং সব পণ্যই কন্টেইনারের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।

লাইনার সার্ভিসে সাধারনত:প্রস্তুতকৃত পন্য অথবা আধা প্রস্তুতকৃত পণ্য পরিবহন করা হয়। যেমন আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের তৈরী পোষাক, লাইনার সার্ভিসের আওতায় কন্টেইনারের মাধ্যমে পরিবহন হয়। কোন কোন শিপিং লাইন মাত্র ১৫/১৬ দিনে চট্রগ্রাম থেকে ইউরোপে পণ্যটি পৌছে দেয়।

যেহেতু এই পণ্যটি অত্যান্ত ”টাইম সেনসেটিভ” (ফ্যাশন হাউসেরে প্রতিযোগিতার কারনে গন্তব্যে পৌছানোর সময়ের ব্যাপারে স্পর্শকাতর) তাই শিপিং কোম্পানীকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়ে। মাত্র কয়েকদিনের দেরিতে পণ্যটি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পরাজিত হতে পারে।

লাইনার সার্ভিসে যে সব জাহাজ ব্যবহৃত হয় তা ট্র্যাম্প সার্ভিসের জাহাজ থেকে অনেক উন্নতমানের এবং মূল্যবান। কারন এগুলোর তৈরীর খরচ এবং অপারেটিং কষ্ট বেশী। জাহাজগুলোতে কন্টেইনার গুলো সঠিকভাবে সংকুলানের জন্য প্রয়োজনীয় খোপ তৈরী করা হয়।

যেহেতু এক জাহাজে অনেক গ্রাহকের পণ্য থাকে এবং বিভিন্ন বন্দরে কন্টেইনার খালাস ও লোড করতে হয় তাই, এই সার্ভিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অনেক দক্ষ হতে হয় । তানা হলে এই জটিল সার্ভিস, সহজেই ভেঙ্গে পড়ে। আর সেকারনে এই সর্ভিসে পণ্য পরিবহন করতে চাইলে গ্রাহককে বেশী অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়ন ও শিপিং: উনিশ শতকে অর্থনৈতিক উন্নতির পথ ধরে বিশ্বে শিপিং ব্যবসার বিকাশ ঘটতে থাকে। এসময়ে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়, ফলে বিশ্বে মালামাল পরিবহন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। যার ফলে সমুদ্র পথে কম খরচে পণ্য আনানেওয়ার পরিমানও বৃদ্ধি পায়।

বিংশ শতাব্দিতে পশ্চিমা বিশ্ব, ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়। এরফলে শিল্প পণ্য ইউরোপ থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে সারা বিশ্ব থেকে শিল্পের কাচাঁমাল ইউরোপে পৌছে যায়। তবে কোন কিছুই স্থায়ী নয়। ব্যবসা বাণিজ্যের প্যাটার্ন সবসময় পরিবর্তিত হতে থাকে। পশ্চিমা বিশ্ব এখন উন্নত প্রযুক্তির হাইটেক পণ্য বেশী বানাচ্ছে, যাতে শিপিং এর প্রয়োজন খুবই সীমিত।

