এগিয়ে থাকার লড়াইয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সফলতার গল্প!

বাংলাদেশের প্রথম বহুজাতিক কম্পানি হিসেবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য ছিল এর প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরীর। এ কাজটি শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেননি তিনি। কিন্তু তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে চলছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি এখন বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

কানাডায় ওয়ালমার্ট, সৌদি আরব ও ওমানে ক্যারিফোর, যুক্তরাজ্যে পাউন্ডল্যান্ড, ভারতে রিলায়েন্স ফ্রেশ ও সিটি মার্ট, কাতারে গ্র্যান্ড মল ও আনসার গ্যালারি, সিঙ্গাপুরে জায়ান্ট ও শিং শিয়ং এবং মালয়েশিয়ায় টেসকো, এইওন ও সেগি ফ্রেশের সুপারশপে বাংলাদেশি পণ্য হিসেবে সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছে প্রাণ।

বিশ্বের ১৪১টি দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে প্রাণ-আরএফএলের পণ্য। এসব দেশের নামি-দামি ব্র্যান্ডের সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে থেকে বিখ্যাত সব চেইনশপে স্থান করে নিচ্ছে প্রাণ পণ্য। ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বের সব দেশ জয় করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

সৃষ্টিশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই উদ্যোক্তা ২০১৫ সালের ৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দেশের কৃষিকে শিল্পে রূপান্তর করে উন্নয়নের পথ রচনা করার উপযোগী করেই গড়ে তুলেছিলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

আমজাদ খান চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ১০ নভেম্বর নাটোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন এবং রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (আরএফএল) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের যাত্রা শুরু করেন। এই গ্রুপে বর্তমানে সরাসরি কর্মরত রয়েছেন প্রায় এক লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণপুরুষ আমজাদ খান চৌধুরী সেই বিরল মানুষদের একজন ছিলেন। বাংলাদেশের পাঁচজন সফল উদ্যোক্তার নাম উচ্চারণ করতে গেলে আমজাদ খান চৌধুরীর নাম আসবে, সেটা ইতিবাচক যেকোনো বিবেচনায়। তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। এ কারণে প্রাণ-আরএফএল বাংলাদেশের শিল্পে নতুন নতুন পণ্য যোগ করতে পেরেছে।

সেই পণ্যের বাজার তৈরি করতে পেরেছে। পরে অন্যরা সেই ব্যবসায় যোগ দিয়েছে। দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল। এ কারণে প্রথম ব্যবসাটি তিনি রংপুরে শুরু করেছিলেন। এখনো প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের করপোরেট লক্ষ্য ‘দারিদ্র্য দূর করা’।

কৃষকদের জন্য আমজাদ খান চৌধুরী কিছু করতে চেয়েছিলেন। প্রাণের ব্যবসা কৃষিকেন্দ্রিক। প্রাণের সঙ্গে কাজ করে প্রায় লক্ষাধিক কৃষক। বছর বছর লোকসান দিয়েও বহুদিন প্রাণ তাদের দুধের ব্যবসা চালিয়েছে, চালিয়ে যাচ্ছে। হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য ব্যবসায় যায়নি।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রাণ-আরএফএল এখন অনেক বড়। কিন্তু সেখানে সাম্যের কিছু নীতি আছে। সেখানে সব পুরুষের পোশাক এক রকমের, আকাশি রঙের শার্ট। খাবার খাওয়ার জায়গাটি সবার উন্মুক্ত। ছোট কর্মী, বড় কর্মকর্তার ভেদাভেদ নেই। কর্মীদের না ঠকাতে বাড়তি সময় কাজ করলে বাড়তি বেতন দেয় প্রাণ-আরএফএল।

মালিকপক্ষ এলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হয় না। এ সবই আমজাদ খান চৌধুরীর আদর্শ, সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করেছেন নিজের প্রতিষ্ঠানে।আমজাদ খান চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ১০ নভেম্বর নাটোরের সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আলী কাশেম খান চৌধুরী ও মা আমাতুর রহমান।

আমজাদ খান চৌধুরী শিক্ষাজীবন শুরু করেন ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটে। গ্র্যাজুয়েশন করেন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি এবং অস্ট্রেলিয়ান স্টাফ কলেজ থেকে। তিনি ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদ থেকে অবসর নেন।

আমজাদ খান চৌধুরীর সহধর্মিণী সাবিহা আমজাদ। তাঁদের চার সন্তান—আজার খান চৌধুরী, আহসান খান চৌধুরী, ডা. সেরা হক ও উজমা চৌধুরী। তাঁদের মধ্যে আহসান খান চৌধুরী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং উজমা চৌধুরী পরিচালক (করপোরেট ফিন্যান্স) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আমজাদ খান চৌধুরী বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রধান ছিলেন। তিনি সর্বশেষ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমজাদ খান চৌধুরী নিজের সফলতার মন্ত্র কী তা কর্মীদেরও জানিয়ে গেছেন। তিনি মনে করতেন, নেতৃত্ব ভালো হলে সেখানে সাফল্য অবশ্যই আসবে।

তবে সফলতা একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। তিনি মনে করতেন, সফলতা একটি সামগ্রিক বিষয়। সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন পরিশ্রম আর সময়মতো কাজ সম্পাদন করা। সে জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময় ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতেন তিনি। এর পাশাপাশি ‘টিম ওয়ার্ক’, ক্রেতা সন্তুষ্টি ও কর্মীদের সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দিতেন তিনি।

তাঁর মতে, এই সব কিছুর সমন্বয়ে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন সম্ভব, যা ছাড়া সফলতা আশা করা যায় না। সব ক্ষেত্রে ‘কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’, ‘টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’, ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস’ ইত্যাদির চর্চা প্রাণ-আরএফএলে প্রবর্তন করে গেছেন তিনি।

এখন প্রাণ-আরএফএল বলতেই মানুষ বোঝে ভালোমানের পণ্য। এ কারণে নতুন পণ্য এনে বাজার পেতে প্রাণ-আরএফএলের কোনো অসুবিধা হয় না। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য, প্লাস্টিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, ফার্নিচার, বাইসাইকেল, লিফট, টেক্সটাইল, টয়লেট্রিজ, প্যাকেজিং শিল্পে প্রায় ৫৭ হাজার পণ্য রয়েছে এই গ্রুপের।

প্রাণের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তাঁদের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার ৮৪০ কোটি টাকার বেশি। আগের বছরের চেয়ে তাঁদের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার। তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ।

Check for details
SHARE