উদ্যোগী নারীর সাহসী গল্প!

কর্মব্যস্ত প্রতিদিনের সকাল মানেই গৃহিণীর দম ফেলার ফুরসত নেই। বাড়ির কর্তা কাজে বেরোবেন, সকালের নাশতা টেবিলে দেয়ার সঙ্গেই ভাবতে হয় দুপুরে খাবারের কথা। বাক্সভর্তি স্বাস্থ্যকর খাবার ব্যাগে পুরে না দিতে পারলে যেন অস্বস্তি থেকেই যায়। কেননা দুপুরে মানসম্মত খাবার আর কোথায় মিলবে। অগত্যা অপুষ্টিকর, ভেজাল খাবারেই ভুড়িভোজ সারতে হবে।

অন্যদিকে অফিসপাড়ায় ভালো মানের রেস্তোরাঁ মানেই গুনতে হয় বেশি টাকা। সবমিলে খাবার, পুষ্টি আর পয়সার সম্মিলন ঘটানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। এসব কথা ভেবেই খানিকটা ব্যতিক্রমী চিন্তা করেছেন খান’স কিচেনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা খান। কর্মজীবীদের জন্য অল্প টাকায় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। আজকের আয়োজনে থাকছে এ নারীর উদ্যোগের কথা—

বাক্সভর্তি খাবার নিয়ে অফিস যাত্রার সময় বুঝি শেষ হয়ে এসেছে। বরং এখন পুষ্টিকর খাবারই পৌঁছে যাবে কর্মক্ষেত্রে। অবাক ঠেকলেও কর্মজীবী মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে খান’স কিচেন তৈরি তাদের সেবা পৌঁছে দিতে। আধুনিক ক্যাটারিং সার্ভিস মূলত এটি। খাবারের মান, পুষ্টি ঠিক রেখে আধুনিক পদ্ধতিতে রান্না করা খাবার খান’স কিচেন পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিটি অফিসে। খাবারের মূল্য নাগালের মধ্যেই।

চমৎকার এ উদ্যোগটি কিন্তু একজন নারীরই। তিনি আফরোজা বেগম। রান্না করতে বেশ ভালোবাসেন। প্রিয় মানুষদের নানা রকম মুখরোচক খাবার তৈরি করে দেয়া যেন তার নেশা। এ নেশা কাজে লাগিয়েই ঢাকায় তৈরি করেছেন বাংলাদেশের তো বটেই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় রান্নাঘর। বিশাল এ রান্নাঘর থেকেই প্রতিদিন ঢাকা শহরের লক্ষাধিক কর্মজীবী মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন। খান’স কিচেনকে বলা হচ্ছে দেশের প্রথম মেগা কিচেন।

খান’স কিচেনের যাত্রা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। তবে আফরোজা খান এমন কিছু তৈরির পরিকল্পনা করছিলেন আরো আগে থেকেই। একটু স্পষ্ট করে বললে বলতে হবে ২০১৩ সালে মূলত পরিকল্পনা আঁটেন একটা ভিন্নধর্মী কিচেন তৈরির। বিখ্যাত শেফ টনি খানের সঙ্গে পারিবারিক সূত্রে পরিচয় আফরোজা বেগমের।

ক্যাটারিং নিয়ে আফরোজা খানের আগ্রহ দেখে একদিন টনি খানই তাকে বলেন, যেহেতু তার অনেক খালি জমি রয়েছে, সেসব খালি জায়গাতেই ক্যাটারিং নিয়ে কিছু করার। সে সময় তিনিই নাকি তাকে বলেছিলেন বাংলাদেশে যেহেতু এখনো ভালো মানের ক্যাটারিং সুবিধার পর্যাপ্ততা নেই, তাই খালি জায়গায় এমন একটি কিচেন তৈরি করা যেতে পারে, যা গ্রাহককে ভালো মানের খাবারের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম। আর এভাবেই সূচনা হয় খান’স কিচেনের।

খান’স কিচেনে শুরুর কথা বলতে গিয়ে আফরোজা বলেন, রান্নার বিষয়ে আমার ঝোঁক ছিল অনেক আগে থেকেই। ক্যাটারিং নিয়ে কিছু করা যায় কিনা, এমনটা সবসময়ই ভাবতাম। যেহেতু আমারও চাওয়া ছিল আর টনি খানের মতো শেফ আমাকে সাহস দিলেন, সব মিলে খান’স কিচেন তৈরির পরিকল্পনা বেঁধে ফেলি।

বাড্ডার বেরাইদে ১৫ বিঘা জমির ওপর ৬৩ হাজার বর্গফুটের রান্নাঘরটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় রান্নাঘর। আধুনিক প্রযুক্তির যথার্থ প্রয়োগ রয়েছে বিশেষ এ কিচেনে। সব ধরনের খাবার এখানে প্রস্তুত করা হয় অটোমেটেড মেশিনে। ফলে খুব অল্প সময়ে খাবারের গুণগত মান ঠিক রেখে হাজার হাজার মানুষের খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

রান্নার জন্য সবজি, মাছ কাটা-ধোয়া ইত্যাদি প্রক্রিয়া চলে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে। অন্যদিকে এখানে ভাত রান্নার জন্যও ব্যবহার হচ্ছে অটোমেটেড রাইস স্টিমার। আর রান্না করা গরম খাবার গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বমানের ফুডগ্রেড বক্স। সব মিলে খান’স কিচেন যেন বাড়ির মতোই অফিসেও পুষ্টিকর খাবার পাতে তুলে দেয়ার দায়িত্বটিই পালন করছে।

অন্যদিকে খান’স কিচেনের মতো একটি উদ্যোগ শুধু একজনের কর্মসংস্থানই নিশ্চিত করেছে বিষয়টি এমন নয়। কেননা আধুনিক ঘরানার এ কিচেন পরিচালনার জন্য কাজ করছেন প্রায় ৪০০ কর্মী। অর্থাৎ আফরোজা খানের খান’স কিচেন অনেক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দিয়েছে। আফরোজা খান জানান, আমাদের এখানে সাড়ে তিনশর বেশি লোক কাজ করেন।

যখনই মনে হয় অন্তত কিছু মানুষের অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা হচ্ছে আমার এ প্রতিষ্ঠান থেকে, কর্মসংস্থান তৈরি করে দিতে পারছি তাদের জন্য, তখন সত্যিকার অর্থেই ভালো লাগা কাজ করে। আমার দ্বারা কেউ উপকৃত হচ্ছে, তাদের জন্য আমি কিছু করতে পারছি, এটা ভেবেই মূলত তৃপ্তি পাই।

আফরোজা খান রাঁধতে এবং মজাদার খাবার রান্না করে প্রিয়জনদের খাওয়াতে ভালোবাসেন। হরেক রকম মজাদার খাবার টেবিলে পরিবেশন করলেও নিজের পছন্দের খাবারের তালিকাটি কিন্তু খুব ছোট। তার মতে, মাছ আর ভর্তা হলে খাওয়ার টেবিলে আর কিছুই চাওয়ার নেই। তিন সন্তানের জননী আফরোজা বাড়ির সদস্যদের জন্য রান্না নিজেই করতে চেষ্টা করেন সবসময়। সময় পেলে সন্তানদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো তার প্রিয় কাজগুলোর একটি। যদিও সেভাবে সময় সুযোগ মেলা কঠিন, তবে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর একটা সুযোগও হাতছাড়া করতে চান না তিনি।

তথ্যসূত্র: বনিকবার্তা ডটকম।

Check for details
SHARE