কিন্ত চীন ও ভারত ম্যানুফ্যাকচারিং এ বিশ্বে সব দেশ থেকে এগিয়ে আছে। সেকারনে দেশ দু’টি শিপিং এরও বড়ো ভোক্তা। বাল্ক জাহাজের মাধ্যমে চীন কাচাঁমাল আমদানী করে এবং তা দিয়ে তৈরী ফিনিশড পণ্য, কন্টেইনারের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে পরিবহন করে।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে উন্নয়নশীল দেশ সমূহে আমদানী-রপ্তানীর হার বেশী। দক্ষিন কোরিয়া ও জাপানে প্রচুর কয়লা আমদানী হয়, চীন আকরিক লোহা আমদানীতে অগ্রগন্য। চীনে সারা পৃথিবীর চার ভাগের একভাগ ষ্টিল উৎপাদন হয় তার পরেও দেশটি বিশ্বের ৩৬ শতাংশ আকরিক লোহা আমদানী করে। অন্যদিকে এশিয়া থেকে কন্টেইনারে রপ্তানীর হার চীন একাই বাড়িয়ে দিয়েছে। এক গবেষনায় বলা হয়েছে আমেরিকা, চীন থেকে তাদের পন্য আমদানী ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে ।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিপিং: অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংগে শিপিং ব্যবসার একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু সবধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডই যে শিপিং ব্যবসাকে প্রভাবিত করবে তা নাও হতে পারে। যেমন, কৃষি, খনিজ দ্রব্য আহোরন এবং শিল্পাৎপাদন এসবের সংগে আমদানী-রপ্তানীর সম্পর্ক আছে। আর সেকারনে এর সংগে শিপিং এর যোগ সূত্র আছে।

অন্যদিকে টেলিকমিউনিকেশনস এবং সেবা খাতের সংগে শিপিংএর প্রভাব খুব কমই। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে অর্থনীতি যখন উন্নতি করতে থাকে তখন শিল্পর পরিবর্তে সেবা খাতের বিকাশ লাভ করতে থাকে। বর্তমান বিশ্বে বিকাশমান সফ্টওয়্যার শিল্প, শিক্ষা, বায়োটেকনলজি, পর্যটন, ব্যাবসায় সেবা এসব শিল্পের প্রসারে শিপিং এর খুব কম চাহিদাই আছে।

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম প্যাসেজ: আন্তর্জাতিক ব্যবসা বানিজ্যের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে পৃথিবীর ভৌগলিক অবস্থা সম্পর্কে ধারনা থাকতে হবে। কারন সামুদ্রিক যোগাযোগের পুরোটাই নির্ভর করে পোর্ট সমূহের ভৌগলিক অবস্থানের উপর। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম রুট বিভিন্ন প্যসেজ, খাল এবং অন্তরীপের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত।

এসব রুট সাধারনত: প্রধান অর্থনৈতিক এলাকা যেমন পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বিশেষ করে আন্তার্জিক শিপিং ব্যবসাকে সহজ করেছে এসব প্যসেজ। এগুলো না থাকলে জাহাজের ভাড়া এবং পরিবহন সময় উভয়ই বেড়ে যেতো। এসব প্যসেজ ব্যবহার করতে গেলে নির্দিষ্ট পরিমানে সারচার্জ দিতে হয়। তাই শিপিং ব্যবসা পরিচালনায় আপনাকে এগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা রাখতে হবে। অলোচনা বুঝতে একটা বিশ্ব মানচিত্র সংগে রাখতে পারেন।

পানামা খাল: পানামা খাল প্রায় ৮০ কিলোমিটার লম্বা। এই খাল আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করেছে। উত্তর এবং দক্ষিন আমেরিকার মধ্যে একটি অন্ত্যন্ত সরু অঞ্চলকে কেটে জাহাজ চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। এই খাল যখন ছিলো না তখন প্রশান্ত মাহাসাগর থেকে কোন জাহজকে আটলান্টিকে আসতে হলে পুরো দক্ষিন আমেরিকা অর্থ্যাৎ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ঘুরে আসতে হতো।

আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পানির স্তরের ভিন্নতা থাকায় জাহাজ পারাপারের জন্য একটি কম্পার্টমেন্টের মধ্যে জাহাজটিকে নেয়া হয়। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী কম্পার্টমেন্টের পানির উচ্চতা বাড়ানো অথবা কমানো হয়। তারপর সমুদ্র স্তরের সংগে কম্পার্টমেন্টের পানির উচ্চতা সমান হলে জাহাজটিকে টেনে সমুদ্রে নিয়ে আসা হয়।

