এটিএম ক্লোন কার্ড!

সফিউর রহমান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। একদিন হঠাৎ তার মোবাইলে একটি এসএমএস আসে। তার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে এটিএম বুথ থেকে। এমন এসএমএস দেখে তিনি অবাক। কী ব্যাপার? কার্ড তার নিজের পকেটে। তবে কীভাবে টাকা উত্তোলন করা হলো? কে এ কাজ করল? দ্রুত তিনি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানান। ততক্ষণে টাকা নিয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিটি উধাও। এমন অভিযোগ ওই ব্যাংকে আসছে নিয়মিত। এমনসব অভিযোগের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। তারাও বিষয়টি ধরতে পারছিলেন না। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা নিশ্চিত যে, এখানে কোনো প্রতারণামূলক কাজ হচ্ছে। এজন্য তারা সিআইডির শরণাপন্ন হন। সিআইডি বিষয়টি তদন্ত শুরু করে।

সিআইডি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনের কাগজপত্র ও এটিএম বুথ সম্পর্কে তথ্য নিয়ে তদন্ত করে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট তদন্তের এক পর্যায়ে কয়েক হাজার ক্লোন কার্ড, কার্ড তৈরির সরঞ্জামসহ শরিফুল ইসলাম (৩৩) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে।

শরিফুল ইসলাম পুলিশকে জানান, তিনি রাশিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে এটিএম কার্ড ক্লোন করে কয়েক কোটি টাকা কামিয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, তার মতো আরও অনেকেই এমন কার্ড ক্লোন করে জালিয়াতি করছেন। শরিফুল রাশিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ইভানভিচ নামে তার এক রুমমেট ছিলেন। তার কাছে থেকেই তিনি ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার কৌশল শেখেন। দেশে আসার পরপরই তিনি কার্ড জালিয়াতি শুরু করেন। তবে কিছুদিন পরই ২০১৩ সালে কার্ড জালিয়াতির দুটি মামলায় গ্রেফতার হন শরিফুল। সে সময় প্রায় ১৮ মাস কারাগারে ছিলেন। ছাড়া পেয়ে আবারও রুশ বন্ধুর সহযোগিতায় নতুন কৌশলে কার্ড জালিয়াতি শুরু করেন।

‘জালিয়াতির কৌশল’ : সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকের কার্ডধারী গ্রাহকরা যখন বিভিন্ন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্ট স্টোরে যান, তখন সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড তৈরি করা হয়। পরে সেই কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়। শরিফুলের কাজের ধরন নিয়ে সিআইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, একটি সুপার শপে চাকরি করতেন শরিফুল। সেখানে তিনি ক্যাশ কাউন্টারে কাজ করতেন।

কার্ড জালিয়াতির জন্য তিনি নিজের হাতঘড়িতে একটি বিশেষ মিনি কার্ড রিডার সংযুক্ত করেছিলেন। যে কোনো গ্রাহকের কার্ডের অভ্যন্তরীণ তথ্যাবলি এই মিনি কার্ড রিডারে কপি হয়ে যেত। তারপর গ্রাহক যখন পিন নম্বর দিতেন, তখন কৌশলে পিন নম্বর দেখে নিতেন তিনি। বিল পরিশোধ করে গ্রাহকের প্রস্থানের পর রি-প্রিন্ট দিয়ে কপিটা সংগ্রহ করে তার পেছনে পিন নম্বরটি লিখে রাখতেন শরিফুল। তারপর তিনি বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ ও ডিভাইসের মাধ্যমে কাস্টমারের তথ্যাবলি ভার্জিন কার্ড বা খালি কার্ডে স্থাপন করে ক্লোন এটিএম কার্ড বানিয়ে ফেলতেন। এরপর সেই কার্ড ব্যবহার করে যে কোনো এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নিতেন।

সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ত না চুরি : অভিনব পন্থায় অন্যের কার্ড জালিয়াতি করে কেন শরিফুল এতদিন ধরা পড়েননি সে বিষয়ে সিআইডি জানায়, ‘মূলত যে কোনো বুথ থেকে টাকা তোলার সময় সিসি ক্যামেরায় যাতে তাকে চেনা না যায়, সেজন্য তিনি একটি পরচুলা ও চশমা ব্যবহার করতেন। আটকের সময় তার কাছে থেকে একটি পরচুলা ও একটি কালো রঙের সানগ্লাস উদ্ধার করা হয়েছে।’

‘প্রতারণার টাকায় বিলাসী জীবন’ : সিআইডি জানায়, শরিফুল প্রথমবার কারাগার থেকে বেরিয়ে কিছুদিনের জন্য একটা স্টুডেন্ট কনসালট্যান্সি ফার্ম খুলেছিলেন। তবে সেখানে তেমন সুবিধা করতে না পেরে তার রুমমেটের কাছ থেকে শেখা কৌশল আবারও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য তিনি ঢাকার একটি নামিদামি সুপার শপে চাকরি নেন। সেখানে চাকরি করলেও তার মূল পেশা ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এর মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ টাকায় তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। শরিফুল ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য টয়োটা এলিয়ন মডেলের গাড়ি ব্যবহার করেন। তার অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে এখন পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে।

যেসব ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি : সিআইডির এক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত শতাধিক গ্রাহকের কার্ড জালিয়াতি করেছেন শরিফুল। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক থেকে সিআইডির কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড, দ্য সিটি ব্যাংক, ইবিএল, ইউসিবিএল ও ব্যাংক এশিয়া।

‘নিজেই বানাতেন কার্ড’ : সিআইডির ভাষ্য, গ্রেফতার শরিফুল অন্যের তথ্য চুরি করে নিজেই বাসায় কার্ড তৈরি করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, ১ হাজার ৪০০টি ক্লোন কার্ড, একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ কার্ড রিডার, একটি রাইটার, তিনটি পজ মেশিন, সচল ডিজিটাল হাতঘড়ি (গ্রাহকদের তথ্য চুরিতে ব্যবহূত), দুটি মিনি কার্ড রিডার ডিভাইস, ১৪টি পাসপোর্ট, আটটি মোবাইল ফোন সেট, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি নেক্সাস ক্রেডিট কার্ড, একটি পরচুলা, একটি কালো রঙের সানগ্লাস ও তিনটি ভুয়া এনআইডি কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে কার্ড তৈরি ও বুথ থেকে টাকা তুলে নিতেন বলে পুলিশ দাবি করেছে। চলতি বছরের মার্চে এমন কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা খোয়া যাওয়ার নয়টি অভিযোগ আসে ব্র্যাক ব্যাংকে। আর এসব অভিযোগ পাওয়ার পরই সিআইডির সাহায্য চায় ব্র্যাক ব্যাংক। সিআইডি জানায়, শরিফুলের গ্রামের বাড়ি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর গ্রামে।

ওই এলাকার হাটবোয়ালিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এসএসসি ও গাংনী ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে বাবা-মায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী উচ্চতর শিক্ষার জন্য রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি যান মালয়েশিয়ায়। ২০১০ সালে দেশে ফিরে কার্ড জালিয়াতিতে জড়িয়ে যান।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Check for details
SHARE