এই গরমে ভালো থাকতে!

বর্ষা এসে গেছে। দেশের নানা এলাকায় বন্যাও হচ্ছে। গরম কিন্তু কমেনি। বাইরে গনগনে রোদ, ভেতরে গরম হলকা বাতাস। এই অসহ্য গরমেই অনেকে ঈদ শেষে দূরের যাত্রা সম্পন্ন করে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। আর ইতিমধ্যেই দেখা দিয়েছে গরমের রোগবালাই। জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। তাই গরমে সুস্থ থাকতে হলে চাই বাড়তি সচেতনতা।

পানিশূন্যতা যেন না হয়
প্রচণ্ড গরমে ঘাম হয় অনেক, তা ছাড়া শরীর তাপে পানি হারায়। ফলে সহজেই পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এ সময় তাই প্রচুর পানি পান করুন। যাত্রাপথে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির বোতল নিন পর্যাপ্ত। রাস্তায় অনিরাপদ পানি পান করবেন না। পথের ধারে বিক্রি হওয়া দূষিত পানি দিয়ে তৈরি ফলের রস, লেবুর শরবত, আখের রস পান করবেন না। পানিশূন্যতা রোধে সাধারণ পানিই সর্বোত্তম পানীয়। এ ছাড়া ডাবের পানি, লেবু-পানি লবণ দিয়ে বা বাড়িতে ব্লেন্ডারে করা তাজা ফলের রস খেতে পারেন।

ডাবের পানিতে ইলেকট্রোলাইটসও আছে, যা গরমে লবণশূন্যতা রোধ করবে। কিন্তু কোমল পানীয় বা কেনা ফলের জুসে অতটা উপকার হয় না। এতে ক্যালরি বেশি হলেও পানি ও লবণশূন্যতা তেমন মেটে না। এই সময়ে পানিবাহিত রোগ, যেমন ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড ইত্যাদির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় বেশি। তাই পানি ভালো করে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে সম্ভব হলে ফিল্টার করে পান করুন।

হিট স্ট্রোক হতে পারে
অনেকক্ষণ রোদে বা গরমে কাজ করলে, বিশেষ করে মাঠে বা কারখানায় ও রাস্তায় যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের এই সময় অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোক হতে পারে। এতে শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে সমস্যা দেখা দেয়, অসংলগ্ন কথা, ঘাম শুকিয়ে যাওয়া, জিভ ও ত্বক শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়া, জ্ঞান হারানো ইত্যাদি হলো এর লক্ষণ। পথেঘাটে এমনটা ঘটতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পথচারীকে অপেক্ষাকৃত শীতল জায়গায় নিতে হবে। জামাকাপড় ঢিলে করে বা খুলে দিয়ে ফ্যান বা পাখার বাতাস দিয়ে শরীর শীতল করতে হবে।

একটা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে ত্বকে স্পঞ্জ করতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। হিট স্ট্রোক থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে বা হাঁটলে মাথায় ছাতা, চোখে সানগ্লাস ব্যবহার করুন, বারবার পানি পান করুন ও শীতল জায়গায় বিশ্রাম নিন, পাতলা সুতি জামা পরুন।

চারদিকে ফ্লু হচ্ছে
অতিরিক্ত গরমে এরই মধ্যে ঘরে ঘরে বিশেষ করে শিশুদের দেখা দিচ্ছে জ্বর, সর্দি-কাশি ও ফ্লু-জাতীয় রোগ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এমনিতেই সেরে যাবে। প্রচুর পানি, প্রচুর বিশ্রাম, জ্বরের জন্য প্যারাসিটামলই এর ওষুধ। শিশুদের নাক স্যালাইন ওয়াটার দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে বারবার। গলা ব্যথা বা কাশির জন্য গরম লেবু-জল, আদা চা, মধু-আদার রসের মিশ্রণ ইত্যাদি ভালো। কফ সিরাপ বা অ্যান্টিহিস্টামিন–জাতীয় ওষুধ না খাওয়াই ভালো। তবে খেয়াল রাখবেন, এটা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ারও সময়। তাই জ্বর হলে লক্ষ রাখুন ত্বকে র‌্যাশ ওঠে কিনা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখব্যথা আছে কি না এবং রক্তচাপ কমে যাচ্ছে কি না।

পাশের দেশে ব্যাপক হারে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ দেখা দিয়েছে সম্প্রতি। নিপাহ মূলত ছড়ায় বাদুড়ের খাওয়া দূষিত ফলমূল থেকে। তাই আধখাওয়া বা ফুটো করা বা না ধোয়া ফল খাবেন না। বাজার থেকে আনা ফল ভালো করে বারবার ধুয়ে এবং খোসা ছাড়িয়ে তারপর খান। সরাসরি গাছ থেকে পেড়ে না ধোয়া ফল খাওয়া ঠিক নয়। নিপাহ সংক্রমণের লক্ষণগুলোও ফ্লুর মতোই, তবে এতে কাশি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে, এমনকি রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে।

শিশুদের দিকে লক্ষ রাখুন
চরম আবহাওয়ায় সবচেয়ে আগে অসুস্থ হয় শিশুরা। তাই এ সময় শিশুদের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন। বারবার পানি ও তরল খাওয়ান। প্রতিদিন গোসল করিয়ে দেবেন। হালকা সুতির কাপড় পরাবেন। বদ্ধ ঘরে না রেখে জানালা-দরজা খোলা রাখুন, বাতাস চলাচল করতে দিন। যেসব শিশু এই ছুটির সময়ে ইচ্ছেমতো বাইরে খেলাধুলা ছোটাছুটি করছে তাদের দিকেও লক্ষ রাখুন।

দুপুর রোদে না খেলে সকালে ও বিকেলে খেলতে দিন। বারবার পানি খেতে ডাকুন। এই গরমে এবার হালকা তেল–মসলা কম এমন খাবার বেছে নিন। লাউ, শসা, কুমড়া ইত্যাদি সবজিতে পানির পরিমাণ বেশি। এগুলো এখন বেশি খেতে হবে। খেতে হবে মৌসুমি ফলমূল, লেবু ও সালাদ। এগুলো গরমে প্রশান্তি আনে।

লেখক: চিকিৎসক, তথ্যসূত্র: প্রথমআলো ডটকম।

Check for details
SHARE