এই খাল দিয়ে আমেরিকার মোট আমদানী রপ্তানীর ১২ শতাংশ পন্য চলাচল করে। একটা অসুবিধা আছে এখানে। বেশী বড় জাহাজ এই খাল দিয়ে পার করা যায় না। নির্দিষ্ট সাইজের জাহাজই এখান দিয়ে চলাচল করতে পারে। এই জাহাজকে বলা হয় ”পানাম্যাক্স শিপ”। আমরা যখন জাহাজের সাইজ সম্পর্কে আলোচনা করবো তখন এবিষয়ে বিস্তারিত কথা হবে।

সুয়েজ খাল: সুয়েজ খাল মিশরে অবস্থিত। এটি প্রাকৃতিক কোন খাল নয়। প্রকৌশলীরা ডিজাইন করে এই খাল খনন করেন। এটি ভুমধ্য সাগরীয় অঞ্চল (মেডিটারিয়ান সী) সুয়েজ উপসাগর ও লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল ১৬৩ কিলোমিটার লম্বা এবং ৬০ মিটার চওড়া।

পৃথিবীর তাবৎ আধুনিক জাহাজ দ্রৃততার সংগে এই খাল দিয়ে আটলান্টিক থেকে ভারত মহাসাগরে আসা যাওয়া করতে পারে। মিশর সরকার্রে এই খাত থেকে সবচেয়ে বেশী অর্থ আয় হয়। মেডিটারিয়ান সী এবং সুয়েজের পানি একই উচ্চতায় হওয়ার কারনে এখানে কোন বাড়তি পকেট তৈরী করার দরকার হয়নি। জাহজগুলো তাই বিনা বাধায় চলাচল করতে পারে।

এই খাল তৈরীর ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার সংগে এশিয়ার দুরত্ব অনেক কমে গেল। আগে ”ট্রগ্রাম থেকে ইউরোপে পন্য নিতে চাইলে পুরো আফ্রিকা মাহদেশ পার হয়ে আটলান্টিকে পৌছে তারপরে ইউরোপ যেতে হতো। কিন্তু এখন আরব সাগর পার হয়ে সুয়েজ পেরিয়ে আটলান্টিকে পৌছে যাচ্ছে। সেকারনে আমাদের গার্মেন্টস পণ্য মাত্র ২০/২৫ দিনে ইউরোপে পাঠানো যায়।

মালাক্কা প্রনালী: ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে এই প্রনালী সংযুক্ত করেছে। মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে এটি অবস্থিত। এর শেষ মাথায় সিংগাপুর পোর্ট এর অবস্থান। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ত প্রনালী। এই প্রনালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ জাহাজ যাতায়াত করে। এটি ৮০০ কিলোমিটার লম্বা এবং অবস্থান ভেদে প্রস্থ ৫০ থেকে ৩২০ কিলোমিটার এবং গভীরতা সর্বনিম্ব ২৩ মিটার।

হরমুজ প্রনালী: পার্শিয়ান গাল্ফ এবং ভারত সাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই প্রনালী মাত্র ৬ কিলোমিটার পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারে। ইরান এবং ওমানের মাঝখানে এই প্রনালী অবস্থিত। বিশেষ করে সারা পৃথিবীর তেল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। উন্নত দেশসমুহ ,বিশেষ করে আমেরিকা সবসময় চিন্তিত থাকে এই প্রনালীটি নিয়ে । ইরান যদি এই পথ দিয়ে তেল নিতে না দেয়, তবে তাকে মহাবিপদে পড়তে হবে।

শিপিং ইন্ডাষ্ট্রির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: হাজার বছর ধরে ব্যবসা বাণিজ্যে জাহাজের ব্যবহার চলে আসছে, কিন্তু আমরা আজ সমুদ্রে যে জাহাজ চলতে দেখি তা গত দেড়শ বছরের প্রযুক্তিগত ও পেশাগত উৎকর্ষতার ফসল।

প্রচীনকালে কাঠের তৈরী জাহাজের প্রচলন ছিলো। সে সময় জাহাজে পাল খাটিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নাবিকেরা জাহাজ নিয়ে যেতেন। গন্তব্যে পৌছানো পুরোটাই নির্ভর করতো আবহাওয়ার উপর। আমাদের রুপকথায়, বনিকের সপ্তডিঙ্গা নাও এর কথা কার না মনে আছে। আজকাল অনেক গবেষক বলছেন, কাঠের তৈরী জাহাজ প্রাচীনকালে বাংলদেশেও তৈরী হতো এবং তা বিদেশে রপ্তানী হতো। বিশেষ করে চট্রগ্রামে এবং নোয়াখালির উপকুল অঞ্চলের কিছু মানুষ এবিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল।

কাঠের জাহাজ ঝড় ঝঞ্ঝায় খুব নাজুক হওয়ায় বিকল্প হিসেবে উনিশ শতকে শুরু হলো জাহাজ তৈরীতে লোহার ব্যবহার। লোহা ভাসিয়ে জাহাজ বানানো যায় একথা প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করেনি। আর্কিডিমিসের সূত্র মেনে (পানির পল্বতা সূত্র) লোহাকে ব্যবহার করে জাহাজ তৈরী শুরু হলে, এই শিল্পখাত নতুন জীবন পায়। ধীরে ধীরে লোহার পরিবর্তে ইস্পাতের ব্যবহার শুরু হয়। ইস্পাতের তৈরী জাহাজ প্রথম পানিতে ভাসে ১৮৭৭ সালে।

ইউরোপে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন এর পথ ধরে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে, এর ধাক্কা শিপিং ইন্ডাষ্ট্রিতেও এসে লাগে। বাষ্পচালিত জাহাজ শিপিং ব্যবসাকে অন্য এক উ”্চতায় পৌছে দেয়। তবে প্রথম যাত্রাটি তেমন একটা লাভজনক ছিলো না। প্রথম বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত জাহাজ এস.এস. হিন্দুস্তান ২০০ টন পণ্য বহন করেছিল, কিন্তু তাতে জ্বালানী (কয়লা) লেগেছিল ৫০০টন।

বাষ্পচালিত জাহাজের উন্নয়ন খুব একটা দ্রুত হয়নি। কারন যন্ত্রের উচ্চমূল্য এবং সাধারন জাহাজ খুব কমমূল্যে পণ্য পরিবহন করতে পারতো, তাই প্রতিযোগিতা ছিল প্রবল। তবে ইঞ্জিন চালিত জাহাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী পণ্য পৌছে দিতে পারতো। প্রাথমিক সময়ে ইঞ্জিন চালিত জাহাজে মালামাল পরিবহনের চেয়ে যাত্রী পরিবহন বেশি লাভজনক ছিলো।

মার্চেন্ট শিপিংএর উন্নয়নে ওয়ারল্যেস তারবার্তা যথেষ্ট অবদান রেখেছে। ইলেক্ট্রনিক এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের এই যুগে এটা কল্পনাও করা যাবে না জাহাজ থেকে টুকটুক শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে কীভাবে বিদেশী কাষ্টমার এবং অন্য জাহাজের সংগে তাৎক্ষনিক যোগাযোগ করতে হতো। আর এই ব্যবস্থা শিপিং ব্যবসায় ব্যাপক সুবিধা এনে দিয়েছিল। ১৯৯০ সালে ”গ্লোবাল মেরিটাইম ডিসট্রেস এন্ড সেফটি সিসটেম” কনভেনশনে প্রতিটি জাহাজে রেডিও এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হলো। এরমাধ্যমে সমুদ্রের মধ্যেও জাহাজ থেকে ই-মেইল যোগাযোগ করা সম্ভব হলো।

ইতিমধ্যে আমরা আলোচনা করেছি সুয়েজ খাল এবং পানামা খাল সম্পর্কে। এদুটো খালের নির্মান এবং বিভিন্ন দেশে পোর্টের নির্মান শিপিং ব্যাবসাকে আরো গতিশীল করেছে। সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে দুরত্ব কমে গেল। ফলে সমুদ্রপথে হঠাৎ করে অনেক জাহাজ উদ্বৃত্ত হয়ে পড়লো। এতে জাহাজের ভাড়া কমে যেতে থাকলো।

কারন সাবাই একই কাষ্টমারের পেছনে ছুটতে থাকলো। এরপর লোকসান কমাতে শিপিং কোম্পানীগুলো, ১৮৭৫ সালে প্রথম লাইনার কনফারেন্স করতে বাধ্য হলো। শিপিং পরিভাষায় কনফারেন্স হচ্ছে একধরনের সিন্ডিকেট। অর্থাৎ সবাই নির্দিষ্ট, বাড়তি ভাড়ায় পন্য পরিবহন করে।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে যাত্রীবাহি জাহাজের উৎকর্ষতাও বৃদ্ধি পেল। টাইটানিক (১৯১২) এবং কুইন মেরী (১৯৩৬) এর মতো জাহাজে ভ্রমন করা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাড়ালো। অবশ্য টাইটানিকের দুর্ভাগ্যের কথা কে না জানে ? এসময়ে কয়লার পরিবর্তে বাষ্পীয় ইঞ্জিনে জ্বালানী হিসেবে তেলের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৩০ সাল থেকে জাহাজে ডিজেলের ব্যবহার শুরু হয়। তবে ১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত ট্র্যাম্প জাহাজে কয়লার ব্যবহার হতে দেখা গেছে।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ, জাহাজ শিল্পের উপর বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করে। এই যুদ্ধে সাবমেরিনের অত্যাধিক ব্যবহারের ফলে অনেক পণ্যবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্থ হয় অথবা ডুবে যায়। এতে ইন্ডাষ্ট্রিতে জাহাজের ঘাটতি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১০ হাজার টন পণ্য বহন করতে পারে এমন ছোট ছোট জাহাজ কমসময়ে তৈরী হতে থাকে।

এই জাহাজ গড়ে ১০ নটিক্যাল মাইল বেগে চলতে পারতো। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও এর কদর রয়ে যায় । তবে ১৯৫০ এর পর বিশ্ব বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারের ফলে বড় জাহাজের প্রয়োজনীয়তা আবার দেখা দেয়। কারন জাহাজ বড় হলে পন্য পরিবহনে খরচ কম হয়, ভাড়াও কম রাখা যায়। এসময়ে বিমান সর্ভিসের ব্যাপক উন্নতির ফলে যাত্রীবাহি জাহাজের চাহিদা একদম কমে যায়।

জাহাজের গতি বাড়ার সংগে সংগে পরিবহন সময় কমে গেল ঠিকই কিন্তু বন্দরে মাল ওঠানামার সময় অনেক লেগে যাচ্ছিল। শিপিং কোম্পানীর জন্য এটি বড় দুশ্চিন্তার কারন হলো। জাহাজ সমুদ্রে ভাসমান থাকলে অর্থ আয় হয়, কিন্তু ঘাটে বাধা থাকলে তো আর আয় হবে না। বিশেষ করে ম্যানুফ্যকচারড পন্য জাহাজে ওঠানামা করাতে বেশি সময় লাগছিলো।

এ সমস্যার সমাধান হলো ১৯৬০ এর দশকে কন্টেইনারে পণ্য পরিবহন এর মাধ্যমে। এর সূত্র ধরে পোর্ট গুলোতে কন্টেইনার হ্যান্ডিলিংএর বিশেষ যন্ত্র বসানো হলো। জাহাজগুলোকেও সেভাবে তৈরী করা হলো । ১৯৯০ এর দশকে কন্টেইনারবাহী আধুনিক জাহাজ পানিতে ভাসে।

প্রাথমিকভাবে ২ হাজার কন্টেইনার পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও এখন যে কোন মেইন লাইন জাহাজ ৬ থেকে ৮ হাজার কন্টেইনার পরিবহন করতে পারে। সংক্ষেপে এটাই জাহাজ ব্যবসার অগ্রগতির ইতিহাস।

জাহাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা: বানিজ্যিক জাহাজের মালিক হওয়া এবং তা পরিচালনা করার সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু এ ছাড়াও একটি দেশের জন্য জাহাজ পরিচালনা, আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। নীচে তা আলোচনা করছি:

বৈদেশিক মূদ্রা সংরক্ষণ: প্রতিটি দেশকেই আমদানী রপ্তানী করতে জাহাজ ব্যবহার করতে হয়। পণ্য পরিবহনে নিজস্ব জাহাজ না থাকলে অন্য দেশের জাহাজ ভাড়া করতে হয়। এই ভাড়া বৈদেশিক মূদ্রায় দিতে হয় বলে এই খাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমানে অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু দেশটির নিজস্ব জাহাজ থাকলে বৈশিক মূদ্রা নিজের দেশেই থেকে যায়।

জাতীয়তাবাদের পরিচায়ক: কোন একটি দেশের জাহাজ যখন অন্য দেশে যায় তখন সে নিজ দেশের পতাকা জাহাজের মাস্তুলে উড়াতে পারে। ফলে জাহাজটি ঐ দেশকেই প্রতিনিধিত্ব করে । বিশ্বের দরবারে মাথা উচুঁ করে দাড়াতে এর থেকে বড় সুযোগ আর কি আছে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের জাতীয় পতাকাবাহী ”বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন” এখন এক ঠুটো জগন্নাথে পরিনত হয়েছে।

বৈদেশিক মূদ্রা আয়: নিজেদের পণ্য পরিবহন ছাড়াও অন্য দেশের ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহন করেও এখাতে বৈদেশিক মূদ্রা আয় করা সম্ভব হয়। বিশ্বে অনেক দেশ আছে যাদের জাতীয় আয়ের একটা বড় অংশ আসে জাহাজ অথবা পোর্ট সংশ্লিষ্ট খাত থেকে।

কৌশলগত দিক: কোন দেশ যুদ্ধ বিগ্রহে জড়িয়ে পড়লে অস্ত্র, গোলাবারুদ পরিবহনে জাহাজের প্রয়োজন দেখা দেয়। এসময় অন্যদেশের জাহাজ অস্ত্র পরিবহনে অপরাগতা প্রকাশ করলে, নিজস্ব জাহাজের উপর ভরসা করা ছাড়া তখন আর উপায় থাকে না।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালে বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়লে, নিজস্ব জাহাজ থাকার প্রয়োজনীয়তা প্রথম অনুভুত হয়। এধরনের পরিস্থিতি সামনে আরো যে আসবেনা তার নিশ্চয়তা,নেই। তাই, যুক্তরাষ্ট্র এখনো নিজস্ব বহরে বানিজ্যিক জাহাজ বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়িদের বিপুল ভর্তুকি দেয়।

জাহাজের রেজিষ্ট্রেশন: সকল সমুদ্রগামী জাহাজের একটি জাতীয়তা থাকতে হবে। যেমন একজন লোকের বিদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট দরকার, তেমনি একটি জাহাজেরও রেজিষ্ট্রেশন থাকা প্রয়োজন। এথেকে বোঝা যাবে কোনদেশ এই জাহাজের মালিক। একে ”পোর্ট অব রেজিষ্ট্রি” বলা হয়। জাহজের পেছনের অংশে জাহাজের নামের নীচে দেশের নাম উল্লেখ থাকবে।

এছাড়াও সেদেশের জাতীয় পতাকা ছোট মাস্তুলে উড়ানো থাকবে। বড় মাস্তুলে যে দেশে জাহাজটি ভ্রমন করছে সে দেশের জাতীয় পতাকা উড়ানো হবে। একে সৌজন্যমূলক পতাকা বলা হয়।

মালিকের অফিস যে দেশে অবস্থিত সে দেশই হবে পোর্ট অব রেজিষ্ট্রেশন। এতে সে দেশে কোন সামুদ্রিক পোর্ট থাকুক আর না থাকুক তা বিবেচ্য নয়। সুইজারল্যান্ডের নিজস্ব কোন বন্দর নেই। কিন্তু দেশটির নামে অনেক জাহাজের রেজিষ্ট্রেশন রয়েছে।

অবশ্য নিজ দেশের নামে রেজিষ্ট্রি আর্থিক ক্ষতির কারন হিসেবে দেখা দিতে পারে। ধরা যাক কোন জাহাজের মালিকের অফিস লন্ডনে। তার জাহাজের পোর্ট অব রেজিষ্ট্রি হবে যুক্তরাজ্য। যে দেশের নামে জাহাজ রেজিষ্ট্রি করা হবে, সে দেশের নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য থাকতে হবে। দেশের আইন অনুযায়ী ট্যাক্স দিতে হবে। কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, সুযোগ সুবিধা সেদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী হবে। কিন্তু জাহাজটি যদি এমন কোনো দেশে রেজিষ্ট্রি হয়, যেখানে এসব আইন কানুনের তেমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই, তাহলে মোটা অর্থের ট্যাক্স বা বেতন গুনতে হবে না।

এসব ধারনা থেকে পানামা বা লাইবেরিয়ার মতো দেশগুলোতে জাহাজ রেজিষ্ট্রির প্রথা চালু হলো। সেসব দেশের কোন এক আইনজীবীর অফিসে তামার পাত দিয়ে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলেই নিয়মরক্ষা হয়ে গেল। ঐ আইজীবী কম খরচে রেজিষ্ট্রেশনের কাজটি করে দেবে। এ ধরনের রেজিষ্ট্রেশনকে শিপিং পরিভাষায় ’ফ্ল্যাগ অব কনভেনিয়েন্স’ হিসেবে অবহিত করা হয়।

ফ্ল্যাগ অব কনভেনিয়েন্স এর প্রধান সমস্যা হচ্ছে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থার শৈথিল্য। সমুদ্র একটি বিপদজনক জায়গা। এখানে সামান্য ভুলের কারনে বড় বিপদ হতে পারে। এই পদ্ধতিতে নিবন্ধকৃত জাহাজে ক্রুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংগে যথেষ্ট আপোষ করা হতো ফলে অনেক প্রান অকালে ঝড়ে যেতো।

এ সমস্যা নিরসনের জন্য জাতিসংঘ সোলাস কনভেনশন (সেফটি অব লাইফ এট সী) এবং মারপোল (ম্যারাইন পলিউশন) কনভেনশন পাশ করে। প্রথাগত সকল সমুদ্রজাতি এবং ফ্ল্যাগ অব কনভেনিয়েন্স (এফওসি) এর সুবিধা দেয় এমন দেশও এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় অনেক দেশ তাদের জাহাজে কর্মরত কর্মী এবং জাহাজের মালামালের নিরাপত্তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে এই কনভেনশনে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সমুদ্রে কোন খারাপ পতাকার জাহাজ থাকে না, আসলে থাকে খারাপ মালিকের জাহাজ। এমনকি যারা এই কনভেনশনে যোগ দিয়েছে তারাও সবসময় নিরাপত্তার বিষয়গুলো ঠিকঠাক মেনে চলে তা বলা যাবে না।

পরবর্তিতে বিপুল সমালোচনার মুখে এফওসি দেশগুলো জাহাজে নিরাপত্তার ব্যবস্থা কঠোর করতে সচেষ্ট হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ) গঠিত হয়। এটি একটি শ্রমিক ইউনিয়ন এবং জাহজে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন ভাতা, থাকা খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা না থাকলে তারা ঐ জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করতো। এতে জাহাজের মালিকরা চাপের মধ্যে থাকে এবং সংস্থাটির সংগে একটি চুক্তিতে উপনিত হতে বাধ্য হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রন: একদেশের জাহাজ অন্য দেশে গেলে তা ঐ সমুদ্র বন্দরে কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে সংশ্লিষঠ দেশের খুব একটা মাথা ব্যাথা ছিলো না। কারন তারা মনে করতো, এর জন্য সফররত দেশকে তো তারা নির্দ্দিস্ট হারে ফি প্রদান করছে।

বিংশ শতাব্দির শেষ ভাগে নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিষয়ের উপর গুরুত্ব বেড়ে যায়। সচেতন নাগরিকদের চাপের মুখে দেশগুলো বাধ্যহয়ে মনযোগী হয় উপকূলে জাহাজগুলো থেকে কোন দূষন ছড়াচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে। এর মধ্যেদিয়ে পোর্ট ষ্টেট কন্ট্রোলের আবির্ভাব হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে কোন দূষন মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট দেশ জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু দূষনের পরিধি ব্যাপক হওয়ায় নিদ্দিষ্ট দেশের মধ্যে কর্তৃত্ব আর সীমাবদ্ধ রাখা যাচ্ছিল না। কারন কোন সমুদ্রে দূষন ঘটলে তার ফলে আশেপাশের অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পরছিল।

১৯৮২ সালে বেশকিছু ইউরোপীয় দেশ একত্রিত হয়ে ’পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল (পিএসসি)’ গঠনের উদ্যোগ নেয়। প্যারিসে এর বৈঠক শেষে একটা সমঝোতা স্মারক সাক্ষরিত হয়। এরপর কানাডা এতে যোগ দেয়ার ফলে এর পরিধি উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

এর দশ বছর পর ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো দ্বিতীয় আঞ্চলিক গ্র“প গঠন করে। এর পরপরই প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যরীবিয় দেশগুলোও আঞ্চলিক গ্র“প গঠন করে। একে একে আমেরিকা, ভারত সাগর, ভুমধ্য সাগর, আফ্রিকান দেশসমূহ নিজ নিজ গ্রুপ গঠন করে পিএসসি বাস্তবায়ন করে।

এর আওতায় বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিটি জাহাজের পুরনো রেকর্ড, ফ্ল্যাগ, জাহাজের ধরন, মালিকানা, রেজিষ্ট্রি এসব খতিয়ে দেখতে পারে। পরিদর্শকরা জাহাজের মালামাল ও নথিপত্র আইনানুগ আছে কিনা তা যাচাই করে রিপোর্ট করে। এমনকি, জাহাজের নির্মান শৈলী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দূষন মোকাবেলা – সবই তারা দেখতে পারে।

এসব বিষয়ে সকল দেশই মোটামেটি একই রকম মান অনুযায়ী পরিদর্শন করে। যদি কোন নিয়ম ভঙ্গ হয় তবে জাহাজটিকে আটক করে রাখা যাবে, যতক্ষন পর্যন্ত না তা শোধরানো হয়।

সকল পরিদর্শন রিপোর্ট একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস এ সংরক্ষিত থাকে এবং জাহাজের নিয়ম ভঙ্গের বিষয়টি ্ওয়েব সাইটের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে জাহাজ কোম্পানী ও মালিকের দুর্নাম হয় বলে, সব পক্ষই সচেতন হয়ে যায়। তবে চুড়ান্ত শস্তি হচ্ছে জাহাজের উপর নিশেধাঞ্জা জারি করা, যাতে এটি কোন দেশের উপকুলে প্রবেশ করতে না পারে।

সফিকুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যবসা বাণিজ্য বিষয়ক লেখক।

Check for details
SHARE